“একটি বিয়ের অভিযান”— এটা শুধু বিয়ের গল্প নয়; আত্মিক এক যাত্রা। এখানে হাসির মিহি রেখা মিশে থাকে হাহাকারে, ক্লান্তির পাশে এসে বসে ক্ষুধার সহজ স্বীকারোক্তি। গল্পের মধ্যমণি অর্ক এখানে কখনো বন্ধু, কখনো পথিক, কখনো নিঃশব্দ দর্শক— যার চোখের ভেতর দিয়ে বয়ে চলে সময়ের অনিবার্য স্রোত। যা ঘটে, যেমন ঘটে— ঠিক তেমন করেই আশরাফ ইবনে আকন্দ লিখেছেন জীবনের নরম পলিমাটির ছোঁয়ায় বাস্তবতার আখ্যান। প্রতিটি দৃশ্য পাঠকের সাথে হাঁটে, আর রেখে যায় প্রেমে ভেজা এক বিষণ্ন অনুভব— ভালো লাগা আর বিষাদের অনুপম মিশেল। ❍ লেখাপত্র
একটি বিয়ের অভিযান
👤 আশরাফ ইবনে আকন্দ
শেষ পর্ব
পূর্বে প্রকাশের পর>>>
ঘুম আর স্বপ্নের ঘোরে ভেসে যাওয়া রাত নিমিষেই ফুরিয়ে গেল। মসজিদ থেকে ভেসে এলো ফজরের আজান। জামাল সাহেব দরজার কাছে এসে অর্ককে ডেকে বললেন, নামাজের সময় হয়ে গেছে, উঠুন।
ঘুম তবু টেনে ধরে তাকে, স্বপ্নের মতো কোমল এক বেঁধন। ধীরে উঠে বসে। জামাল সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে অজু করে, কুয়াশা ঢাকা ভোরে হাঁটে দুজন— পাখিরা ডানা মেলতে শুরু করেনি। শহিদুল্লাহ, শাকিব, হাবিব, ইমনরা ডুবে আছে গভীর ঘুমে।
মসজিদ থেকে এসে দেখে সবাই ফিরে গেছে নাঈমদের উঠোনে। এখনো বাতাসে রয়ে গেছে নামাজের ধোঁয়া, ফজরের নরম গন্ধ।
অর্ক দাঁড়িয়ে থাকে, আলো আর ঘুমের মাঝে। সে বলে, “আমি আরেকটু থাকি।”
চোখে এখনো ঘুমের টলটলে ছায়া, শরীর বলছে— আরেকটু বিশ্রাম চাই।
অর্ক বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। ঘুম ধরা দেয় না,
এক অভিমানী প্রেমিকার মতো— আসবে আসবে করে, তবু দূরে সরে থাকে।
তবু আজ কোনো তাড়া নেই। ঘুম না এলেও, এই স্তব্ধ ভোরটুকু তার নিজের।
ঘুমের অভিমান বেশি দীর্ঘ হলো না। ক্লান্ত চোখে ঘুম নামল— নরম কুয়াশার মতো নিঃশব্দে।
চারপাশে মোলায়েম রোদ্দুর। দেওয়ালের গায়ে পিঁপড়ের সারি উঠে যাচ্ছে। জামের পাতায় জমে থাকা শিশির ধীরে ধীরে ঝরে পড়ছে। ছায়া পড়ে আছে কলাগাছের লম্বা পাতায়। ঝিম ধরা রোদে সেই ছায়াগুলোও যেন ঘুম ঘুম।
দূরে কোথাও বাসন মাজার আওয়াজ, ছেলেমেয়েরা লুকোচুরি খেলছে উঠোনের পাশে। কিন্তু অর্ক সেসবের কিছুই শুনছে না।
সে ঘুমিয়ে আছে— আর ঘুম তাকে ঢেকে রেখেছে অদৃশ্য চাদরে।
ঘড়ির কাঁটা সময় মেপে দিচ্ছে— এখন ঠিক সকাল নয়টা। মুঠোফোনের এলার্মে চমকে উঠে শরীর,
