উগ্রতার বিষ

ধর্ম মানুষের আত্মার আলো, নৈতিকতার দিশারি। কিন্তু যখন ধর্মের নামে উগ্রতা, সহিংসতা আর বিভ্রান্তি জন্ম নেয়, তখন সেই আলো অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যায়। 
আশরাফ ইবনে আকন্দ তাঁর“ উগ্রতার বিষ” কবিতায় সেই অন্ধকারময় উগ্রতার বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছেন। মৃতের প্রতি অমানবিকতা, ধর্মের শুভ্রতায় কলঙ্ক, এবং বিভ্রান্তির রক্তে ছড়িয়ে পড়া বিষ—এসবকে তিনি শাণিত ভাষায় চিত্রিত করেছেন। কবিতাটি কেবল এক প্রতিবাদ নয়; এটি মানবতার পক্ষ থেকে উচ্চারিত এক চূড়ান্ত আহ্বান—“ধার্মিক হওয়ার আগে মানুষ হয়ে ওঠো।”   
  লেখাপত্র 

উগ্রতার বিষ

👤 আশরাফ ইবনে আকন্দ 

নিদারুণ করুণ দৃশ্যে স্তব্ধ পৃথিবী—
পদ্মার তীরে উন্মত্ত নরকুল
মৃতাশ্মীর দাহে সমাধি ভাঙে।

সমাধিস্থ না হয় ছিল ভ্রান্ত আকিদায়;
তুমি কেন আকলহারা,
হে মৃত আত্মা বহনকারী মানব?

কী জানাতে চাও দুনিয়াকে—
মুসলমান কেবল বর্বর?
অসভ্য, নির্মম, ইতর?

না, জগৎ জানে না—
এ বিভ্রান্তি তোমার,
এ উগ্রতার বিষ তোমারই রক্তে।

ধর্মের শুভ্র চাদরে 
এঁকেছো বর্বরতার নগ্ন দাগ—
কার শেখানো এ অন্ধ অগ্নিপাঠ?

হে পাষাণ জগদ্দল,
ধর্মের ঢাক না বাজিয়ে
মানবতার সিঁড়ি বেয়ে ওঠো—
ধার্মিক হওয়ার আগে
মানব হয়ে ফোটো।


❍ #উগ্রতার বিষ #২৮/০৯/২০২৫ খ্রি. 

একটি বিয়ের অভিযান-০৪


“একটি বিয়ের অভিযান”— এটা শুধু বিয়ের গল্প নয়; আত্মিক এক যাত্রা। এখানে হাসির মিহি রেখা মিশে থাকে হাহাকারে, ক্লান্তির পাশে এসে বসে ক্ষুধার সহজ স্বীকারোক্তি। গল্পের মধ্যমণি অর্ক এখানে কখনো বন্ধু, কখনো পথিক, কখনো নিঃশব্দ দর্শক— যার চোখের ভেতর দিয়ে বয়ে চলে সময়ের অনিবার্য স্রোত। যা ঘটে, যেমন ঘটে— ঠিক তেমন করেই আশরাফ ইবনে আকন্দ লিখেছেন জীবনের নরম পলিমাটির ছোঁয়ায় বাস্তবতার আখ্যান। প্রতিটি দৃশ্য পাঠকের সাথে হাঁটে, আর রেখে যায় প্রেমে ভেজা এক বিষণ্ন অনুভব— ভালো লাগা আর বিষাদের অনুপম মিশেল।     ❍ লেখাপত্র 


একটি বিয়ের অভিযান 

👤 আশরাফ ইবনে আকন্দ 

শেষ পর্ব 
পূর্বে প্রকাশের পর>>>
ঘুম আর স্বপ্নের ঘোরে ভেসে যাওয়া রাত নিমিষেই ফুরিয়ে গেল। মসজিদ থেকে ভেসে এলো ফজরের আজান। জামাল সাহেব দরজার কাছে এসে অর্ককে ডেকে বললেন, নামাজের সময় হয়ে গেছে, উঠুন।

ঘুম তবু টেনে ধরে তাকে, স্বপ্নের মতো কোমল এক বেঁধন। ধীরে উঠে বসে। জামাল সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে অজু করে, কুয়াশা ঢাকা ভোরে হাঁটে দুজন— পাখিরা ডানা মেলতে শুরু করেনি। শহিদুল্লাহ, শাকিব, হাবিব, ইমনরা ডুবে আছে গভীর ঘুমে। 

মসজিদ থেকে এসে দেখে সবাই ফিরে গেছে নাঈমদের উঠোনে। এখনো বাতাসে রয়ে গেছে নামাজের ধোঁয়া, ফজরের নরম গন্ধ।

অর্ক দাঁড়িয়ে থাকে, আলো আর ঘুমের মাঝে। সে বলে, “আমি আরেকটু থাকি।”

চোখে এখনো ঘুমের টলটলে ছায়া, শরীর বলছে— আরেকটু বিশ্রাম চাই।

অর্ক বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। ঘুম ধরা দেয় না,
এক অভিমানী প্রেমিকার মতো— আসবে আসবে করে, তবু দূরে সরে থাকে।

তবু আজ কোনো তাড়া নেই। ঘুম না এলেও, এই স্তব্ধ ভোরটুকু তার নিজের।

ঘুমের অভিমান বেশি দীর্ঘ হলো না। ক্লান্ত চোখে ঘুম নামল— নরম কুয়াশার মতো নিঃশব্দে।

চারপাশে মোলায়েম রোদ্দুর। দেওয়ালের গায়ে পিঁপড়ের সারি উঠে যাচ্ছে। জামের পাতায় জমে থাকা শিশির ধীরে ধীরে ঝরে পড়ছে। ছায়া পড়ে আছে কলাগাছের লম্বা পাতায়। ঝিম ধরা রোদে সেই ছায়াগুলোও যেন ঘুম ঘুম।

দূরে কোথাও বাসন মাজার আওয়াজ, ছেলেমেয়েরা লুকোচুরি খেলছে উঠোনের পাশে। কিন্তু অর্ক সেসবের কিছুই শুনছে না।

সে ঘুমিয়ে আছে— আর ঘুম তাকে ঢেকে রেখেছে অদৃশ্য চাদরে।

ঘড়ির কাঁটা সময় মেপে দিচ্ছে— এখন ঠিক সকাল নয়টা। মুঠোফোনের এলার্মে চমকে উঠে শরীর,
ঘুমের চাদর সরে যায়— বালিশে গড়িয়ে পড়ে এক ক্লান্ত পলকের মতো।

জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়ে রোদের ফালি, পাতার ছায়া যেন জানিয়ে যাচ্ছে— সকাল এসে গেছে, রোদ্দুর এখন উঠোনে পা রেখেছে। জেগে উঠছে ধুলো, পাখা ঝাড়া দিচ্ছে ঘুমন্ত হাওয়া।

অর্ক উঠে বসে। এক পেয়ালা ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের অভাব সে গভীরভাবে টের পায়। মনে হয়, চায়ের কাপটা হাতে না নিলে যেন দিন শুরুই হয় না।

এই চা-বিহীন সকালেও একধরনের নির্লিপ্ততা লেগে থাকে। মনে হয়, সে পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। শরীরটা উঠেছে ঠিকই, কিন্তু মনটা যেন এখনো ঘুমিয়ে আছে।

চোখমুখ ধুতে বেসিনে যায় অর্ক। পানির ছোঁয়ায় শরীরটা একটু চাঙা হয়। তার উশকোখুশকো বাবরি চুলগুলো প্রাণ ফিরে পায়, জেগে ওঠে। ঘুমের ক্লান্তি ধীরে ধীরে কেটে যায়।

ততক্ষণে পেটে খিদের টান পড়েছে। নাঈমদের বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু গেট বন্ধ। তালা ঝুলছে। জামাল সাহেবকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
কিছুক্ষণ পর তিনি এলেন। গেট খুলে ভদ্রতাভরে বললেন,
“বাবাজি, আইয়ুন আমার লগে নাস্তা করুইন। চিত্‌তা পিডা আর আডার রুডি-ডাইল রেডি।”

অর্ক বিনয়ের সাথে বলল,
“শুকরিয়া চাচা। নাঈমদের ওখানে সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। এখনই যেতে হবে।”

একটু থেমে যোগ করল,
রাতটা খুব ভালো কেটেছে। আপনার আতিথেয়তা মনে রাখব।

এই বলে অর্ক বেরিয়ে পড়ছে। জামাল সাহেব তার সাথেই এগিয়ে চলেছেন। তিনি লম্বা আলাপ জুড়ে দিলেন। তাঁর আলাপে অর্কর তেমন মনোযোগ নেই, তবুও শোনার ভান করে মাথা নাড়ছে, যেন গভীর মনোযোগে কথা শুনছে। 

এক সময় মনে পড়ে যায় এক পরিচিত নাম— শামসুল। যিনি একবার কথা শুরু করলে থামেন না। অর্ক মনে মনে বলে ওঠে,
“এইডা দেহি আরেক পেছাল্লা শামসুল।”

জামাল সাহেবের কথা লম্বা হতে থাকে— অর্কর মুখে ক্রমাগত জমা হতে থাকে একটি অব্যক্ত বিরক্তি, যা নাগালের বাইরে নয়, তবুও সে তা লুকায়।

একটা মানুষ কীভাবে এত কথা বলতে পারে— বিরামহীন, বিনা প্রয়োজনে, বিনা বিনোদনে?

ঠিক তখনই শাকিব এসে পড়ে— হাঁপাতে হাঁপাতে, গলায় উত্তেজনার সুরে বলে,
“আংকেল, আমহে এতক্ষণ কই আচলাইন! আইয়ুন, আমহের লাইগা বেহেই অপেক্ষা হরতাছে!”

