সমসাময়িক বাংলাভাষায় দাম্পত্য প্রেম নিয়ে গল্প খুব বেশি দেখা যায় না যেখানে অনুভবের গভীরতা, শরীরী ঘনিষ্ঠতা আর আত্মিক বোঝাপড়ার এক সূক্ষ্ম মেলবন্ধন ঘটে।
‘রৌদ্র ভেজা প্রেম’ তেমনই একটি ব্যতিক্রমী গল্প— যেখানে বৈবাহিক সম্পর্ক কেবল দায়িত্বে নয়, প্রেমেও দীপ্ত। রান্নাঘরের ঘামে, ট্রেনের জানালার হাওয়ায়, গ্রামের উঠোনে শুয়ে থাকা দুজন মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে নিঃশব্দে। গল্পটি লিখেছেন: ‘আশরাফ ইবনে আকন্দ’।
রৌদ্র ভেজা প্রেম
— আশরাফ ইবনে আকন্দ
জ্যৈষ্ঠ মাসের মধ্যভাগ। রোদের তীব্রতায় জানালার কাঁচ ফুটে যেতে চায়। বাতাস যেন চুল্লির শ্বাস—মুখের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
রান্নাঘরের জানালায় একটা পাতাও নড়ছে না। ইরা দাঁড়িয়ে আছে চুলার পাশে, আঁচলের প্রান্ত দিয়ে ঘামের স্রোত মোছে কপাল থেকে। ভাতের হাঁড়িতে পানি ফুটছে, সবজির কড়াইয়ে তেল টগবগ করে উঠছে।
চুলার আগুন মাঝে মাঝে উঁকি দেয় তার মুখের দিকে।
সাজু তখনো ঘরে, এসির নিচে আধো ঘুমে। দুপুরের খাওয়ার আগেই আজ আবার অনলাইনে মিটিং। ইরার হাতের রান্না ছাড়া তার চলেই না। সেদিনও বলেছিল,
— “তোমার হাতের ডাল না হলে আমার মুখেই রোচে না।”
তিন বছর হলো তাদের বিয়ে হয়েছে। সাজু বলে,
— “তুমি না একদম স্বপ্নের মতো। আমার প্রেয়সী।”
ইরা হেসে চুপ করে থাকে। কখনো মাথা নিচু করে বলে,
— “প্রেয়সীরা কি এমন গরমে আগুনের পাশে দাঁড়ায়?”
কথাগুলো কখনো মুখ ফুটে বলেনি ইরা। বলবে কী করে?
বাড়ির কাজ, অফিস, রান্না, সবকিছু মিলে প্রেয়সীর জীবন যেন একটা নীরব আগুন।
আজ দুপুরে হঠাৎই সাজুর ঘুম ভেঙে যায়। পানি খেতে গিয়ে রান্নাঘরের দিকে চোখ পড়ে তার।
ইরার মুখ রোদে জ্বলছে। শরীরটা কেমন কেঁপে ওঠে তার।
তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে আসে।
— “তুমি… এই গরমে… কষ্ট হচ্ছে না?”
ইরা তাকায় না, শুধু বলে,
— “রোজ তো হয়। তুমি কি আজ দেখলে?”
সাজু স্তব্ধ।
সে কিছু বলে না।
একটা ছোট তোয়ালে ভিজিয়ে আনে, ইরার কপালে চেপে ধরে।
চুপিচুপি বলে,
— “আমি জানি না কেন এতদিন দেখিনি। এখন মনে হচ্ছে, আমি ভালোবাসতে জানি না…”
ইরার মুখে একফোঁটা হাসি খেলে যায়। সে মুখ ঘুরিয়ে নেয়,
কিন্তু চোখের কোণ জলে টলটল করে।
সাজু চুপচাপ তার পাশে দাঁড়ায়। রান্না প্রায় শেষ।
চুলার আগুনটা সে নিজে নিভিয়ে দেয়।
দুপুরে খাওয়ার সময় ইরা বলে,
— “তুমি কি জানো, রান্নাঘরের আগুনেও আছে ফোঁটা ফোঁটা প্রেম?”
সাজু তাকিয়ে থাকে স্ত্রীর দিকে।
তপ্ত দুপুরে, ঘামের গন্ধে ভরা ঘরে, হঠাৎই তার মনে হয়—
ইরা শুধু তার স্ত্রী না, সে এক সময়ের সাক্ষী,
এক প্রেয়সী,
যার ভালোবাসা সবসময় নীরবে পুড়ে যায়।
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে।
আকাশে গোধূলির লালচে রেখা।
ইরা বারান্দায় বসে জামাকাপড় ভাঁজ করছে। চুল খুলে খোপা করেছে তাড়াহুড়োতে, হাতজোড়া ক্লান্ত তবু ব্যস্ত। শুকনো তোয়ালে মচকে ভাঁজ করছে, মনে মনে তাল মেলাচ্ছে সময়ের সঙ্গে।
সাজু এসে চুপচাপ পাশে বসে।
তার মুখে ভিন্ন এক ভাব, যা ইরার চোখ এড়িয়ে যায় না।
— “তুমি কখনো কিছু বলো না, ইরা,” সাজু বলে।
ইরা চোখ না তুলে জবাব দেয়,
— “সব কথা কি মুখে বলা যায়?”
তার ঠোঁটের কোণে জমে থাকা একটি রেখা—কষ্টের, অভ্যস্ততার—হঠাৎ যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সাজু চুপ করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
তারপর মৃদু স্বরে বলে,
— “আজ দুপুরে তোমাকে দেখে… আমি কেমন জানি ভয় পেয়ে গেলাম।
তুমি কি প্রতিদিন এমন চুপচাপই পুড়ো আগুনের সামনে?”
ইরা এবার ধীরে তাকায় সাজুর দিকে।
তার চোখে কোনো অভিযোগ নেই, শুধু একটা দীর্ঘ ক্লান্তি।
সাজু বলে,
— “আমি যদি সত্যিই প্রেমিক হতাম,
তাহলে হয়তো আগেই বুঝে যেতাম এই নীরবতা কতটা গাঢ়।”
ইরা আবার চোখ নামিয়ে নেয়।
বলে না কিছু। কিন্তু সাজু এবার থামে না।
সে ইরার কাছ থেকে তোয়ালেটা নিয়ে ফোল্ড করে,
তারপর বলে—
— “কাল থেকে রান্নাঘরে তুমি একা থাকবে না। ছুটির দিনগুলোতে আমি পাশে থাকব।
তাপ নিতে না পারি, কিন্তু তোমার পাশে দাঁড়াতে পারি তো?”
ইরার চোখে এবার এক মুহূর্তের দোল খায়।
জানালার কাঁচে সূর্যটা একটুখানি পড়ে রইল, যেন সাক্ষী হয়ে।
সাজু আবার বলে,
— “আমি কিচ্ছু পারি না ইরা। না ডাল রাঁধতে পারি, না ভাত চড়াতে পারি।
তবু আমি চাই—তোমার একজন মানুষ হতে।
তোমার ছায়া হতে, একফোঁটা বাতাস হতে।”
ইরা এবার হালকা হেসে তাকায়, সেই হাসিতে যেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা ধোঁয়ার মৃদু ছায়া।
কোনো শব্দ হয় না, তবু মনে হয়—
এই নীরবতা অনেক বেশি গভীর।
---
সকালের রোদ জানালায় পড়ে কাঁপছে।
পাখিরা জানে আজও গরম হবে তীব্র।
রান্নাঘরে আজ অদ্ভুত একটা নীরব চঞ্চলতা।
কারণ সাজু আজ রান্না করবে।
ইরা প্রথমে কিছু বলেনি।
শুধু একটু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
তারপর একটা পুরোনো গামছা এগিয়ে দিয়েছিল সাজুকে—
রান্নার সময় কপালের ঘাম মুছবে বলে।
সাজু হেঁশেলে ঢুকেই থমকে যায়।
এত হাঁড়ি, বাটি, কাটাকুটি, জ্বাল দেওয়ার নামতা—
একটা যুদ্ধক্ষেত্র মনে হয় ওর কাছে।
— “তরকারিটা কোনটা?”
— “এইটা। আলু দিয়ে ঢেঁড়স করলেই চলবে।”
— “আলু কি কুচি করে কাটা লাগে?”
