দগ্ধ আঁচলের সাঁকো
—আশরাফ ইবনে আকন্দ
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ—
স্বপ্ন হাতে আসে শিশুরা,
নতুন পোশাকে, বইয়ের সুবাসে,
আলোর পানে হাঁটে তারা—
যেখানে সূর্য জাগে প্রতিশ্রুতির মতো।
হঠাৎ নিভে যায় সে সূর্য,
কার্বনের ধোঁয়ায় ঢাকা দিগন্ত,
নীল আকাশ কেঁদে ওঠে—
দুপুরে ফেরার কথা ছিল যাদের,
তারা ফিরেছে সন্ধ্যায়— কাফনের কোলে।
যাদের হাসির শব্দে মুখর ছিল প্রাঙ্গণ,
তাদের নাম লেখা হলো কালো হরফে—
ইতিহাসের হিম পাতায়।
যেখানে ছিল প্রাণের উচ্ছ্বাস,
সেখানেই নিঃশব্দ দাহ।
আকাশ থেকে নামে
বজ্রের ছদ্মবেশে যুদ্ধবিমান,
যার প্রশিক্ষণ মৃত্যুর পাঠ!
হে লৌহ-বীথির অন্ধ পাখি—
কর্মচঞ্চল নগরের জনারণ্যে,
বিদ্যালয়ের উঠোনে আগুনের স্তম্ভ তুলে
তুমি কী শেখাতে এলে?
অগ্নিতে ভস্ম— এই রাষ্ট্রের বিবেক।
স্কুল ড্রেসে আগুন— খাতায় পুড়ে যাচ্ছে বর্ণমালা,
কলমের ডগায় ছাই হয়ে পড়ে ইতিহাস,
স্কুলব্যাগে পোড়া মাংসের গন্ধ।
কেউ হেঁটে ফিরল দগ্ধ শরীরে,
আর যারা ফেরেনি—
তাদের চোখে এখন মৃত নীলাকাশ,
মা-বাবা ছুটে চলে হাহাকার বুকে—
হাসপাতালের করিডোরে ছড়িয়ে পড়ে কান্না।
আকাশ চেয়ে থাকে স্তব্ধ হয়ে—
তার চেয়ে মৌন শহর,
আর এরচেয়েও গভীর নিস্তব্ধতা
একটি মায়ের মৃত কোলে।
মাহরীন ম্যাডাম—
আপনি শিক্ষক নন কেবল,
আপনি এক উম্মুল মা'আরিফা,
এক আগুন-ঢাকা মমতা।
নিজেকে নিভিয়ে জ্বলালেন প্রদীপ,
পোড়া ওড়নায় ছায়া দিলেন শিশুদের,
মমতার আঁচল হয়ে উঠল সাঁকো—
শিশুরা নির্ভয়ে পার হলো আগুনের নদী ।
এই শহরে কেউ কথা রাখে না—
আপনি রাখলেন।
আপনার নাম লেখা রবে—
না, নিছক ফলকে নয়,
ভবিষ্যতের হৃদয়ে,
নির্মল শ্রদ্ধায়।
আর আমরা?
হাঁটি বারংবার একই অন্ধ গলিতে,
যেখানে মৃত্যু রুটিনের মতো—
ফিরে আসে কোনো সিলেবাস হয়ে!
❍ ২৫ জুলাই ২০২৫ খ্রি.
※
উৎসর্গ
২১ জুলাই ২০২৫ খ্রি., সোমবার রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় দগ্ধ হওয়া সেই সব নিষ্পাপ শিশুদের স্মৃতিতে—
যাদের জীবনের পাঠ বইয়ের পৃষ্ঠা ছুঁয়ে শেষ হবার কথা ছিল,
যাদের ফেরার কথা ছিল দুপুরবেলায়,
কিন্তু তারা ফিরেছে আগুনের সন্ধ্যায়,
একটি কাফনের নীরবতায়।
এবং—
মাহরীন ম্যাডামকে,
যিনি শিক্ষকতা নয়,
মাতৃত্বের এক অগ্নিস্নাত ছায়া হয়ে
নিজেকে নিঃশেষ করে
রক্ষা করেছেন অসংখ্য প্রাণ।
0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন