দগ্ধ আঁচলের সাঁকো

দগ্ধ আঁচলের সাঁকো 

—আশরাফ ইবনে আকন্দ 
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ—
স্বপ্ন হাতে আসে শিশুরা,
নতুন পোশাকে, বইয়ের সুবাসে,
আলোর পানে হাঁটে তারা—
যেখানে সূর্য জাগে প্রতিশ্রুতির মতো।

হঠাৎ নিভে যায় সে সূর্য,
কার্বনের ধোঁয়ায় ঢাকা দিগন্ত, 
নীল আকাশ কেঁদে ওঠে—
দুপুরে ফেরার কথা ছিল যাদের,
তারা ফিরেছে সন্ধ্যায়— কাফনের কোলে।

যাদের হাসির শব্দে মুখর ছিল প্রাঙ্গণ,
তাদের নাম লেখা হলো কালো হরফে—
ইতিহাসের হিম পাতায়।
যেখানে ছিল প্রাণের উচ্ছ্বাস,
সেখানেই নিঃশব্দ দাহ।

আকাশ থেকে নামে
বজ্রের ছদ্মবেশে যুদ্ধবিমান,
যার প্রশিক্ষণ মৃত্যুর পাঠ!
হে লৌহ-বীথির অন্ধ পাখি—
কর্মচঞ্চল নগরের জনারণ্যে, 
বিদ্যালয়ের উঠোনে আগুনের স্তম্ভ তুলে
তুমি কী শেখাতে এলে?

অগ্নিতে ভস্ম— এই রাষ্ট্রের বিবেক।
স্কুল ড্রেসে আগুন— খাতায় পুড়ে যাচ্ছে বর্ণমালা,
কলমের ডগায় ছাই হয়ে পড়ে ইতিহাস,
স্কুলব্যাগে পোড়া মাংসের গন্ধ।

কেউ হেঁটে ফিরল দগ্ধ শরীরে,
আর যারা ফেরেনি—
তাদের চোখে এখন মৃত নীলাকাশ,
মা-বাবা ছুটে চলে হাহাকার বুকে—
হাসপাতালের করিডোরে ছড়িয়ে পড়ে কান্না।

আকাশ চেয়ে থাকে স্তব্ধ হয়ে—
তার চেয়ে মৌন শহর,
আর এরচেয়েও গভীর নিস্তব্ধতা
একটি মায়ের মৃত কোলে।

মাহরীন ম্যাডাম—
আপনি শিক্ষক নন কেবল,
আপনি এক উম্মুল মা'আরিফা,
এক আগুন-ঢাকা মমতা।

নিজেকে নিভিয়ে জ্বলালেন প্রদীপ,
পোড়া ওড়নায় ছায়া দিলেন শিশুদের,
মমতার আঁচল হয়ে উঠল সাঁকো—
শিশুরা নির্ভয়ে পার হলো আগুনের নদী ।
এই শহরে কেউ কথা রাখে না—
আপনি রাখলেন।

আপনার নাম লেখা রবে—
না, নিছক ফলকে নয়,
ভবিষ্যতের হৃদয়ে,
নির্মল শ্রদ্ধায়।

আর আমরা?
হাঁটি বারংবার একই অন্ধ গলিতে,
যেখানে মৃত্যু রুটিনের মতো—
ফিরে আসে কোনো সিলেবাস হয়ে!

❍ ২৫ জুলাই ২০২৫ খ্রি.
※ 

উৎসর্গ
২১ জুলাই ২০২৫ খ্রি., সোমবার রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় দগ্ধ হওয়া সেই সব নিষ্পাপ শিশুদের স্মৃতিতে— 
যাদের জীবনের পাঠ বইয়ের পৃষ্ঠা ছুঁয়ে শেষ হবার কথা ছিল, 
যাদের ফেরার কথা ছিল দুপুরবেলায়, 
কিন্তু তারা ফিরেছে আগুনের সন্ধ্যায়, 
একটি কাফনের নীরবতায়।
এবং—
মাহরীন ম্যাডামকে,
যিনি শিক্ষকতা নয়,
মাতৃত্বের এক অগ্নিস্নাত ছায়া হয়ে
নিজেকে নিঃশেষ করে
রক্ষা করেছেন অসংখ্য প্রাণ।