অর্ক যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেয়— এই নিঃশ্বাস শুধু বায়ুচলাচল নয়, মুক্তির ঘ্রাণ।

সে জামাল সাহেবের গদ্য থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়, যেমন পাঠক সরিয়ে নেয় চোখ কোনো বাজে গদ্যের বই থেকে।

“পেছাল্লা” শামসুলের কথার জালে জড়িয়ে পড়া এ একধরনের শব্দভিত্তিক নির্যাতন, যেখান থেকে উদ্ধারকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় শাকিব।

অর্ক মনে মনে শাকিবকে ধন্যবাদ জানায়—
কোনো ঝাঁঝ নয়, কোনো বাড়তি শব্দ নয়,
শুধু একরকম স্বস্তির মিহি প্রলেপের মতো একটুকরো কৃতজ্ঞতা।


নাঈমদের উঠোনে পৌঁছে অর্ক। ভোরের আলো ফুটতেই নববধূকে দেখতে আসা পাড়া-পড়শি বউঝিদের আনাগোনার রেশ আছে এখনো— কেউ আসছে, কেউ যাচ্ছে— পিঁপড়ের মিছিলের মতো সুশৃঙ্খলভাবে। 

উঠোন জুড়ে তীব্র রোদ্দুর। মাঘের আকাশে চৈত্রের রোদখেলা করছে। উঠোনের কোণ অস্থায়ী বাবুর্চিখানা— রান্নার ঘ্রাণ বাতাসে।  

ঘ্রাণ এসে আছড়ে পড়ে নাকে— পেট ততক্ষণে বিদ্রোহী, ধৈর্য হারিয়েছে। ঠিক তখন, ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন খিচুড়ির থালা হাতে ঘরে ঢোকেন নাঈমের বড়ো বোন মাজেদা— যেন কোনো ঘরোয়া রন্ধনার্তিনী, যার হাতে আছে মানুষের ক্ষুধার উপশম।

চাল-ডাল-ধনেপাতার এক জৈব সম্মোহনে ভেসে ওঠে ছেলেবেলার এক গ্রামীণ সকাল। অনেক দিন পর জিব ছুঁয়েছে খিচুড়ি রসনা। অর্ক চোখ বন্ধ করে থামে— শৈশবের স্মৃতি যেন এক সকাল হয়ে ফিরে এসে তার সামনে দাঁড়ায়। 

সূর্য মধ্য গগনে হাঁটছে। রোদ আর মুরগির ঝোল—দুইই ছড়ায় একধরনের ধোঁয়া—তাপে যেমন, ঘ্রাণেও তেমন।

কিশোরীরা পড়ে আছে সাজসজ্জা নিয়ে। তাকিয়া, কণা, রুনা আর মিম ব্যস্ত সময় পার করছে।   মাজেদার মেয়ে মিম অর্কর নাতনি হয়। সদ্য কৈশোর পেরোনো মিমকে লাল শাড়িতে আজ যেন অন্য রকম লাগছে—চুলের খোঁপায় সাদা ফুল, কানে ছোট দুল, চোখে একটু কাজলের ছোঁয়া। পাখির বাসার মতো দুটো চোখ।
 
অর্ক চেয়ে থেকে একটু রসিকতার ছলে বলল, 
“মাশাআল্লাহ! দুলাইনরে আজ মেলা সুন্দর লাগতাছে!”

মিম লজ্জায় লাল হয়ে যেন বেদানার মতো ফেটে যাচ্ছে। মাথা নিচু করে আঁচলে মুখ ঢেকে হাসিটা লুকানোর চেষ্টা করছে। 

আয়নার সামনে ভিড়। কেউ ঠোঁটে হালকা লিপজেল দেয়, কেউ কাজল টানে, কেউ আবার শুধু দাঁড়িয়ে থাকে—চোখেমুখে নতুন কিছু হয়ে ওঠার আনন্দ।

চুড়ির ঝনঝন, খিলখিল হাসি, আর ঘরের কোণে রাখা মোবাইলের ক্যামেরায় টুপটাপ সেলফি—সব মিলিয়ে যেন এও এক অন্যরকম উৎসব।


দুপুর দুটো। চেয়ার টানা, থালা সাজানো, গ্লাসে পানি পড়ার টুপটাপ শব্দ—সব মিলিয়ে যেন এক অভ্যস্ত কোরিওগ্রাফি, প্রতিটি পদক্ষেপ বহুবার দেখা।

উঠোনজুড়ে মেহমানেরা একে একে এসে বসেছে।
মুখরতা বাড়ছে ধীরে ধীরে—যেন বহুদিন পর দেখা মানুষদের কিছু বলার আছে, আবার না বললেও চলে।

অর্ক চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। কেউ মোবাইলে ছবি তোলে, কেউ থালায় সালাদের গোল টুকরোগুলো এমনভাবে সাজায়, যেন তা খাওয়ার জন্য নয়, সাজানোর জন্যই জন্ম।

খাবার পরিবেশন শুরু হয়। সবজি, মুরগির রোস্ট, গরুর ঝোল, পোলাও— প্রতিটি পদ রঙে, ঘ্রাণে, স্মৃতিতে মেখে আছে অতীতের কোনো দুপুর। এ যেন শুধু খাওয়ার আয়োজন নয়— মানুষ একেকজন নিজের অবস্থান ধরে রাখছে স্মৃতির ভেতর।

