একটি বিয়ের অভিযান-০২

“একটি বিয়ের অভিযান”— এটা শুধু বিয়ের গল্প নয়; আত্মিক এক যাত্রা। এখানে হাসির মিহি রেখা মিশে থাকে হাহাকারে, ক্লান্তির পাশে এসে বসে ক্ষুধার সহজ স্বীকারোক্তি। গল্পের মধ্যমণি অর্ক এখানে কখনো বন্ধু, কখনো পথিক, কখনো নিঃশব্দ দর্শক— যার চোখের ভেতর দিয়ে বয়ে চলে সময়ের অনিবার্য স্রোত। যা ঘটে, যেমন ঘটে— ঠিক তেমন করেই  “আশরাফ ইবনে আকন্দ”  লিখেছেন জীবনের নরম পলিমাটির ছোঁয়ায় বাস্তবতার আখ্যান। প্রতিটি দৃশ্য পাঠকের সাথে হাঁটে, আর রেখে যায় প্রেমে ভেজা এক বিষণ্ন অনুভব— ভালো লাগা আর বিষাদের অনুপম মিশেল।


একটি বিয়ের অভিযান

👤 আশরাফ ইবনে আকন্দ 

পর্ব-০২
পূর্বে প্রকাশের পর>>>
অর্ক জামাতে মাগরিবের নামাজ আদায় করতে পারেনি। বিয়েবাড়িতে পৌঁছে নিকটবর্তী মসজিদে একাকী নামাজ পড়ছে।

নামাজ শেষ করে দেখল নাঈমের ছোটো ভাই শাকিব তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটার মুখ ভার, চোখে পানি টলমল করছে, যেন কিছু বলতে চায়— আবার কেমন যেন লজ্জাও পাচ্ছে।

তার বড়ো ভাইয়ের বিয়ে, অথচ বরযাত্রায় গাড়িতে চড়ার সুযোগ হয়নি তার। অভিমানের কয়েক টুকরো বরফ জমে আছে বুকের ভেতর। কেউ হয়তো খেয়ালই করেনি।

চাইলেই সে বিয়েবাড়ির কোলাহলে একটু গোলমাল বাঁধাতে পারত। বিয়ে বাড়িতে তো এর চেয়েও তুচ্ছ কারণে তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়! কিন্তু সে কিছু বলেনি।

অভিমান নিয়ে চুপচাপ গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মায়ের সামনে। মা তখন চোখ তুলে ছেলের মুখ দেখে বললেন, “থাক বাবা, দুঃখ করিস না। সবার কথা ভেবে একটু মানিয়ে নে। সবসময় সবকিছু নিজের মতো হয় না রে।”

মায়ের কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না, শুধু ছিল অনুশোচনার মতো মমতা। সেই কথায় সে কিছুটা শান্ত হলেও, অভিমানটা বুকের ভিতরে পুষে রেখে নিঃশব্দেই বেরিয়ে পড়েছিল কনের বাড়ির দিকে— পায়ে হেঁটে, খেতের আল ধরে।

সন্ধ্যা নামে নামে করছে। হালকা কুয়াশা চারপাশে, বাতাসে শীতের একটা কাঁপুনির মতো নিস্তব্ধতা। একবার কুয়াশায় ঢাকা মাঠের দিকে তাকায়, যেন মায়ের মুখটা এখনো এই শীতল বাতাসের মধ্যেই ভেসে বেড়ায়। 

একটু পর নিঃশ্বাস ছেড়ে আবার হাঁটতে শুরু করে—মাথা নিচু, অভিমানী মনটা নিয়ে। কোনো গান নেই, কোনো সঙ্গ নেই— শুধু মাঘের শূন্যতা, বুকের গভীরে পাথরের মতো জমে থাকা এক নিঃশব্দ দহন।


ধীরে ধীরে মুখ খুলল শাকিব। গলার স্বর ভারী, চোখের কোণে জলের কাঁপুনি। বলল তার না বলা কষ্টের কথা।

গভীর মনোযোগে শাকিবের কথা শুনেছে অর্ক।
অর্ক কাঁধে হাত রাখল শাকিবের। বুলিয়ে দিলো সান্ত্বনার কোমল পরশ। 

বলল, শুনতে খারাপ লাগছে। ব্যাপারটা সত্যিই বেদনাবিধুর। মন খারাপ করো না। এমন হয় অনেক সময়। বড়োরা বুঝতে পারে না। কষ্টটা ছোটোদের বেশি লাগে।

শাকিবের ব্যথা এখন অনেকটা হালকা হয়েছে।
সান্ত্বনার মোলায়েম পরশ পেয়ে অর্কর কাছে কিছু স্বপ্ন জমা রেখেছে শাকিব।

স্বপ্নগুলো সুদূরপ্রসারী। সে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—
তার বিয়ের বরযাত্রায় কেউ হেঁটে যাবে না।
অনেকগুলো মাইক্রো থাকবে— একটি, দুটি, তিনটি নয়; দশটি। প্রয়োজনে আরও!

স্বপ্ন দেখে মানুষ বাঁচে। এই স্বপ্নই মানুষের জীবন এবং জীবনের অবলম্বন। এই ছেলেটা একদিন বড়ো হবে। তার স্বপ্নগুলোও হয়তো একদিন ডানা মেলবে।
※ 

বিয়ে মানেই প্রীতিসম্মিলন। প্রায় প্রতিটি প্রীতিসম্মিলনেই দেখা যায়, শালীনতাবর্জিত পোশাকে গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা আর হৃৎযন্ত্র কাঁপানো বাদ্যযন্ত্রের উৎপীড়ন। 

এই বিয়েতে এসবের লেশমাত্র নেই— না এ-বাড়ি, না ও-বাড়ি। অস্ফুট এক সুখানুভব দোলা দিয়ে গেল অর্কর হৃদয়ে। 

অবশ্য বরের হাত ধুয়ে-মুছে কিশোরীদের চাঁদাবাজি-সুলভ উৎপাত থেকে রেহাই মেলেনি।

হাত ধোয়া-মোছা শেষ হতে না হতেই যথারীতি চাঁদা কুড়াতে ঝাঁক বেঁধে ঝরাপাতার মতো এগিয়ে এলো একদল কিশোরী। মুখে দুষ্টু হাসি, চোখে স্পষ্ট পরিকল্পনার দীপ্তি। রেডিওর মতো চঞ্চল।

ওদের দাবি-দাওয়া মেটানোর গুরুদায়িত্ব পড়ল নাঈমের বন্ধু শহিদুলের ওপর। দায়িত্ব পালনে সে দারুণ বিচক্ষণতা দেখাল। ধূর্ত-চতুর না হলে এমন পরিস্থিতি সামলানো দায়।

ভেলকিবাজি ছাড়া এসব চলেও না। কিশোরীরা শহিদুলের ভেলকি ধরতে পারেনি। পারলে কি আর এভাবে ঠকে?

শহিদুল প্রথমে পাঁচশ টাকা দিয়েছে। পরে আরও দুটো পঞ্চাশ টাকার নোট দিলো, ওদের মন ভরল না।

অর্ক পাশ থেকে ঠাট্টার ছলে বলল, “দেইনছা দশ-বিশ টেহা বাড়ায়া।”

শহিদুল তখনই ভেলকি দেখাল। টাকা ভর্তি হাতটা পেছনে নিয়ে পাঁচশ টাকার নোট সরিয়ে ফেলল। তারপর দুটো পঞ্চাশ টাকা নোটের সাথে কুড়ি খানেক বিশ টাকার নোট মিশিয়ে ওদের দলনেত্রীর হাতে গুঁজে দিলো। কিশোরীরা ভাবল, অনেক টাকা। ওরা খুশিমুখে চলে গেল। 

একটুখানি রঙধনুর মতো খুশি ছায়া ফেলেছিল ওদের মনে— খানিক পরেই বিষণ্ণ মেঘ ছেয়ে গেল মনের আকাশে। টাকা গনে দেখে সাকুল্যে পাঁচশো— দলনেত্রী কিশোরীটি ফিরল মুখ ভার করে।  কার্যত তাদের ফিরে আসা স্বার্থক হলো না।

অর্ক অনেকটা সান্ত্বনার ভঙ্গিতে বলল, যা হবার হয়ে গেছে, নিজে ঠকলে বাপের কাছেও বলতে নেই! নিজেদের আহম্মকি জাহির করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

কোনো জবাব নেই, মুখটা যেন বেদনার রোদে শুকিয়ে যাওয়া বকুলফুল— নিঃশব্দ, বিবর্ণ, আর গন্ধহীন। চোখ দুটো যেন অন্ধকারে ঢাকা নিঃশেষ এক বসন্ত, যেখানে অপেক্ষা আছে, কিন্তু আশার আলো নেই।

একটু দূরে গিয়ে থেমেছিল ওরা, দলনেত্রী কিশোরীটি পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল একবার—চোখে ছিল সেই অভিমান, যেটা নদী শুকিয়ে গেলে রেখে যায় তীরের ফাটলে।

তার কণ্ঠস্বরে কোনো উষ্মা ছিল না, ছিল না রাগ— শুধু একটুখানি শীতল ঘোষণা, যেন নেমে আসা কুয়াশার মতো: 

আপনারা ভাবছেন আমরা হেরে গেছি? বরযাত্রী তো এখনো খায়নি। সময়ই জানাবে কার হাত ফসকে গেল পাত্র— আর কারা তুলে নিলো পুরস্কার।

ওরা আবার হাঁটা দিলো— ধীরে, নিশ্চুপ। তাদের ছায়াগুলো লম্বা হয়ে যাচ্ছিল পশ্চিমের দিকে, ঠিক যেমন বিকেলের আলো নিঃশব্দে বলে দেয়, রাত আসছে।

অর্ক দাঁড়িয়ে রইল সেই ছায়ার দিকে তাকিয়ে। তার মনে হলো, এরা ঝরাপাতা নয়— এরা ঝড়ের আগে নিস্তব্ধতা, বলে গেল ঝড় আসছে।
※ 


নাঈমের ভগিনীপতি শহিদুল্লাহ, বন্ধু শহিদুল, ভাইবেরাদার— রাভিন, আকাশ, শাকিব, হাবিব আর ঠিক বাঁ-পাশে অর্ক— বরের চারপাশে গোল হয়ে বসেছে। 

এ যেন বর নয়, কোনো বিজয়ী সেনানায়ক, যার থালায় সাজানো হয়েছে রাজসিক ভোজ: মাঝখানে গর্জে ওঠা আস্ত মোরগ, চারদিকে পোলাওয়ের সুবাসিত সাদা মেঘ, আর প্রান্তজুড়ে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে নানা জাতের বড়া—আলু, ডাল, বুট, বেগুন, আর মুগের।

বরের থালায় খাওয়ার মধ্যে থাকে একরকম আভিজাত্য, এক উমদা আনন্দ। অর্কর তেমন আনন্দ হচ্ছে না। সে মোরগের গোশত খায় না। অন্যরা সানন্দে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে, আর তার নজর পড়ে আছে বড়ার দিকে। বড়া খাওয়া শেষ, অথচ অন্যদের সবে শুরু। 

এমন সময় ঢেলে দেওয়া হলো গোরুর গোশত—পোলাও তলিয়ে গেল গোশতের ঝোলে। গোরুর গোশত খেতেও মানা অর্কর। উদরপূর্ণ করতে হলে, জঠরজ্বালা মেটাতে চাইলে তাকে গোরুর গোশতই গ্রহণ করতে হবে।

কী আর করা, নাওয়াখাওয়া ভুলে দর্শক হয়ে থাকার কোনো মানে নেই— ‘জিব পাক গোমাংসের রসনা, বারণ-বাধা আজ মানি না।’ শাসন-বারণ সরিয়ে রেখে অর্কর জিব পেল গোমাংসের স্বাদ। রসনাবিলাসের সুন্দর পরিসমাপ্তি ঘটল। 
※ 

কাজি সাহেব এলেন। নাঈমের প্রবাসী চাচার পক্ষে তাঁর বড়ো ছেলের উকালতিতে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিয়ের কাজ সম্পন্ন হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরতি যাত্রা শুরু হবে। 

এখন বরকে মিষ্টিমুখ করানো হচ্ছে। এ এক অপার উৎসব! বরকে মিষ্টিমুখ করানোর এমন দৃশ্য অর্ক জীবনে আর দেখিনি। 

মনে হচ্ছিল, নাঈম আসলে কোনো বর নয়, বরং এক চলন্ত মিষ্টির দোকান, যার মুখটা যেন জীবন্ত মিষ্টির প্রদর্শনী— কীভাবে মিষ্টিমুখ করতে হয় দেখো, দেখে শেখো!

শাশুড়ি শুরু করলেন— হাতে রসগোল্লা, মুখে আধা-কাঁদা আধা-হাসা আশীর্বাদ। তারপর একে একে হাজির হলেন দাদি শাশুড়ি, নানি শাশুড়ি, এমনকি দূরসম্পর্কের কেউ কেউ— নাঈমের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন রসমালাই, রসগোল্লা। 

নাঈম বেচারা পড়েছে মধুর যন্ত্রণায়, গাল দুটো রসগোল্লার মতো ফুলে উঠেছে। গলায় মিষ্টি আটকে যাচ্ছে। 

ছেলেটা পানি পানি করছে। সেদিকে কারো মনোযোগ নেই— যেন রসগোল্লার স্রোতে ভাসিয়েই  তাকে পরপারে পাঠিয়ে দেবে!

নাঈমের মামি ব্যাপারটা লক্ষ করলেন। কণ্ঠে আঞ্চলিক টান, কথায় রসিকতা— বললেন, ‘ছেডারে পানি দেইন্নারে, গলাত দো আইটকা গেছে— মিষ্টি খাওয়াইতে খাওয়াইতে কি জামাই মাইরাল বাইন!’

একজন ছুটে এসে ওর সামনে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল— হাসপাতালের এক নার্সের মতো করে। নাঈম ঢকঢক করে এক গ্রাসে পানি খেয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেল আর ফিসফিস করে বলল, এটা বিয়ে না— এটা মিষ্টিময় মৃত্যুযাত্রা!

জামাইর প্রাণ ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই যেন হাওয়া পালটে গেল চারপাশে। মিষ্টির রস শুকাতে না শুকাতে, এক নিঃশব্দ রোদন ছড়িয়ে পড়ল পরিবেশে।

বেজে উঠল বিদায়ের করুণ সুর— হৃদয় ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা এক বেদনাবিধুর বীণার টান। 

কনের নিঃশ্বাস থেকে যেন সুরের লহরি বেজে উঠেছে— ‘চোখ মুছে মুখ তোলো, স্নেহের বাঁধন খোলো, আমি যাচ্ছি বাবা, আমি যাচ্ছি!’ 

বাতাস যেন থমকে দাঁড়াল, সময়ের চাকা যেন থেমে রইল কিছুক্ষণ। কনের বাবা কাঁপা হাতে মেয়ের হাত তুলে দিলেন বরের হাতে— এক চিরায়ত প্রথার গভীরতম মুহূর্ত। 

আর তখনই, কান্নায় ভেঙে পড়ল কনে— মা-বাবা, দাদি এবং এই বাড়ির প্রতিটি হৃদয়। 

নববধূর সাজ-সজ্জা যেমন সুন্দর, তাদের কান্নাও হয় তেমন সুন্দর, মনোহর ও মনােমুগ্ধকর। এমন মনােমুগ্ধকর ও চিত্তাকর্ষী কান্নার দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। 

অশ্রুতে মেকাপ ক্ষয়ে যাওয়ার ভয়ে মাঝের কিছুকাল নববধূরা কাঁদতো না। এখন অবশ্য দিন পালটেছে, মেকাপেও এসেছে ‘ওয়াটারপ্রুফ ভার্সন’। হয়তো তাই এ-যুগের মেয়েরা, নববধূ-কনেরা মন খুলে কাঁদতে পারে কিংবা কান্নার ঢং করতে পারে।

মনোমুগ্ধকর, মনোহারী কান্নার দেখা মিলত শৈশবে।মাথায় ঘোমটা, চোখে জল, ঠোঁটে সংযম— বাপের বাড়ির উঠোন থেকে উঠত কান্নার ঢেউ, যার প্রতিধ্বনি থামত শ্বশুরবাড়ির দোরগোড়ায় এসে।

কাঁদতে কাঁদতে কাকিমণিদের বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি আসা, আর ফুফুমণিদের বিদায়ের দৃশ্য— অর্কের স্মৃতিতে এখনো টাটকা। 

তার স্মৃতির দর্পণে এখনো ঘুরে বেড়ায় সেই কান্নার ঘ্রাণ; উঠোনের বাতাসে ভেসে থাকা নরম ধুলোয় মোড়া, তবু আজও স্পষ্ট, কাঁপন জাগানো— জীবন্ত!

যাহোক, আজ আবার এক কান্নার সাক্ষী হলো অর্ক— সুন্দর ও চিত্তাকর্ষী, যদিও কাকিমণি ও ফুফুমণিদের মতো এত নির্মল শুভ্র নয়।
 
কনের নাম সাদিয়া। সাদিয়ার বাবার বাড়ির দেউড়ি থেকে মাইক্রো ছেড়ে গেছে। মাইক্রো যত এগোচ্ছে গতি তত বাড়ছে আর সাদিয়ার কান্নার ধ্বনি তত পিছিয়ে পড়ছে। 

মাইক্রোর খোলা জানালা হয়ে শোঁ শোঁ করে ঢুকছে বাতাস। বাতাসের সাথে মিলিয়ে যাচ্ছে সাদিয়ার কান্না। 

আমি যাচ্ছি বাবা, আমি যাচ্ছি’ এই গান এখন থেমে গেছে। অর্কর চোখ দুটো হঠাৎ অশ্রুতে ভরে উঠল। 
সাদিয়ার বাবার মুখটা বারবার ভেসে উঠছে— এখন কী করছেন তিনি? মেয়েটা চলে গেছে। 

নিশ্চয়ই চেয়ারটায় বসে নিঃশব্দে কাঁদছেন কিংবা কাঁদতে কাঁদতে হয়তো জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন।

মেয়ের হাতটা যখন শেষবারের মতো বাবার হাত ছেড়ে যায়, তখন প্রতিটি বাবার হৃৎপিণ্ড যেন থেমে যায়— শূন্যতায় । 

মুখের ভাষা হারায়, কিন্তু চোখের পেছনে জমে থাকে সমুদ্রের মতো কান্না। সেই কান্না হয়তো সবার চোখে পড়ে না। 

আজ অর্ক ঠিক সাদিয়ার বাবার সেই কান্না, সেই শূন্যতা নিজের ভেতরে অনুভব করছে— যে অনুভব ভাষায় ধরা দেয় না, শুধু চোখের জলে অনুবাদ হয়।

বিবাহ একটি ফুলের মতো— যার গায়ে মধু আছে, আবার কাঁটাও— যেমন আনন্দের তেমন বিষাদের।বিবাহযোগ্য কন্যাকে যখন সুপাত্রে পাত্রস্থ করা হয়, তখন বাড়ির আঙিনায় যেন বিষণ্ণ বিকেল নামে।

বিষাদে ছেয়ে গেছে অর্কর হৃদয়। বুকে দুরুদুরু কম্পন। সময় একদিন তাকেও যে দাঁড় করাবে ওই বিষণ্ণ বিকালের সামনে— এই ভেবে হৃৎস্পন্দন থেমে যাচ্ছে বারবার। 

তখন কেমন হবে তার হৃদয়ের অনুভূতি? মেয়ের মায়াভরা মুখটা চাইলেই দেখা হবে না। খাটের কোণে দাঁড়িয়ে মুগ্ধতা ছড়ানো সুবাসিত কোমল কণ্ঠে— ‘আব্বু ওঠো, নামাজের সময় হয়ে এলো’ বলে ফজরে আর রোজ রোজ ডেকে তুলবে না। 

ঘরের উঠোনে শিশির পড়বে, কিন্তু কেউ বলবে না, ‘আব্বু, চা দেবো?’ আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে একদিন সে বুঝবে, মেয়েরা চলে গেলে ঘর কীভাবে ঘর থাকে না। ফাঁকা ফাঁকা লাগে— শূন্যতার হাহাকার! 

ভাবনার ভিতরে বিষণ্ণতা জমে উঠল, ধানের শিষে জমা শিশিরের মতো। এ বিবশতা চলল কিছুক্ষণ, তারপর অনেকক্ষণ! 

অর্ক ভাবের বিহ্বলতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে চৈতন্যে ফেরে। টের পায় মাইক্রো পুরোপুরি সুগন্ধে ভরে গেছে। মনে হয় মাইক্রোটা একটা সুগন্ধির দোকান।  

বর-কনের পারফিউমের সুঘ্রাণ পিছনের সিট থেকে বাতাসের সাথে মিশে একাকার হয়ে অর্কর নাকে লাগছে। 

ঘ্রাণটা সুন্দর, কিন্তু অর্কর ভালো লাগছে না। এত বেশি ঘ্রাণ সে সইতে পারে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে। গাড়ি থেকে লাফিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। 

কিন্তু গাড়ির সবাই দারুণ আনন্দে আছে, হাসছে, কথা বলছে। তাই দম বন্ধ হয়ে আসার মধ্যেও অর্ক মুখে একরকম আনন্দের মুখোশ পরে বসে থাকে। 

অন্যের আনন্দে বাগড়া দেওয়ার কোনো অধিকার তার নেই। অর্ক পারফিউমের সুঘ্রাণ ভুলে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালাল। কিন্তু...! 

একটা সময় পার হয়ে গেল, পারফিউমের ঘ্রাণ খানিকটা মিইয়ে এলো। অর্ক চোখ মেলে দেখল, সামনের রাস্তার আলো-ছায়ায় জেগে আছে কুয়াশা, গাছপালা আর অচেনা গাঁয়ের নির্জনতা।
※ 


হোসেনপুর বাজারে ঢুকতেই নাঈমের মুঠোফোন বেজে উঠল— ওপারে তার মামি। কণ্ঠে অতিব্যস্ততার ছায়া, “ফুলসজ্জার পথ্য কিনে এনো।” 

নাঈম কিছু বলার আগেই দায়িত্ব নেমে এলো অর্কের কাঁধে, যেন বৃষ্টির ধাক্কায় খড়ের চাল ভেঙে পড়ল নিরীহ পাটখড়ির ঘাড়ে।

অর্ক কিছু বলল না। এই শহর তার অচেনা, এই পথ তার অপরিচিত, তবুও চাইলেই তো বলে ফেলা যায় না—“আমি পারব না।” 

এটা বড়ো অন্যায্য, অসংগত হতো; মাইক্রোতে নাঈম ছাড়া অর্কই যে একমাত্র পুরুষ— দণ্ডিত পুরুষ! 

অগত্যা নামল সে। শহরের বাতাসে ভেসে বেড়ায় খেজুরের রসের পুরোনো গন্ধ, কিন্তু ফলের দোকান চোখে পড়ে না। মানুষকে জিজ্ঞেস করে সে, ভুলভাল উত্তর আসে—“এই তো সামনে।” 

সামনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শুধু ধূলি আর ধোঁয়া, ফল কোথায়? আবার মোড় ঘুরে প্রশ্ন করে— জবাব আসে একটাই— “আরেকটু সামনে।” 

যেন পথ নয়, হিজলবনে ঢুকে পড়েছে। যার শেষ নেই, নেই কোনো নির্দেশনাও।

তবুও সে হেঁটে চলে— তিনশো সেকেন্ড হাঁটার পর অবশেষে একটা ফলের দোকান চোখে পড়ে। দোকানের ছাউনিটা টিনের, মাথার উপর পাপড়ির মতো ছড়িয়ে আছে। 

সামনে কলা, কমলা, আঙুর আপেল, বেদানা— সব ফল যেন ক্লান্ত হয়ে বসে আছে, কেউ কিনবে না জেনে হাল ছেড়ে দিয়েছে।

অর্ক দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছে। দোকানদার তাকে পাত্তা দিলো বলে মনে হলো না। দুইশো সেকেন্ড পর শেষমেশ দোকানদার তার দিকে চোখ তুলল। 

কলা, বেদানার দিকে তার ঝোঁক নেই— আপেল, আঙুর আর কমলা কিনলো— অল্প অল্প! 

দোকানি হেসে বলল, আপনার মতো মানুষই আমাদের জীবন কঠিন করে তোলে, জানেন? 