— “না, গোল করে কাটো। তবে সমান যেন হয়।”
সাজু তার সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে।
আলু কাটতে গিয়ে আঙুলে সামান্য চোট লাগে।
তবুও সে চুপ করে, কিচেন টাওয়েল দিয়ে পেঁচিয়ে নেয়।
চুলায় আগুন ধরাতে গিয়ে গ্যাস একটু বেশি ছেড়ে ফেলে—ভয় পায়,
তারপর ফুঁ দিয়ে কমায়।
ইরা পাশের ঘর থেকে মাঝে মাঝে একবার উঁকি দেয়।
চোখে একরাশ শঙ্কা,
তবে তার মুখে অদ্ভুত এক শান্তি।
সাজুকে দেখে মনে হয় সে যেন একটা শিশু—
যে প্রথমবার আঁকতে বসে ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি।
তরকারিতে লবণ দেওয়ার সময় সাজু দ্বিধায় পড়ে।
চামচে একবার তোলে, পরে আবার কমিয়ে দেয়।
নিজেই ফিসফিস করে—
— “বেশি হলে আবার ঝগড়া হবে না তো?”
সব শেষে যখন তরকারিটা নামিয়ে রাখে,
ইরা এসে পাশে দাঁড়ায়।
চোখে লুকোনো হাসি।
— “চলো খেয়ে দেখি।”
— “তুমি আগে খাও,” সাজু বলে।
ইরা মুখে তোলে এক চামচ।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে—
— “লবণ একটু কম। কিন্তু…”
সাজুর মুখ শুকিয়ে যায়।
ইরা এবার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলে—
— “…ভালোবাসা অনেক বেশি।”
সাজু যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
তার মুখে হাসি, চোখে জলছোঁয়া এক উষ্ণতা।
তাদের মাঝে রান্নাঘরের তাপটা একটু কমে আসে যেন।
পরেরদিন সকালে সাজু একটু আগেভাগে উঠে।
ঘড়িতে সময় সাড়ে সাতটা।
কিন্তু ইরা এতক্ষণে ধুয়ে ফেলেছে চুল, কাপড় পালটে নামছে চুলার কাছে।
সাজু দাঁড়িয়ে থাকে তার পাশেই।
চুপচাপ ইরার পেছনে দাঁড়িয়ে বলে—
— “ভাতটা আজ আমি করে দিচ্ছি।”
ইরা ভুরু কুঁচকে তাকায়,
— “বুঝো তো কিছু?”
— “না। তবে শিখতে চাই।”
সেই থেকে শুরু হয় সাজুর প্রতিদিনের একটা ছোট লড়াই।
সে চামচে ডাল নাড়িয়ে দেখে—ঘন কি পাতলা।
ভাত চড়াতে গিয়ে বারবার ঢাকনা ফেলে দেয়।
একদিন তো ছাকনি হাতে ডাল ছেঁকে নিতে গিয়ে ডাল পুরোপুরি গড়িয়ে দেয় বেসিনে।
সাজু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
ইরা সেদিন কিছু বলে না।
চুপচাপ মেঝে মুছে আবার ডাল বসায়।
তবে একদিন সে বলে বসে—
— “তুমি না পারলেও, পাশে থাকো—এইটুকুই অনেক।
আগুনটা ভাগ করে নিতে কেউ চায় না। তুমি চাইছো—তাই আমার কাজটা হালকা লাগে।”
সাজুর চোখে জল আসে না,
তবে তার ভেতরের আত্মাভিমানটা ধীরে ধীরে গলে যেতে থাকে।
একদিন বাইরে থেকে সাজুর এক বন্ধু আসে। সাজুকে খুঁজতে খুঁজতে রান্নাঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়।
সাজু তখন পেঁয়াজ কুটছে, চোখ লাল, আঙুলে গন্ধ।
বন্ধু হো হো করে হেসে ওঠে,
— “তুই তো দেখি একেবারে বউয়ের নিচে চলে গেছিস রে!”
সাজু শুধু হেসে বলে,
— “নিচে না রে, পাশে। দাঁড়ানোর জায়গা তো ওটাই হওয়া উচিত ছিল অনেক আগে।”
বন্ধু হেসে চলে যায়,
কিন্তু ইরা সেই কথাটা পাশের ঘর থেকে শুনে ফেলে।
তার চোখে এক ধরনের ব্যাখ্যা-না-করা আলো জ্বলে ওঠে।
সাজু তাকে দেখে কিছু বলতে চায়,
তবে ইরা আগেই বলে ফেলে—
— “এই প্রথম কারো কথা শুনে লজ্জা লাগেনি, বরং গর্ব হলো।
তুমি কি জানো কেন?”