ঘুমের চাদর সরে যায়— বালিশে গড়িয়ে পড়ে এক ক্লান্ত পলকের মতো।
জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়ে রোদের ফালি, পাতার ছায়া যেন জানিয়ে যাচ্ছে— সকাল এসে গেছে, রোদ্দুর এখন উঠোনে পা রেখেছে। জেগে উঠছে ধুলো, পাখা ঝাড়া দিচ্ছে ঘুমন্ত হাওয়া।
অর্ক উঠে বসে। এক পেয়ালা ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের অভাব সে গভীরভাবে টের পায়। মনে হয়, চায়ের কাপটা হাতে না নিলে যেন দিন শুরুই হয় না।
এই চা-বিহীন সকালেও একধরনের নির্লিপ্ততা লেগে থাকে। মনে হয়, সে পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। শরীরটা উঠেছে ঠিকই, কিন্তু মনটা যেন এখনো ঘুমিয়ে আছে।
চোখমুখ ধুতে বেসিনে যায় অর্ক। পানির ছোঁয়ায় শরীরটা একটু চাঙা হয়। তার উশকোখুশকো বাবরি চুলগুলো প্রাণ ফিরে পায়, জেগে ওঠে। ঘুমের ক্লান্তি ধীরে ধীরে কেটে যায়।
ততক্ষণে পেটে খিদের টান পড়েছে। নাঈমদের বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু গেট বন্ধ। তালা ঝুলছে। জামাল সাহেবকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
কিছুক্ষণ পর তিনি এলেন। গেট খুলে ভদ্রতাভরে বললেন,
“বাবাজি, আইয়ুন আমার লগে নাস্তা করুইন। চিত্তা পিডা আর আডার রুডি-ডাইল রেডি।”
অর্ক বিনয়ের সাথে বলল,
“শুকরিয়া চাচা। নাঈমদের ওখানে সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। এখনই যেতে হবে।”
একটু থেমে যোগ করল,
রাতটা খুব ভালো কেটেছে। আপনার আতিথেয়তা মনে রাখব।
এই বলে অর্ক বেরিয়ে পড়ছে। জামাল সাহেব তার সাথেই এগিয়ে চলেছেন। তিনি লম্বা আলাপ জুড়ে দিলেন। তাঁর আলাপে অর্কর তেমন মনোযোগ নেই, তবুও শোনার ভান করে মাথা নাড়ছে, যেন গভীর মনোযোগে কথা শুনছে।
এক সময় মনে পড়ে যায় এক পরিচিত নাম— শামসুল। যিনি একবার কথা শুরু করলে থামেন না। অর্ক মনে মনে বলে ওঠে,
“এইডা দেহি আরেক পেছাল্লা শামসুল।”
জামাল সাহেবের কথা লম্বা হতে থাকে— অর্কর মুখে ক্রমাগত জমা হতে থাকে একটি অব্যক্ত বিরক্তি, যা নাগালের বাইরে নয়, তবুও সে তা লুকায়।
একটা মানুষ কীভাবে এত কথা বলতে পারে— বিরামহীন, বিনা প্রয়োজনে, বিনা বিনোদনে?
ঠিক তখনই শাকিব এসে পড়ে— হাঁপাতে হাঁপাতে, গলায় উত্তেজনার সুরে বলে,
“আংকেল, আমহে এতক্ষণ কই আচলাইন! আইয়ুন, আমহের লাইগা বেহেই অপেক্ষা হরতাছে!”