ফলের গন্ধ, দোকানির কণ্ঠ, কুয়াশার চাদরে মোড়ানো রাতের আঁধার— সব মিলিয়ে তার মনে হলো, এটা তো আর ‘রিয়েলিটি শো’ নয় যে, চুপ থাকলে নম্বর কাটা যাবে। অর্ক চুপ রইল— শিশিরের  মতো।

পথ্য কেনা শেষ হলে সে ধীরে ধীরে ফিরে আসে মাইক্রোর দিকে। হেঁটে আসার শব্দে কাঁপে ধুলোমাখা রাস্তাটুকু। দূর থেকে দেখে, মাইক্রোর সবাই তাকিয়ে আছে তার পথের দিকে। 

তার ফেরার জন্যই একটি যাত্রা থেমে আছে— সবার চোখে একধরনের অপেক্ষা, হয়তো কারো আত্ম-জিজ্ঞাসা— এত দেরি হচ্ছে কেন? 

কাছে এসে হালকা হেসে ওঠে। হাসিটা আনন্দের নয়; হতাশার— নিজের দিকে যেন নিজেই একটু বিরক্ত হয়। 

ভাবে— এই সামান্য দেরিতেই যদি সবাই এমন করে তাকায়, তবে দীর্ঘ কোনো অপেক্ষায় তারা কি একসময় ফেরার আশাটুকুও ছেড়ে দেবে?

অর্ক মাইক্রোতে চড়ে বসে। ভাবনার ভিতরই ছিল সে, যখন পেছনের সিট থেকে হঠাৎ উঠে এলো এক স্বতঃস্ফূর্ত আওয়াজ— সেই প্রগাঢ় বিষণ্ণতার উপর যেন কেউ রঙতুলির হালকা টান মারল।

পিছনের সিট থেকে নাঈমের বড়ো বোন মাজেদার কণ্ঠে ফুটে উঠল এক শিশুসুলভ চাওয়া— “ঠান্ডা খাওয়ান আংকেল।” 

গাড়ি থামল; কাচে জমে থাকা কুয়াশার মতোই হঠাৎ নেমে এলো এক কোমল বিরতি। সাদা প্লাস্টিকের বোতলে বন্দি ঠান্ডা জল, জার্নির ক্লান্ত গায়ে এঁকে দিল এক ছোট্ট মেঘের চুমু।

শহরের বুক চিরে শনশনিয়ে গাড়ি ছুটছে, শহর পেড়িয়ে গাঁয়ের পথে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর শীতের হালকা কুয়াশা জমছে জানালার কাচে। আলো-আঁধারির খেলা গাড়ির জানালা ছুঁয়ে যাচ্ছে— একটার পর একটা দৃশ্য যেন হেঁটে যায় পাশে। 

শহরের আলো পেছনে রেখে এখন তারা ফিরছে সেই গ্রামের দিকে— যেখানে হৃদয়ভরা উচ্ছ্বাস নিয়ে প্রিয়জনেরা বরণডালা সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নববধূর আগমনের প্রতীক্ষায়। 

এই প্রতীক্ষার শেষে কেউ একজন ঘোমটা সরিয়ে প্রথমবার দেখে উচ্ছলিত কণ্ঠে বলে উঠবে, “আল্লা! বউটা দেখতে কী সুন্দর!”


ঘড়ির কাঁটা এখন সাড়ে আটটার ঘরে। নাঈমদের ঘরের পেছনের দেউড়িতে গাড়ি থামল। 

আকাশে রাত্রির প্রথম তারা জ্বলছে, আর পৃথিবীর এক কোণে নাঈম আর সাদিয়া একসাথে হাঁটছে জীবনের পথে, এক নতুন সূর্যোদয়ের দিকে।

একটি সমাপ্ত যাত্রার ধুলোর মাঝে, জেগে উঠছে প্রেমের শুদ্ধ প্রার্থনা। আলোর ভেতর, তারা হারিয়ে ফেলছে একক সত্তা, আর তৈরি করছে এক 'আমরা'—যার নাম ভালোবাসা।


ধারাবাহিক পর্ব

স্বপ্নপতন

এটি একটি প্রতীকী ও রাজনৈতিক বাস্তবতানির্ভর কবিতা। এখানে কবি স্বাধীনতা, বিপ্লব, গণআন্দোলন, স্বপ্নভঙ্গ ও শাসনব্যবস্থার প্রতারণা চিত্রায়ন করেছেন অত্যন্ত শৈল্পিক ভাষায়। 