অর্কও খেতে বসেছে। থালায় সাজানো নানা পদ। সব যেন একেকটা গল্প— রঙের, স্মৃতির, উৎসবের।
তবু অর্ক সেগুলো ছুঁয়ে দেখে না। 

সে রুই মাছের ঝোল আর ডালে পোলাও মেখে খায়— ধীরে, মনোযোগে, যেন প্রতিটি গ্রাসে অতীতের কোনো দুপুরকে আবার খুঁজে পায় অর্ক। 

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ আর ডাক্তারের কড়া বারণে জীবনের সবচেয়ে সুস্বাদু খাবারগুলোই নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে— শেষ পর্যন্ত খাওয়া হয় না।  

অর্ক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে।
"মনে হয় খাওয়া নয়, দেখাটাই এখনকার অপার এক উৎসব...!"

অর্ক চারপাশে তাকায়— থেমে নেই সময়ের বহতা। ধীরে ধীরে বিবাহোত্তর পঙ্‌ক্তিভোজ উৎসব পরিসমাপ্তির দিকে হাঁটছে। সূর্যটা ধীরে ধীরে পশ্চিমের গন্তব্যে পা ফেলছে। 

উৎসবের চূড়া এখন গোধূলির দিকে ঢলে পড়ছে। বাড়ির উঠোন এখন নিস্তব্ধ— প্যান্ডেলের নিচে পড়ে আছে কেবল নিঃসঙ্গ কিছু চেয়ার আর খাবারের শেষ গন্ধ। 

মেহমানরা একে একে বিদায় নিচ্ছে। সেলাইয়ের সুতো খুলে যাওয়ার মতো— এক এক করে সব বন্ধন আলগা হয়ে যাচ্ছে।

দিন হোক আনন্দের, কিংবা বিষাদের— দিন শেষে গোধূলি নামবেই। সবকিছুরই একটা শেষ আছে— নক্ষত্রও একদিন ঝরে পড়ে, আকাশও একদিন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।

এখন অর্কও ফিরে যাচ্ছে। পেছনে ফেলে যাচ্ছে সে এক রৌদ্রছায়ার দিন— যেখানে নাঈম-সাদিয়ার দাম্পত্য জন্ম নিচ্ছে পলিমাটির কোমল বুকে।

সঙ্গে রেখে যাচ্ছে, এক ফালি কাঁচা আমের মতো তাজা শুভকামনা— পথচলা হোক গঙ্গার ধারে রক্তরাঙা শালুকের মতো— পবিত্র, দীপ্ত, আর মায়ায় মোড়ানো।

প্রতিটি সকাল যেন খুলে দেয় নতুন পাতার মতন, যেখানে লেখা থাকবে একে অন্যকে ভালোবাসার অনুপম ভাষা।

আশীর্বাদ যেন নামে ধানের গন্ধ হয়ে, মায়ের আঁচল হয়ে, আর চোখের কোণে জমে থাকা অব্যক্ত ভালোবাসা হয়ে।

🌼 সমাপ্ত


       একটি বিয়ের অভিযান-০৩                  


একটি বিয়ের অভিযান-০৩


“একটি বিয়ের অভিযান”— এটা শুধু বিয়ের গল্প নয়; আত্মিক এক যাত্রা। এখানে হাসির মিহি রেখা মিশে থাকে হাহাকারে, ক্লান্তির পাশে এসে বসে ক্ষুধার সহজ স্বীকারোক্তি। গল্পের মধ্যমণি অর্ক এখানে কখনো বন্ধু, কখনো পথিক, কখনো নিঃশব্দ দর্শক— যার চোখের ভেতর দিয়ে বয়ে চলে সময়ের অনিবার্য স্রোত। যা ঘটে, যেমন ঘটে— ঠিক তেমন করেই  ‘আশরাফ ইবনে আকন্দ’  লিখেছেন জীবনের নরম পলিমাটির ছোঁয়ায় বাস্তবতার আখ্যান। প্রতিটি দৃশ্য পাঠকের সাথে হাঁটে, আর রেখে যায় প্রেমে ভেজা এক বিষণ্ন অনুভব— ভালো লাগা আর বিষাদের অনুপম মিশেল।


একটি বিয়ের অভিযান

👤 আশরাফ ইবনে আকন্দ 

পর্ব-০৩
পূর্বে প্রকাশের পর>>>
ওশ মাখা বাতাসের ঝাপটা মাঝেমধ্যে মনে করিয়ে দিচ্ছে মাঘের কথা। দারোয়ানের মতো কুয়াশা ছড়িয়ে আছে চারপাশে। ঘাসের গায়ে শিশির ঝরছে মুক্তোর মতো। 

মাঘের রাত হলেও আজ শীতের তেমন দাপট নেই। রাত বাড়ছে। কমছে বিয়ে বাড়ির কোলাহল। 

বিবাহোত্তর পঙ্‌ক্তিভোজ আয়োজনের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। রাত দশটায় হঠাৎ আয়োজনের তোড়জোড়। ছিমছাম ঘরোয়া আয়োজন। বাজারের ফর্দও তৈয়ার।