অর্ক যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেয়— এই নিঃশ্বাস শুধু বায়ুচলাচল নয়, মুক্তির ঘ্রাণ।
সে জামাল সাহেবের গদ্য থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়, যেমন পাঠক সরিয়ে নেয় চোখ কোনো বাজে গদ্যের বই থেকে।
“পেছাল্লা” শামসুলের কথার জালে জড়িয়ে পড়া এ একধরনের শব্দভিত্তিক নির্যাতন, যেখান থেকে উদ্ধারকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় শাকিব।
অর্ক মনে মনে শাকিবকে ধন্যবাদ জানায়—
কোনো ঝাঁঝ নয়, কোনো বাড়তি শব্দ নয়,
শুধু একরকম স্বস্তির মিহি প্রলেপের মতো একটুকরো কৃতজ্ঞতা।
❇
নাঈমদের উঠোনে পৌঁছে অর্ক। ভোরের আলো ফুটতেই নববধূকে দেখতে আসা পাড়া-পড়শি বউঝিদের আনাগোনার রেশ আছে এখনো— কেউ আসছে, কেউ যাচ্ছে— পিঁপড়ের মিছিলের মতো সুশৃঙ্খলভাবে।
উঠোন জুড়ে তীব্র রোদ্দুর। মাঘের আকাশে চৈত্রের রোদখেলা করছে। উঠোনের কোণ অস্থায়ী বাবুর্চিখানা— রান্নার ঘ্রাণ বাতাসে।
ঘ্রাণ এসে আছড়ে পড়ে নাকে— পেট ততক্ষণে বিদ্রোহী, ধৈর্য হারিয়েছে। ঠিক তখন, ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন খিচুড়ির থালা হাতে ঘরে ঢোকেন নাঈমের বড়ো বোন মাজেদা— যেন কোনো ঘরোয়া রন্ধনার্তিনী, যার হাতে আছে মানুষের ক্ষুধার উপশম।
চাল-ডাল-ধনেপাতার এক জৈব সম্মোহনে ভেসে ওঠে ছেলেবেলার এক গ্রামীণ সকাল। অনেক দিন পর জিব ছুঁয়েছে খিচুড়ি রসনা। অর্ক চোখ বন্ধ করে থামে— শৈশবের স্মৃতি যেন এক সকাল হয়ে ফিরে এসে তার সামনে দাঁড়ায়।
সূর্য মধ্য গগনে হাঁটছে। রোদ আর মুরগির ঝোল—দুইই ছড়ায় একধরনের ধোঁয়া—তাপে যেমন, ঘ্রাণেও তেমন।
কিশোরীরা পড়ে আছে সাজসজ্জা নিয়ে। তাকিয়া, কণা, রুনা আর মিম ব্যস্ত সময় পার করছে। মাজেদার মেয়ে মিম অর্কর নাতনি হয়। সদ্য কৈশোর পেরোনো মিমকে লাল শাড়িতে আজ যেন অন্য রকম লাগছে—চুলের খোঁপায় সাদা ফুল, কানে ছোট দুল, চোখে একটু কাজলের ছোঁয়া। পাখির বাসার মতো দুটো চোখ।
অর্ক চেয়ে থেকে একটু রসিকতার ছলে বলল,
“মাশাআল্লাহ! দুলাইনরে আজ মেলা সুন্দর লাগতাছে!”
মিম লজ্জায় লাল হয়ে যেন বেদানার মতো ফেটে যাচ্ছে। মাথা নিচু করে আঁচলে মুখ ঢেকে হাসিটা লুকানোর চেষ্টা করছে।
আয়নার সামনে ভিড়। কেউ ঠোঁটে হালকা লিপজেল দেয়, কেউ কাজল টানে, কেউ আবার শুধু দাঁড়িয়ে থাকে—চোখেমুখে নতুন কিছু হয়ে ওঠার আনন্দ।
চুড়ির ঝনঝন, খিলখিল হাসি, আর ঘরের কোণে রাখা মোবাইলের ক্যামেরায় টুপটাপ সেলফি—সব মিলিয়ে যেন এও এক অন্যরকম উৎসব।
দুপুর দুটো। চেয়ার টানা, থালা সাজানো, গ্লাসে পানি পড়ার টুপটাপ শব্দ—সব মিলিয়ে যেন এক অভ্যস্ত কোরিওগ্রাফি, প্রতিটি পদক্ষেপ বহুবার দেখা।
উঠোনজুড়ে মেহমানেরা একে একে এসে বসেছে।
মুখরতা বাড়ছে ধীরে ধীরে—যেন বহুদিন পর দেখা মানুষদের কিছু বলার আছে, আবার না বললেও চলে।
অর্ক চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। কেউ মোবাইলে ছবি তোলে, কেউ থালায় সালাদের গোল টুকরোগুলো এমনভাবে সাজায়, যেন তা খাওয়ার জন্য নয়, সাজানোর জন্যই জন্ম।
খাবার পরিবেশন শুরু হয়। সবজি, মুরগির রোস্ট, গরুর ঝোল, পোলাও— প্রতিটি পদ রঙে, ঘ্রাণে, স্মৃতিতে মেখে আছে অতীতের কোনো দুপুর। এ যেন শুধু খাওয়ার আয়োজন নয়— মানুষ একেকজন নিজের অবস্থান ধরে রাখছে স্মৃতির ভেতর।
অর্কও খেতে বসেছে। থালায় সাজানো নানা পদ। সব যেন একেকটা গল্প— রঙের, স্মৃতির, উৎসবের।
তবু অর্ক সেগুলো ছুঁয়ে দেখে না।
সে রুই মাছের ঝোল আর ডালে পোলাও মেখে খায়— ধীরে, মনোযোগে, যেন প্রতিটি গ্রাসে অতীতের কোনো দুপুরকে আবার খুঁজে পায় অর্ক।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ আর ডাক্তারের কড়া বারণে জীবনের সবচেয়ে সুস্বাদু খাবারগুলোই নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে— শেষ পর্যন্ত খাওয়া হয় না।
অর্ক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে।
"মনে হয় খাওয়া নয়, দেখাটাই এখনকার অপার এক উৎসব...!"
অর্ক চারপাশে তাকায়— থেমে নেই সময়ের বহতা। ধীরে ধীরে বিবাহোত্তর পঙ্ক্তিভোজ উৎসব পরিসমাপ্তির দিকে হাঁটছে। সূর্যটা ধীরে ধীরে পশ্চিমের গন্তব্যে পা ফেলছে।
উৎসবের চূড়া এখন গোধূলির দিকে ঢলে পড়ছে। বাড়ির উঠোন এখন নিস্তব্ধ— প্যান্ডেলের নিচে পড়ে আছে কেবল নিঃসঙ্গ কিছু চেয়ার আর খাবারের শেষ গন্ধ।
মেহমানরা একে একে বিদায় নিচ্ছে। সেলাইয়ের সুতো খুলে যাওয়ার মতো— এক এক করে সব বন্ধন আলগা হয়ে যাচ্ছে।
দিন হোক আনন্দের, কিংবা বিষাদের— দিন শেষে গোধূলি নামবেই। সবকিছুরই একটা শেষ আছে— নক্ষত্রও একদিন ঝরে পড়ে, আকাশও একদিন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।
এখন অর্কও ফিরে যাচ্ছে। পেছনে ফেলে যাচ্ছে সে এক রৌদ্রছায়ার দিন— যেখানে নাঈম-সাদিয়ার দাম্পত্য জন্ম নিচ্ছে পলিমাটির কোমল বুকে।
সঙ্গে রেখে যাচ্ছে, এক ফালি কাঁচা আমের মতো তাজা শুভকামনা— পথচলা হোক গঙ্গার ধারে রক্তরাঙা শালুকের মতো— পবিত্র, দীপ্ত, আর মায়ায় মোড়ানো।
প্রতিটি সকাল যেন খুলে দেয় নতুন পাতার মতন, যেখানে লেখা থাকবে একে অন্যকে ভালোবাসার অনুপম ভাষা।
আশীর্বাদ যেন নামে ধানের গন্ধ হয়ে, মায়ের আঁচল হয়ে, আর চোখের কোণে জমে থাকা অব্যক্ত ভালোবাসা হয়ে।
※
🌼 সমাপ্ত