সাজু জবাব দিতে পারে না।
ইরা শুধু বলে—
— “কারণ তুমি আমাকে একা রাখো না আর।
এইটুকু ভালোবাসা দিয়েই তো জীবন চলে যায়।”
ইরার মনটা আনন্দে নেচে ওঠে।
নীরবে, ভিতরে ভিতরে।
সে ভাবে—
"সাজু এখন আর কেবল ভালোবাসে না, বোঝেও।
এই বোঝাপড়াই তো সবচেয়ে বড় প্রেম।"
তার ঠোঁটে হাসি ফুটে,
অতল গর্বে বুকটা ভরে ওঠে।
তপ্ত দুপুরের সেই ঘামভেজা কপাল যেন এখন শীতল বাতাসে ধুয়ে যায়।
---
- রান্নাঘরের রোদ ও নিরার আগমন
রোদ্দুরটা আজও গা জ্বালানো।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলে নামছে, কিন্তু গরমের কোমর এখনও বাঁকা হয়নি।
এই সময়ে কলিং বেল বাজে।
ইরা একটু অবাক হয়।
দরজা খুলতেই একঝাঁক হাওয়া ঢুকে পড়ে—
— “হ্যালো আপু!”
ইরার ছোট বোন নিরা দাঁড়িয়ে হাসছে।
চোখে সানগ্লাস, কাঁধে ব্যাগ, পরনে হালকা পাতলা কামিজ আর চুড়িদার।
কলেজ থেকে ছুটি পেয়ে হুট করে চলে এসেছে।
ইরা এক মুহূর্ত থমকে থাকে।
তারপর জড়িয়ে ধরে—
— “এই গরমে হুট করে চলে এলি?”
— “তাই তো মজা, গরমে তোমার রান্নার ঘ্রাণ খাওয়ার সুযোগ তো আর মিস করা যায় না!”
নিরা হেসে ভেতরে ঢোকে।
আর তখনই রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে হাঁড়ির ঢাকনা তোলার আওয়াজ।
সে অবাক হয়ে উঁকি মারে।
সাজু, চুলার পাশে দাঁড়িয়ে, গামছা কাঁধে, ডাল নাড়ছে।
ঘাম ঝরছে, গাল লাল হয়ে আছে, তবু মুখে আন্তরিক মনোযোগ।
নিরা হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে।
— “এইটা কি স্বপ্ন দেখছি? দুলাভাই রান্না করছেন?”
— “হ্যাঁ,” ইরা মুচকি হেসে বলে।”
নিরা ঠোঁট কামড়ে হাসে—
— “বাহ! রান্নাঘরে রোম্যান্স দেখছি!”
সাজু পেছনে ঘুরে বলে—
— “তুই এলি, ভালো করেছিস। আজ তোর জন্যই ডাল আর বেগুন ভাজা।”
নিরা খানিক ঠাট্টা ছলে বলে—
— “আপু রান্না না করে, বরং দুলাভাই করছে— আঃ কি প্রেম দু'জনার!”
ইরা কিছু না বলে চুপ করে থাকে।
সাজু হালকা হেসে বলে—
— “প্রেমের মাপকাঠি রান্না নয়, পাশে থাকাটাই প্রেম।”
নিরার ঠোঁটে থাকা দুষ্টু হাসিটা একটু নরম হয়ে যায়। চোখে একফোঁটা ঝিলিক—শুধু একবার তাকায় ইরার দিকে।
সে আর কিছু বলে না।
চুপচাপ ডাইনিং টেবিলে বসে।
খাওয়ার সময় একবার মুখ তুলেই বলে—
— “ডালে লবণ একটু কম। কিন্তু দুলাভাই, আপনার মনের পরিমাণটা ঠিক।”
ইরা তাকিয়ে থাকে নিরার দিকে।
দুই বোনের মাঝে অনেক অজানা কথা বিনিময় হয় চোখের ভাষায়।
নিরা বারান্দায় বসে আছে।
চা খেতে খেতে সূর্য ডুবে যাওয়া দেখে।
সব কিছু কেমন স্থির।
শুধু রান্নাঘর থেকে মাঝে মাঝে চামচের আওয়াজ আসে—সাজু এখনও কাজ করছে।
ইরা পাশে এসে বসে।
দুই বোন কিছুক্ষণ কথা বলে না।
নিরা হঠাৎ বলে—
— “আপু, তুই কি সত্যিই সুখী?”
ইরা একটু চমকে তাকায়।
চোখে-মুখে বিস্ময় নেই, বরং একরকম শান্তি।
— “জানি না সুখের কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি আছে কি না।
তবে একটা কথা সত্যি…”
সে একটু থেমে বলে—
— “সাজু আমাকে ভালোবাসে বলেই শুধু না,
ও আমাকে বোঝে।
আমার ক্লান্তি বোঝে, চুপ করে থাকাকে বোঝে,
মাঝে মাঝে আমার নীরবতার ভাষাও ও পড়ে ফেলে।”
নিরা তাকিয়ে থাকে।
ইরা এবার ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি এনে বলে—
— “তুই জানিস, সাজু ছেলেবেলাতেও রান্না করত মায়ের সঙ্গে।
সে আগুনের ভয় পায় না।
বরং আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের ভালোবাসাকে আগলে রাখে।”
— “এখন আমি শুধু স্ত্রী নই, আমি একজন সঙ্গী।
সাজু আমাকে সঙ্গী বানিয়েছে।
এইটুকু পাওয়াটাই কি কম কিছু?”
নিরা এবার আর প্রশ্ন করে না।
চুপচাপ ইরার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার চোখে যেন কোনো একদিন নিজেও এমন ভালোবাসা কামনা করে।
অন্ধকার নেমে আসে বারান্দায়,
তবু আলো জ্বলে থাকে দুই বোনের মাঝের নীরবতায়।
নিরা আর কিছু বলে না।
তার চোখে বোঝার আলো, ঠোঁটে নীরব সম্মতি।
ঠিক তখনই বারান্দার দরজায় ঠকঠক শব্দ।
সাজু।
কাঁধে হালকা তোয়ালে।
ঘামে ভেজা কপাল মুছতে মুছতে দাঁড়িয়ে বলে—
— “আরে! দুই বোন গা ঢাকা দিয়ে কী এত ভাবছো?”
তারপর একঝাঁক হেসে বলে,
— “নিরা, চিন্তা করিস না—
তোকেও আমার মতোই বর খুঁজে দেব!
রান্না জানতে হবে— কমপক্ষে ভাত রাঁধা, ডিম ভাজা!”
নিরা হেসে ফেলে।
ইরার মুখে খুনসুটির হাসি।
সাজু পাশে বসে বলে—
“চা শেষ? নাকি আমার জন্য রেখেছো?”
ইরা বলে—
“তোমার জন্য তো জীবনটাই রেখে বসে আছি!”
সাজু নাটুকে ভঙ্গিতে বলে—
“তাহলে আমি সত্যিই ভাগ্যবান!”
নিরা এবার হেসে বলে—
“তোমরা দুইজন সিনেমার মতো ডায়লগ মারো, জানো?”
আলোর নিচে বসে থাকা তিনজন মানুষের মুখে তখন নিখাদ হাসি।
গল্প এগোয়, ভালোবাসা বাড়ে,
আর তপ্ত দুপুরের মাঝখানে জেগে থাকে একরকম শীতল ঘনতা—
যেটা কেবল বোঝাপড়া আর সঙ্গ দিয়েই সম্ভব।
----
সন্ধ্যাবেলা।
ঘরে হালকা বাতাস ঢুকছে, কিন্তু গরম এখনও থেমে নেই।
সাজু আর ইরা বারান্দায় বসে চা খাচ্ছে।
এমন সময় সাজুর ফোনে মায়ের কল আসে।
অপর প্রান্ত থেকে মা বলে ওঠেন—
— “ফেসবুকে তোর ভিডিওটা দেখলাম।
দেখে খুব ভালো লাগল। তুই কি সত্যি রান্না করিস রে, বাবা?”
সাজু হেসে চোখের কোণে ইরার দিকে তাকায়,
তারপর বলে—
— “হ্যাঁ মা, ছুটির দিনগুলোতে রান্নাঘরে ওকে একটু সময় দিই আরকি।”
— “ভালো করেছিস। তোর ছোটবেলা মনে পড়ে যায় রে।”
সাজু একটু চুপ করে যায়।
মা যেন ঠিক তখনই স্মৃতির দরজা খুলে ফেলেন।
— “তুই তো জানিস, তোর আব্বার হঠাৎ অসুস্থতার সময় কত কষ্ট হইছিল।
তুই তখন ক্লাস ফোরে পড়িস।
তবু প্রতিদিন গরম ভাতে আলু ভর্তা বানিয়ে দিতি আমার পাশে দাঁড়ায়া।”
সাজুর চোখ ভিজে ওঠে।
— “তুই ছোট থেকেই এমন ছিলি। তোর বউ তো ভাগ্যবতী। মা হয়ে আমি গর্ব করি।”
সাজু কিছু বলে না।
ওদিকে বারান্দা থেকে ইরা চুপচাপ শুনে ফেলে কথাগুলো।
তার চোখে জমে এক অনির্বচনীয় আলো।
সাজুর অতীত আর বর্তমান এক সুতোয় গাঁথা হয়ে যায় তার কাছে।
রান্নাঘরের আগুন আজ যেন আর পোড়ায় না—
বরং আলোকিত করে।
---
“২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩২ তপ্ত দুপুর
তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি।
বাইরে গরম বাতাস, ভেতরে চুলার উত্তাপ।
তবু আজকের দুপুরটায় আমার মন হালকা।
সাজু পাশে ছিল।
রান্না করতে গিয়ে ঘাম জমেছিল কপালে,
ঠিক তখন ও আমার পাশে এসে দাঁড়াল।
বলল,
‘তুমি বেরোও, আমি করি।’
আমি অবাক হইনি,
কারণ এখন আর ওর কাছে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
সাজু রান্না করতে পারে—
এটা শুধু একটা গুণ নয়,
এটা ভালোবাসার প্রকাশ।
আমার খেয়াল রাখার মধ্যে ওর গর্ব লুকিয়ে থাকে।
আজ মা ফোনে বললেন,
ফেসবুকে দেখা রান্নার ভিডিও দেখে খুব খুশি হয়েছেন।
একটা হাসি এল আমার মুখে—
আমি কিছুই বলিনি, শুধু চায়ের কাপ সাজুর দিকে বাড়িয়ে দিলাম।
আমার এই জীবন—
একটা ধোঁয়া ওঠা কাপ,
একটা ভেজা তোয়ালে,
একটু পরিশ্রম ভাগ করে নেওয়া ভালোবাসা।
সব পুরুষ একরকম নয়—
আর সব প্রেমও একরকম হয় না।
আমার প্রেম একটু নিঃশব্দ,
তবু প্রতিদিন নতুন করে প্রকাশ পায়।
যখন সাজু আমার জন্য পেঁয়াজ কেটে কাঁদে,
তখন আমি বুঝি—
আমার এই সংসার একটি কবিতা।
তপ্ত দুপুরে লেখা এক দীর্ঘ ভালোবাসার গদ্য।”
–ইরা
দুদিন পর ঈদুল আজহা।
শহরের ধুলো-ধোঁয়ার মধ্যে
অভিমান জমে থাকা এক দীর্ঘ বর্ষার মতো জীবন পেছনে ফেলে
তারা রওনা দেয় গ্রামে।
কমলাপুর স্টেশন তখন কানায় কানায় ভরা—
হাত-পাখা, প্লাস্টিকের মগ, সেমাইর প্যাকেট,
সব ছুটে চলেছে একদিকে—গফরগাঁও, সুবর্ণপুর।
সাজু ব্যাগ গোছায়।
ইরা দাঁড়িয়ে জানালার দিকে তাকায়।
তার চোখে একধরনের আলো—
যেন এই সফর শুধু ইদের না,
কোনো পুরোনো কবিতার দিকে ফেরার।
ট্রেন ছাড়ার মিনিট পাঁচেক আগে,
সাজু হঠাৎ ইরার কানে ফিসফিসিয়ে বলে—
— “জানো? ট্রেনের জানালায় তোমাকে দেখতে বড়ো মিষ্টি লাগে।
এমনভাবে তাকাও, মনে হয় তুমি আর আমি একসাথে ছুটে যাচ্ছি কোনো গল্পের দিকে।”
ইরা হেসে বলে—