নাঈমের ভগিনীপতি শহিদুল্লাহ আর চাচাতো ভাই আসিফকে বাজারে পাঠানো হলো। পরে আরেক দফা বাজারে গেছেন নাঈমের বাবা-কাকা। 

রাত অনেক হয়েছে ফর্দের সবকিছু কেনা যায়নি, আগামীকাল সকালে বাকিটা দেখা যাবে। 

সকালের কেনাকাটার দায়িত্বটা পড়ল আসিফ আর শহিদুল্লাহর কাঁধে। শহিদুল্লাহর ওপর ভালোই ধকল গেছে, শ্যালকের বিয়েতে দম ফেলার ফুরসত পায়নি সে।

এদিকে সাদিয়াকে দেখতে তাদের বাড়ি থেকে তার চাচাসহ কয়েক জন এসেছেন। সময় মেলা গড়িয়েছে, জল-খাবার না খেয়েই তাঁরা চলে যাবেন যাবেন করছেন। 

আত্মীয় নতুন হোক কিংবা পুরোনো না খেয়ে চলে যাওয়াটা ভালো দেখায় না।

মফ‍‍স‍‍্‍‍সলে চাইলেই হুট করে কিছু করাও যায় না। তাঁরা না জানিয়েই চলে এসেছেন। চা-নাশতার ব্যবস্থা করতে দেরি হচ্ছে। 

মেহমানদের দু-জন অর্কের পূর্বপরিচিত। অর্ক তাঁদের পিঠ চাপড়ে বলেকয়ে আটকালো। 

রাভিন ছয়টি নুডলসের প্লেট নিয়ে হাজির হয়েছে, কিন্তু লোক আট জন। অর্ক রান্নাঘরে এসে জর্জর গলায় বলল, আরও দুটো প্লেট লাগবে। 

শাকিবকে দিয়ে দুটো প্লেট পাঠানো হয়েছে ঠিকই, এগুলো সেমাইয়ের প্লেট। খাবার পরিবেশনে ভালোই তালগোল লেগে গেল। এ নিয়ে মেহমানদের ঠোঁটে চাপা হাসি। 

এমনকি বাপের বাড়ির মানুষজনের সাথে সাদিয়াও হেসে ফেলল, গালের দু’পাশে কুসুমকুসুম ঢেউ উঠল।

কেউ একজন অর্ককে বলল, আপনি একটু ম্যানেজ করুন। বড়ো মুখ করে সেধেসুধে তাদের আটকালো— এ অব্যবস্থাপনায় অর্কর লজ্জা করছে। তাদের সামনে দাঁড়ানোর মুখ নেই তার। 

নাঈমদের বাড়ির দেউড়ি ঘেঁষে বয়ে গেছে একটি  জলধারা। খাল নয়, আবার নদীও নয়— তবু তার প্রবাহে ছিল নদীর মতো গাম্ভীর্য। 

অর্ক আর মেহমানদের সামনে দাঁড়ায়নি। মুখ ফিরিয়ে নদীর দিকে হেঁটে গেল— যেন হাওয়া খুঁজছে, অথবা নিজেকে লুকোচ্ছে ঢেউয়ের ফিসফাসে।

অর্ক যখন বাড়ির বাইরে কোথাও যায় প্রায়ই একটি মেয়েকে দেখতে পায়। মেয়েটি তার সাথে কথা বলে। তাকে ছাড়া কেউ ওকে দেখতে পায় না। 

ওর নাম এলিতা। অর্ক নদীর পাড়ে একটা গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আনমনে। 

তার দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হচ্ছে। দৃষ্টি ঝাপসা হলে ভাবের বিহ্বলতা তাকে ঘিরে ধরে— অর্কর জগৎটা তখন বদলে যায়। চোখে ভেসে ওঠে এলিতা। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে এমনই মনে হচ্ছে। 

এখন এলিতাকে সে দেখতে পাচ্ছে। চোখের সামনে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে— নদীতে ডিঙি নৌকা ভাসছে। 

নৌকোর গলুইয়ে পা দুলিয়ে বসে আছে এলিতা। তার পায়ের দুলুনির আঘাতে ছলাৎ ছলাৎ অনুকার বেজে উঠেছে নদীর জলে। 

নৌকের অপরপ্রান্তে বসে আছে অর্ক। এলিতা এমনিতেই পুতুলের মতো দেখতে। পরির মতো সুন্দর। অন্য দিনের চেয়ে এলিতাকে আজ সুন্দর লাগছে। সব সাজেই শিশুদের সুন্দর লাগে। 

গভীর ভাবাবেগে আচ্ছন্ন অর্কর ইচ্ছে হলো এলিতার ছবি আঁকবে। ঘড়িতে সময় সাড়ে দশটা, তিমিররাত্রি অথচ অর্কের মনোজগতে তখনও গোধূলিলগ্ন, পশ্চিমে গোলগাল সূর্য ডুবি ডুবি করছে। 