    স্বপ্নপতন

— আশরাফ ইবনে আকন্দ

শিক্ষার্থীর মুঠোয় পতাকা,
শ্রমিকের বুকে দীপ্ত স্বপ্ন,
কৃষকের চোখে আগুন,
নারীর আঁচলে বিপ্লবী পঙ্‌ক্তি,
জনতার কণ্ঠে বিদ্রোহী কবিতা।

ঘোড়ার লাগাম ছুটে রাজপথে, 
দাম্ভিকতার ভারে ডুবে 
রূপকাঠের নৌকাখানি 
রক্তস্রোতের ঢেউয়ে। 
মসজিদের মিনারে ধ্বনিত হয়
নবযুগের আজান।

স্বৈরাচার যায়—
রুদ্ধ ইতিহাস চিরে জাগে নতুন রবি।
অর্ধশতাব্দীর ক্লান্তি বুকে নিয়ে
জাতি নিশ্বাস ফেলে—
এবার বুঝি বাঁচা গেল!

কিন্তু—
পেছনের দুয়ার খুলে
নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে মুখোশধারী;
জন্ম নেয় আরেক ত্রাস,
নতুন মুখ, পুরোনো চাবুক।
নমরুদ ঝরে পড়ে ইতিহাসের পাতায়,
ফের জেগে ওঠে ফেরাউনের ঔদ্ধত্য।

যাদের কাঁধে ভরসার ভার—
তারা নয় সালাউদ্দিন।
রাষ্ট্রের ছায়ায় দাঁড়িয়ে
ঘুমন্ত মানুষের বুক চিরে
লেখে নিশ্বাসহীন সকাল।

আমরা যারা স্বপ্নচারী—
ভেবেছিলাম, দেশটা হবে গোলাপের মতো,
গন্ধে ভরে যাবে পুড়ে যাওয়া ধূসর ঘর।
বাদশা আলমগীর বৃক্ষ হয়ে জন্মাবে 
ধু-ধু প্রান্তরে!

না—
এই মাটিতে গজানো 
বৃক্ষের শিকড়ে বিষ,
ডালপালায় ঝরে বিষবাষ্প,
আর ফলে মরণরস।

তবু লিখি—
কারণ, কবিতারও আছে এক স্বদেশ,
যেখানে প্রতিটি পতনের পরে
একদিন ফিরে আসবে বসন্ত,
মুছে দেবে কালান্তরের অন্তর্দহন—
পঙ্‌ক্তিমালা হয়ে উঠবে 
স্বপ্নপতনের নীরব প্রতিরোধ! 
※ 
❍ ০৫ আগস্ট ২০২৫ খ্রি.


উৎসর্গ
জুলাই-বিপ্লব ’২৪-এর সে অগ্নিময় বিকেলকে— যেখানে পিপাসার মত জেগে উঠেছিল স্বপ্ন, আর গলায় গলায় মিলেছিল স্লোগানের ঢেউ। 
যাদের কাঁধে আগুনের চাদর, বুকভরা বৃষ্টির মতো রক্ত, তবু তারা হেঁটেছে, নির্বাক, অনাহারে, মুক্তির পতাকা হাতে।
তোমাদের জন্য— ওহে নামহীন বিদ্রোহী, যাদের পদচিহ্নে জন্ম নেয় প্রতিরোধের মানচিত্র।
এই কবিতা রেখে গেলাম তোমাদের অনামা কবরের পাশে— যেখানে ঘাস নয়, জন্মায় বিদ্রোহ, অগ্নিসন্তান!



লেখাপত্র ২০২৫. Blogger দ্বারা পরিচালিত.

সর্বশেষ

অস্পৃশ্য স্বাধীনতা

অস্পৃশ্য স্বাধীনতা ​ — আশরাফ ইবনে আকন্দ হে স্বাধীনতা, তুমি ঠোঁটের ডগায় লেগে থাকা মানে না বোঝা পুরোনো কোনো মন্ত্র, এক অভ্যস্ত উচ্চারণ। তুমি ...

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Contact form

নাম

ইমেল *

বার্তা *

অধিক পঠিত পোস্ট