— “তাই? তাহলে গল্পটা শেষ হতে দিয়ো না কখনো।”
ট্রেন ছাড়ে—
চাকা ঘোরে, শহরের কংক্রিট পেছনে ফেলে
সবুজ ছায়ায় ঢেকে যায় জানালার পাশ।
নিরা হেডফোনে গান শুনছে।
ইরা আর সাজু পাশাপাশি বসে।
সাজু ইরার হাতটা ধীরে নিজের কোলের উপর নেয়,
তাপরক্ত আঙুলের ভাঁজে তাদের চুপচাপ প্রেম জমে ওঠে। সাজুর বুকে মাথা পেতে ঘুমিয়ে পড়ে ইরা।
ট্রেন ছুটে চলে।
ঝাঁকুনিতে সামান্য দুলে ওঠে ইরার মাথা,
তবু তার মুখে শান্তির রেখা—
ঘুমে ভেজা নিঃশ্বাসে যেন সাজুর বুকের গতি বদলে যায়।
সাজু তাকিয়ে থাকে জানালার বাইরে—
পেছনে ফেলে আসা শহরের গাঢ় ধূসরতা,
আর সামনে এগিয়ে চলা সবুজ দিগন্ত।
তার মনে পড়ে—
একদিন ইরা তাকে বলেছিল,
—“শুধু নিজের জন্য ভালোবাসা চাইলেই তা টেকে না। কাউকে ঘুমিয়ে পড়ার মতো নিরাপদ অনুভব দিলে তবেই প্রেম সত্যি হয়।”
হঠাৎ হকারের ডাক—
“মুড়ি চানাচুর! ঠান্ডা পানি!”
নিরা হেডফোন খুলে হেসে বলে—
— “দুলাভাই, আপু কি ঘুমিয়েই যাবে পুরো রাস্তা?”
সাজু হাসে—
— “ও ঘুমালেই তো বুঝি, আমি পাশে আছি ঠিকঠাক।”
নিরা মুচকি হেসে জানালার বাইরে তাকায়।
তার চোখে একটা মুগ্ধতা—
দুলাভাইয়ের এমন রূপ সে আগে কখনও দেখেনি।
হয়তো চুপচাপ শিখে নিচ্ছে,
ভালোবাসা এমনটাও হতে পারে।
ট্রেন যখন পৌঁছায় গফরগাঁওয়ে
ট্রেনের ব্রেক কষে ধীরে ধীরে।
ইরার ঘুম ভাঙে ঝাঁকুনিতে।
সে ধীরে চোখ মেলে বলে—
— “পৌঁছে গেছি?”
সাজু কাঁধে আলতো হাত রাখে,
— “হ্যাঁ, আমরা ফিরেছি।”
স্টেশন প্ল্যাটফর্মে নামার পর ইরা সাজুর হাত ধরে হাঁটে, চারদিকে ইদের ভিড়, কিন্তু তাদের চারপাশে যেন সময় কিছুটা ধীর হয়ে গেছে।
সাজু মিশুক ভাড়া করে। এখান থেকে সুবর্ণপুর ২ কি.মি.।
মিশুকে ওঠার পর হাওয়ায় ওড়ানো সাদা ওড়না,
আলতা পরা পায়ে ধুলোর ছোঁয়া—
সব মিলিয়ে ইরা ভাবে,
এই ইদ শুধু কোরবানির না,
এটা ভালোবাসা ফিরিয়ে আনার এক উপলক্ষ।
সুবর্ণপুরের মাটিতে পা রাখার আগেই
সাজুর মনে হচ্ছিল—
মায়ের মুখটা কেমন হবে আজ?
খুশি? না অভিমানী?
রোদ্দুরের মধ্যে দিয়ে মিশুক ঢুকল উঠোনে।
উঠানের কিনারে একটা ডালিম গাছ, রশিতে শুকোতে দেওয়া শাড়ি, আর দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটা—
তার মা।
বয়স যেন একটু বেশি লেগে গেছে এখন মুখে,
তবু চোখদুটো ঠিক আগের মতোই উজ্জ্বল।
সাজু ঝপ করে নেমে পড়ে গাড়ি থেকে।
সোজা গিয়ে মায়ের পায়ের কাছে বসে পড়ে, বলে—
— “মা…”
মা যেন কথা খুঁজে পান না।
দু'হাত বাড়িয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন—
কাঁধে চাপা কণ্ঠে বলেন,
— “আমার ছেলে, আমার সোনা… কতদিন পর এলি রে…”
ইরা একটু আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল পাশে।
মা তখনই তাকান তার দিকে,
— “বউমা? তোমার মুখ তো আমি দেখি ছবিতে আর ভিডিয়ো কলে, আজ দেখছি কাছে থেকে!