ভাবের জগৎ বড়ো প্রশস্ত। এই জগৎ ‘নিয়ম-কানুন, যুক্তি-তর্ক ও সীমাবদ্ধতা’ সবকিছুর ঊর্ধ্বে— এখানে সব সম্ভব। 

অর্ক তার ঝুলি থেকে রংতুলি বের করে আঁকতে আরম্ভ করল। এলিতার পোশাক-পরিচ্ছদ গোলাপি রঙের। রেশমি সুতার মতো সোনালি চুল। 

দুই কাঁধ হয়ে সামনের দিকে ছড়িয়ে আছে দুটি বিনুনি। বিনুনির লেসের রংও গোলাপি। তলোয়ারের মতো খাড়া নাক। মোনালিসার মতো হাসি। 

ছবি আঁকা শেষ। দারুণ হয়েছে ছবিটা। সবকিছুই ঠিকঠাক এঁকেছে। ঠোঁটের রংটা শুধু করা হয়নি। 

বিয়েতে মিম, সাদিয়া থেকে তাকিয়া, কণা থেকে রুনা, চেনা কিংবা অচেনা সবার ঠোঁটে লাল লিপিস্টক। সবার বসনভূষণ ভিন্ন কিন্তু লিপিস্টিক অভিন্ন। 

কাজেই এলিতার ছবিতেও লাল রঙের লিপিস্টিক চাই। কিন্তু লাল রং খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। লিপিস্টিক ছাড়া ছবিটি অসম্পূর্ণ লাগছে। 

অনন্যোপায় হয়ে ঠোঁটে গোলাপি রঙের আঁচড় টানলো অর্ক। গোলাপি লিপিস্টিকে এলিতাকে বিশ্রী লাগছে। 

নদীর ঢেউ এখনো দুলছে, কিন্তু সেই ডিঙি নৌকা, সেই এলিতা এখন নেই। অর্কর মনোজগতের বিহ্বলতায় ফাটল ধরাল সাদিয়ার চাচা এবং তাঁর সঙ্গীদের মোটরযানের ছুটে চলা শ্রীহীন আওয়াজ। বাস্তবের কংক্রিট আওয়াজ স্বপ্নের কোমল রং মুছে দিলো এক ঝটকায়।

অর্ক ধীরে পা বাড়াল। পেছনে পড়ে রইল নদীর ঢেউ, সেই রংতুলি, আর এলিতার অসম্পূর্ণ ঠোঁট। সে ফিরেছে— নাঈমদের বাড়িতে। 

বাড়ির উঠোন আলো ঝলমলে, কিন্তু তার ভেতরে তখনো কিছুটা আঁধার রয়ে গেছে— খুব খিদে পেয়েছে। কাউকে বলতে পারছে না। 

এগারোটা বেজে গেছে। এমনিতে সে বারোটার পর ঘুমোতে যায়, আজ আগেভাগেই চোখ ছোটো হয়ে আসছে। রাজ্যের ঘুম নেমেছে চোখে। পেটে খিদে নিয়ে ঘুমোতে ইচ্ছে করছে না।

রান্নাঘর থেকে কুয়াশার ধোঁয়ার মতো মুরগির মাংসের ঘ্রাণ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে রাতের ঠান্ডা বাতাসে। পেটে খিদে মুখে লাজ— এর কোনো মানে হয় না। 

অর্ক রান্নাঘরের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে খানিকটা লজ্জা, খানিকটা ক্ষুধা নিয়ে নাঈমের বড়ো বোনের দ্বারস্থ হয়ে বলল, ‘খিদা লাগছে শ্বশ্রূমা, খাওন দেইন।’ 

শ্বশ্রূমা একগাল হেসে বললেন, 'আমহে তো মুরগি খাইন না— আমহের লাইগ্‌গা আলদা কিছু কইরা দেই। ইট্টু সবুর করুইন।'

সবুরটুকুই যেন সবচেয়ে মিষ্টি সময়। একটু পরেই, অনেকটা মমতার মতো ধোঁয়া তুলে হাজির হলো থালা— গরম ভাত, একটুখানি ডিমভাজি, পাতলা মসুর ডাল আর পাশে দুটো ডাসা কাঁচা মরিচ। 

কাঁচা মরিচে যেন চাঁদের আলো লেগে টলমল করছে, আর ডালের গন্ধে মন ভরে যাচ্ছে গাঁয়ের ঘরের স্মৃতিতে। 

বাকি সবাই মুরগির ঝোলে চামচ ডুবাচ্ছে। অবাক করার মতো ব্যাপার— ঘড়ির কাঁটা সাড়ে এগারো ছুঁইছুঁই, অথচ বর-কনে এখনো ফুলশয্যার কক্ষে পা রাখেনি। 

কাল দুপুরের আকস্মিক আয়োজনের ঝামেলা সামলাতে সামলাতে রাত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সবকিছুর দেখভাল নাঈমকেই করতে হচ্ছে। 

ফুলশয্যার ঘর যেন নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে। বালিশের গা ঘেঁষে গাঁদাফুলের গন্ধ জমাট বেঁধে আছে। চাদরের উপরে ছড়িয়ে রাখা গোলাপের পাপড়িরা যেন ক্লান্ত হয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।

বাতির হালকা হলুদ আলোয় ঘরটা স্বপ্নের মতো ঝাপসা— কিন্তু সেই স্বপ্নের চরিত্রদুটো এখনো অনুপস্থিত। 

নিঃশব্দ রাত এক ধরনের অধৈর্য অপেক্ষায় টগবগ করছে— দুজন মানুষের প্রথম একান্ততায় মিশে যাওয়ার মুহূর্তের আগে ঠিক যেমন হয়।
 
রাতে বিয়েবাড়িতে পড়ে থাকা মানেই এক বিনিদ্র, ক্লান্তিমগ্ন রাত কাটানো। ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘর স্পর্শ করেছে পাঁচ মিনিট আগে। অথচ কারো মুখে ঘুমের নামগন্ধ নেই।  

অর্কর চোখে ঘুমের ছায়া ঘনিয়েছে— শরীর জেগে আছে, খুঁজে ফিরছে বিছানার কিনারা— যেখানে পিঠ আর বিছানার সহবাসে জন্ম নেবে স্বস্তিদায়ক রাত্রিযাপনের প্রতিশ্রুতি। 

শেষমেশ শাকিবের দ্বারস্থ হলো অর্ক। সে আশ্বস্ত করল— আরামদায়ক রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করেই রেখেছে। তার পাশের বাড়ির দাদা— ভদ্রলোকের নাম জামাল, যিনি অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা। জীবনে কখনও ঘুস খাননি, গর্ব নিয়ে বলে শাকিব। 

ছেলেরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের উপার্জনে গাঁয়ে গড়ে উঠেছে এক প্রাসাদোপম বাড়ি। আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধায় ঠাসা সে ঘর— এ যেন গ্রাম নয়; মফস্‌সলের বুকে এক চিলতে শহর।

শহিদুল্লাহ, হাবিব, সাদিয়ার ভাই ইমন, খালাত ভাই জোবায়ের আর অর্ক— পাঁচজনকে সঙ্গে নিয়ে শাকিব গেল সেই বাড়িতে।

ভদ্রলোক আন্তরিকতার সাথে তাদের জন্য ব্যবস্থা করলেন লেপ-কম্বল, কাঁথা— প্রয়োজনের চেয়ে যেন একটু বেশিই।

ঘরে ছড়িয়ে আছে নরম আলো, বাতাসে ভেসে বেড়ায় চন্দনের হালকা ঘ্রাণ, জানালার ওপারে নেমে এসেছে নিস্তব্ধ শীতের রাত। এমন রাত উপভোগ না করে উপায় কী!

অর্ক বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। চোখে শিশিরের মতো ঘুম নামল। তখনই হারিয়ে গেল এক অদ্ভুত স্বপ্নে।

ঘরটা যেন আর ঘর নয়, বিশাল এক উন্মুক্ত ময়দান! সে ময়দানে শুয়ে আছে, মাথার নিচে পুরোনো বালিশ।
 
চারপাশে সারি সারি মানুষের ভিড়, কোলাহলমুখর এক চিৎকার। দূর থেকে ভেসে আসছে এক কণ্ঠ— উঠো, ওঠো এখন!

কিন্তু তার ঘুম ভাঙে না। ঘুমটা যেন লতিয়ে জড়িয়ে গেছে তার গায়ে— একধরনের ঘোর, যেন স্বপ্নের ভেতরেই আরও একটি স্বপ্ন।

ঘুমোনোর আগে অর্ক বলে রেখেছিল জামাল সাহেবকে— ফজরের সময় যেন তাকে ডেকে তোলেন।

আধোঘুম আর আধোস্বপ্নের ঘোরে ভেসে যাওয়া এক রাত— নিমিষেই ফুরিয়ে গেল।

মসজিদ থেকে ভেসে এলো ফজরের আজান।
জামাল সাহেব দরজার কাছে এসে ডেকে বললেন,
নামাজের সময় হয়ে গেছে, উঠুন।

অর্কর স্বপ্ন আর ঘুম— দুটোই ভেঙে গেল। নতুন ভোরের আলোর মতোই— নিঃশব্দে।

ধারাবাহিক পর্ব 

বর্ষপূর্তির প্রার্থনা

বিবাহ বার্ষিকী কেবল একটি তারিখ নয়— দাম্পত্যের পথচলার প্রতিটি দিনই এক একটি স্মৃতি, এক একটি নতুন অভিজ্ঞতা। তার ভাঁজে ভাঁজে থাকে হাসি, থাকে অশ্রু, থাকে স্বপ্ন ও সাধনার মিলন। বর্ষপূর্তির এই শুভক্ষণে, দুই হৃদয়ের বন্ধনকে অভিনন্দন!
 “বর্ষপূর্তির প্রার্থনা”  কবিতাটি কেবল প্রতীকী শুভেচ্ছা নয়। এতে মিশেছে জীবনের রূপ ও ব্যঞ্জনা। প্রেম ও মমতায় ভরে উঠুক আগামীর প্রতিটি মুহূর্ত— ‘আশরাফ ইবনে আকন্দ’র পঙ্‌ক্তিময় শুভকামনা! 
—লেখাপত্র। 