তুমি যে আমার ছেলের জীবন বদলে দিয়েছ মা!”
ইরা মৃদু হাসে।
তারপর মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম করে।
মা ইরাকে টেনে বুকে জড়িয়ে নেন—
একটা গন্ধ লেগে থাকে তার গলার কাছে—
পুড়ে যাওয়া ধূপ, রান্নার ধোঁয়া আর আদুরে মাতৃত্বের।
— “তুমি আমার মেয়ের মতো। এসো মা, ঘরে এসো
তুমি তো আমার ঘরের চাঁদ এখন।”
ইরা অনুভব করে,
এই প্রথম সে কোনও বাড়িকে "নিজের মতো" মনে হচ্ছে।
এই বুকে জড়িয়ে ধরা মানুষটার স্পর্শে সে যেন একটু গলে যায়,
আর ভাবে—
—“আমি যে বড়ো ভাগ্যবতী।
বাড়ির উঠোনে তখন ঘন নিস্তব্ধতা।
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে—
ইদের আগের ক্লান্তিতে, পরদিনের খুশির অপেক্ষায়।
শুধু এক কোণে পাতানো বিছানায়
চুপচাপ শুয়ে আছে সাজু আর ইরা।
তারাদের ভিড়ে মধ্য আকাশে ঝুলে থাকা চাঁদটাকে
দুজনেই দেখে নীরব দৃষ্টিতে,
কিন্তু মনে মনে তারা হারিয়ে যাচ্ছে একে অপরের ভেতর।
ইরার মাথা সাজুর বাহুর ভাঁজে।
সাজুর আঙুল তার চুলে ধীরে ধীরে বুনে চলেছে নীরব অনুভব।
কোনো কথা নেই,
শুধু নিঃশ্বাসের ছন্দ মিলিয়ে মিলিয়ে বেজে ওঠে—
সাজু বলে, ধীর গলায়, কানের কাছে মুখ এনে—
— “তোমাকে ছুঁলে আমার ভিতরটা এমন শান্ত হয়ে যায়,
যেন পুরনো কোনো শেকড়ের কাছে ফিরে এসেছি।”
ইরা চোখ বন্ধ করে বলে—
— “তুমি কি জানো, আমার জীবনটা শুধু এই মুহূর্তের জন্যই জমিয়ে রেখেছিলাম…”
চাঁদের আলোয় ইরার গালজুড়ে ভেসে ওঠে নরম উষ্ণতা।
সাজুর হাত ধীরে ধীরে নামে তার বাহু ছুঁয়ে,
পায়ের পাতায় মিশে গিয়ে যেন বলে দেয়—
“এই আমি, তোমার প্রতিটি অস্থি-রক্তে জড়িয়ে থাকতে চাই।”
ইরা শরীর সঁপে দেয় সেই আলতো আগুনে।
তাদের স্পর্শ একে অপরকে ধীরে ধীরে গলিয়ে দেয়—
নির্জন উঠোনে যেন জেগে ওঠে
অন্তর্জাগতিক কোনো প্রণয়ের ইদ।
কোনো রাত্রি এত দীর্ঘ মনে হয়নি আগে।
তবু তারা চায়—
এই রাত থেমে থাকুক,
চাঁদ আটকে যাক সেই দিগন্তে,
তারারা শুয়ে থাকুক চোখের পাতায়
যেন ঘুমও ভিজে ওঠে প্রণয়ের উষ্ণতায়।
সাজু তার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়,
কথা গড়িয়ে পড়ে—
— “তুমিই আমার ইদ—
এই ছায়া, এই উষ্ণতা, এই নিঃশব্দ গলিয়ে যাওয়া…
বাকি সব কেবল পঞ্জিকার পাতায় লেখা তারিখ।”
তারা চুপচাপ একে অপরের হৃদয়ে গলে যায়—
নিঃশব্দে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে।
চাঁদ উপরে দাঁড়িয়ে থাকে
সাক্ষী হয়ে—
একটি বৈবাহিক প্রেমের মহোৎসবে।
আর যেন বলে যায়, “রাত পোহালেই ইদ।”
সমাপ্ত।।
#রৌদ্র ভেজা প্রেম # বাংলাগল্প #দাম্পত্যপ্রেম
❍ ২০২৫০৬০৭