বর্ষপূর্তির প্রার্থনা

—আশরাফ ইবনে আকন্দ 

স্নেহাস্পদ,
দাম্পত্যের বর্ষপূর্তির 
এই সোনালি প্রান্তরে,
মনের অলিন্দ থেকে,
শরতের শিশিরে ধোয়া,
শিউলির গন্ধমাখা অভিনন্দন!

মাটির মতো স্থির অগাধ মমতায়,
আকাশের মতো অফুরন্ত আশীর্বাদ—
তোমাদের জন্য!

প্রতিটি প্রভাত রাঙুক প্রেমমুগ্ধতায়,
কাশফুলের দোলার মতো শান্তিতে;
প্রতিটি সন্ধ্যা নামুক
জোছনার মতো— শুভ্র, নির্মল।

প্রীতির ফল্গুধারা ধুয়ে দিক
জীবনের সব বিষাদ;
ঝিরিঝিরি স্নিগ্ধ বাতাসের মতো
সুখানুভব ছড়িয়ে পড়ুক 
হৃদয় নীড়ে।

দাম্পত্য, একটি গোলাপের মতো—
সুরভি হয়ে হাঁটে প্রেম,
কাঁটা হয়ে ফুটে বেদনা।

কণ্টকব্যথা সয়ে যারা অবিচল 
তারা পৌঁছে হিরণ্যময় প্রান্তরে।
তোমাদের প্রণয়মহিরুহ 
মেলুক শাখা স্বর্ণশিখরে—

এই প্রার্থনায় অর্পণ করি
স্নেহাশিসভেজা পঙ্‌ক্তিমালা।
※ 

উৎসর্গ
বিবাহবার্ষিকীর স্বর্ণালি প্রহরে,
স্নেহভাজন মৌরীকে,
এবং যাঁর স্নিগ্ধ কোলে 
মাথা রেখে মৌরী আঁকে স্বপ্ন,
অজস্র রঙিন; সেই ফয়সালকে!

 

চিঠিমি

✉️ চিঠি দিবসে ফিরে দেখা

চিঠি একসময় ছিল হৃদয়ের নিঃশব্দ সঙ্গী—কাগজের গন্ধে, অক্ষরের কাঁপুনিতে ফুটত ভালোবাসা ও অপেক্ষা। আজ সবকিছু জায়গা দিয়েছে স্ক্রিনের বার্তায়, যেখানে আছে ইমোজি, আছে “seen”—কিন্তু নেই সেই আবেগ। চিঠি দিবসে তাই মনে পড়ে  ‘আশরাফ ইবনে আকন্দে’র কবিতা “চিঠিমি”, হারানো চিঠির অভিমানী স্মৃতিচিহ্ন।



চিঠিমি

— আশরাফ ইবনে আকন্দ

চিঠি লিখি না আজকাল
তোমার ঠিকানাও এখন—
মৃত এক প্রেমিকার মতো,
জন্মদিন ভুলে বসে আছে নিজেই।

কাগজ-কলমের সহবাসে
অনুভূতি জন্মায় না আগের মতো।
আঙুল ঝুঁকে পড়েছে প্রযুক্তির প্রেমে—
তারা চুমু খায় কী-বোর্ডের ঠোঁটে। 
কাগজের আবেদন মরে গেছে,
ঝরে পড়া পাতার মতো— অভিমানে।

এখন লিখি চিঠিমি—
আলোঝলমলে এক স্ক্রিনে।
পিছনে আলো, সামনে শূন্যতা।
এখানে প্রেম আসে না—
আসে ইমোজির মুখোশ,
আসে 'seen' এর ছায়া।
উত্তর আসে না।

অসংখ্য চিঠিমি পড়ে থাকে— 
উত্তরহীন, অভিমানী,
মুছে ফেলার অপেক্ষায়।

চিঠিমি উন্মুক্ত— 
অথচ কেউ পড়ে না।
বার্তাগুলো নিষ্প্রাণ— 
তবুও আমি বেঁচে থাকি এতে।

#চিঠিমি #চিঠি দিবস #০১০৯২০২৫
লেখাপত্র ২০২৫. Blogger দ্বারা পরিচালিত.

সর্বশেষ

অস্পৃশ্য স্বাধীনতা

অস্পৃশ্য স্বাধীনতা ​ — আশরাফ ইবনে আকন্দ হে স্বাধীনতা, তুমি ঠোঁটের ডগায় লেগে থাকা মানে না বোঝা পুরোনো কোনো মন্ত্র, এক অভ্যস্ত উচ্চারণ। তুমি ...

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Contact form

নাম

ইমেল *

বার্তা *

অধিক পঠিত পোস্ট