একটি বিয়ের অভিযান-০১


“একটি বিয়ের অভিযান”— এটা শুধু বিয়ের গল্প নয়; আত্মিক এক যাত্রা। এখানে হাসির মিহি রেখা মিশে থাকে হাহাকারে, ক্লান্তির পাশে এসে বসে ক্ষুধার সহজ স্বীকারোক্তি। গল্পের মধ্যমণি অর্ক এখানে কখনো বন্ধু, কখনো পথিক, কখনো নিঃশব্দ দর্শক— যার চোখের ভেতর দিয়ে বয়ে চলে সময়ের অনিবার্য স্রোত। যা ঘটে, যেমন ঘটে, ঠিক তেমন করে—
আশরাফ ইবনে আকন্দ   লিখেছেন জীবনের নরম পলিমাটির ছোঁয়ায় বাস্তবতার আখ্যান। প্রতিটি দৃশ্য পাঠকের সাথে হাঁটে, আর রেখে যায় প্রেমে ভেজা এক বিষণ্ন অনুভব— ভালো লাগা আর বিষাদের অনুপম মিশেল।


একটি বিয়ের অভিযান

👤 আশরাফ ইবনে আকন্দ 

পর্ব-০১
নাঈম আর অর্কের বন্ধুত্ব দেখে মনে হয় তারা যেন পুরোনো দিনের সহপাঠী— অথচ ওদের মধ্যে খালু-ভায়রাপুত্র সম্পর্ক।  

নাঈম ঢাকায় চাকরি করে। সে বসবাস করে এক নগরের ভেতরে, যে নগর সভ্যতার ক্লান্ত প্রতিচ্ছবি, শব্দ ও ধোঁয়ার অরণ্য।

তবু তার হৃদয় পড়ে থাকে গাঁয়ে, মাটির গন্ধে— যেখানে কাদায় জন্ম নেয় ধান, আর বাতাসে মিশে থাকে গাভীর নিশ্বাস। মানুষ যেমন শিকড়ের প্রতি নিষ্ঠুর হয়, তেমনই আবার ফেরে তার কাছেই।

প্রতি মাসেই ছুটির ছায়া নামে তার জীবনে— ছয় কিংবা সাত দিনের ছোট্ট মুক্তিপত্র। বাকি দিনগুলো যেন ঘড়ির কাটায় বাঁধা বন্দিজীবন, কিন্তু এই ক-দিন— এগুলোই তার প্রকৃত নিশ্বাস, যেখানে সে নিজের মতো করে বাঁচে।

ট্রেন ছুটে চলে— লোহার চাকা গড়িয়ে আনে মাটির গন্ধে। স্টেশন পেরোয় একের পর এক। তার বুকের ভেতর যেন হুঁইসেলের শব্দ হয়— পুরোনো স্টেশনের পরিচিত ডাক— গফরগাঁও প্লাটফর্মে থামে ট্রেন। 

ট্রেন থেকে নেমে ক্লান্ত শরীরে, শান্ত পায়ে হেঁটে জামতলা মোড়ে পৌঁছায় সে— অর্কর সঙ্গে দেখা করতে। দুজন বসে পুরোনো চায়ের দোকানে— কাঠের বেঞ্চ, ছেঁড়া টিনের ছাউনি, ধোঁয়ার ভেতর একরাশ নরম আলো।

খোশগল্পে মেতে ওঠে তারা। স্মৃতির হাঁট বসে— পুরোনো দিনগুলো এসে পাশে বসে চুপচাপ। আনন্দে দু-জনেই হেসে ওঠে, মাথা নাড়ে, চুমুক দেয় ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে— যেন জীবনের সব জবাবই গুলে আছে সেসব চায়ের গন্ধে।

কে জানতো—
খালু আর ভায়রাপুত্রের বন্ধন এমন নির্ভার হবে!
সম্পর্কের ভেদ আছে, বয়সের ব্যবধানও আছে—
তবু আড্ডার টেবিলে তারা যেন সময়হীন দুই বন্ধু।
দুজনের হাসিতে কোনো শিষ্টতা নেই, চায়ের ধোঁয়ার মতোই সহজ, স্বচ্ছ, আর হৃদয়ের মতোই উষ্ণ। মাটির মতো— নরম, আপন, আর গভীর। 


নাঈমের বিয়ের কথা চলছে। বিয়ের আলোচনা এখন ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে উঠোন ছুঁয়েছে— পাত্রী দেখাদেখি শেষ, এখন শুধু পাকা কথার আকাশে একফালি চাঁদের প্রতীক্ষা।

অর্ক যেন আপনমনে গুনগুন করে ওঠে,
ফিসফিসিয়ে বলে— “কবে আসবে সে দিন,
যেদিন ফুলের মতো খুলে যাবে ওর জীবনের নতুন পাতা?”

প্রতীক্ষা বেশি দীর্ঘ হলো না। রবিবার, শীতের রাত। নিঃশব্দে নামে কুয়াশা— ঘড়ির কাঁটা এগারোটার কিনারে এসে থেমে আছে যেন। ঠিক সেই সময় অর্কর ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে নাঈমের নাম, তবে কণ্ঠটা নারীর— উচ্ছ্বসিত, প্রাণবন্ত— তিনি নাঈমের মামি।

শীতের রাতে মানুষ আগেভাগে ঘুমিয়ে পড়ে। শীত-গ্রীষ্ম ঋতু যা-ই থাক— বারোটার আগে অর্কর চোখে ঘুম নামে না। 

মামি বললেন, মঙ্গলবার নাঈমের বিয়ে— জিয়াফত খাওয়ার মতো একটা লোক পাওয়া গেল যে কি না এখনো জেগে আছে। 

অর্ক তখন আয়েশ করে ভাত খাচ্ছে। ভাতের মিহি ঘ্রাণে চোখ আধবোজা করে বলে উঠল— “বেয়া রাইতে অইলে ভালা অয়, রাইতে দু-চাইট্টা ভাত বেশি খাইতারি!”

মামি হেসে উঠে বললেন, “আল্লাহ আমহের দোয়া শোনছে, বেয়া ভাই রাতেই ফালাইছি।” 

মামির হাসির ঝংকারে উঠোন যেন ঝলমল করে ওঠে। অর্কর হাসিও গড়িয়ে পড়ে থালার পাশ দিয়ে।

মামি অর্ককে বললেন, আপনি নাঈমের প্রধান মেহমান। এমনভাবে ঘোষণা এলো, যেন রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ। অর্ক একগাল হেসে বলল, আলহামদুলিল্লাহ!

মামির কান থেকে মুঠোফোন নিজের হাতে নিয়ে অর্ককে নাঈম বলল, আপনি কিন্তু বরযাত্রী হিসেবে যাচ্ছেন, আমরা মাগরিবের পর কনের বাড়ি পৌঁছব।

অর্কর অভিপ্রায় ছিল জামতলা মোড় থেকে কনেদের বাড়ি তেঁতুলিয়া গিয়েই ছুটি নেবে। নাঈম ছুটি দেয়নি। নাঈম বলল— তাদের বাড়ি হয়ে আসতে হবে।
 

সোমবারের বিকেল। আকাশে তখন রোদ আর ক্লান্তি মিশে গেছে। জামতলা মোড়ের ধুলোমাখা বাঁকে দেখা হলো নাঈম আর অর্কের।

একটু পরেই বিয়ের কেনাকাটার অভিযান। নাঈম যেন গম্ভীর যোদ্ধা— তার বাহিনীতে খালা, মামি, ভাই-বোন, আর সবশেষে সেই অনিবার্য উপস্থিতি—কনে নিজে। 

কনের জন্য কেনা হয়েছে লালচে-সোনালি পাড়ের কাতান শাড়ি, রেশমের গায়ে সূক্ষ্ম জরির কাজ। যেন শাড়ি না, একটুকরো লাল আগুন! 

সঙ্গে ম্যাচিং চুড়ি, লাল টিপ, মিনারেল বেস মেকআপ, আর চোখে লাগানোর জন্য জেল কাজল— বলাই বাহুল্য, সবই ব্র্যান্ডেড। পারফিউমও এসেছে বিদেশি, গোলাপি কাচের বোতলে, গন্ধে হালকা মিষ্টি-মায়া মেশানো।

বরের জন্য শেরওয়ানি দেখলো, পছন্দ হলো, কিন্তু ফিটিং নয়— এক ধরনের বাঙালি ট্র্যাজেডি, যা পোশাকেও লেগে থাকে। অন্য অনেকগুলো দেখানো হলো, চয়েস হলো না।

দোকানি সবার জন্য রং চা ফরমায়েশ করেছেন। মহিলারা বোরকা পরিহিতা, সবাই চা খেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন বলে মনে হচ্ছে না। কেউ একজন অর্ককে চা সাধলে, নাঈম জানাল সে রোজা, চা খাবে না।

তখন “মলভি” গোছের এক লোক শেরওয়ানির খোঁজ করলেন। ওই শেরওয়ানি তার সাথে দারুণ সুইটেড হলো—যাকে বলে খাপে খাপ মিলে যাওয়া।

এমন মিল সাধারণত বাঙালির জীবনেই ঘটে—আপনি যেটা চাইছেন, সেটা পায় অন্য কেউ।

বরের জন্য কেনা হলো পিচ রঙের হালকা কাজ করা পাঞ্জাবি, সঙ্গে কাঁচা খয়েরি রঙের কটি— পাজামা, জুতা-মোজা, সব। আর সবচেয়ে যত্ন করে তোলা হয়েছে ছোট্ট একটি পারফিউম বোতল— ডেভিডফ কুল ওয়াটার। এমন ঘ্রাণ, যেটা গায়ে মাখলেই একধরনের আত্মবিশ্বাস মাখা যায়।
※ 

সূর্যটা ক্রমশ অস্তাচলের দিকে হেলে পড়ছে। পাখিরা নীড়ে ফিরছে। ইফতারের সময় হয়ে এলো, অর্ককে এখন ফিরতে হবে। 

সবাইকে ‘বেলাল প্লাজা’য় রেখে সে বেরিয়ে পড়ল। মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসছে আজানের ধ্বনি। সে ‘অলটাইম জেলিবন’ দিয়ে ইফতার করল।

সালাত আদায় করল। ধীরে ধীরে পশ্চিম দিগন্তের লাল আভা আঁধারে মিলিয়ে যাচ্ছে। পেটে খিদের টান পড়েছে। সে পরোটার দোকানে গেল। পরোটা-ডাল-ভাজি দিয়ে নাশতা করছে, তখন নাঈমের কথা মনে পড়ল।

অর্ক তাকে কল করে পরোটার দোকানে নাশতা খেতে আমন্ত্রণ জানাল।
নাঈম বলল, সবাইকে রেখে আমার একা আসা ঠিক হবে না।

নাঈমের কথা শেষ না হতেই তার মামির কণ্ঠ শুনতে পেল অর্ক। মামি বললেন, শুধু জামাই না, কেনাকাটা শেষ হলে সবাই আসছি।

অর্কও কম যায় না, রসিকতা করে বলল, আলহামদুলিল্লাহ, সবাই আসুন—অর্ধেকটা রসগোল্লা আর একটি করে পরোটা বরাদ্দ রাখছি।

নাঈমের মামি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন, আলহামদুলিল্লাহ! তাদের আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ‘একটা রুডিই কেলা কারে দে!’ হাসির কল্লোলে তখন গুঞ্জরিত এপাশ-ওপাশ।

অর্ক কল রাখল। তার খাওয়া শেষ হলো। সে ভাবল, এভাবে সবাইকে কখনো একসাথে পাবে না—এখনই মোক্ষম সময়।

সে ভাবছে কীভাবে আপ্যায়ন করা যায়। ধনাঢ্য ব্যক্তি হলে ইজিচেয়ারে বসে কফির মগে চুমুক দিয়ে দোল খেতে খেতে ভাবতো। সে ভাবছে গরিবানা মতো— রতনের চা দোকানে বেঞ্চিতে বসে, চায়ের পেয়ালায় ঠোঁট ছুঁইয়ে।

অনেক কিছু খেলে যাচ্ছে মস্তিষ্কে, নানারকম চিন্তা-ভাবনা ভিড় করছে মগজে, কোনোটাই মনঃপূত হচ্ছে না। ভদ্রলোকের সাধ বিপুল, কিন্তু সাধ্য অপ্রতুল।

শেষমেশ মাথায় দারুণ এক আইডিয়া এলো—‘অলটাইম জেলিবন’। ছোটো খিদের বড়ো ও সাশ্রয়ী সমাধান।

দশটি ‘অলটাইম জেলিবন’ আর এক লিটার বোতলজাত পানি শপিংব্যাগে নিয়ে সে হাঁটছে ‘বেলাল প্লাজা’র গন্তব্যে।

দুইশো সেকেন্ড হাঁটল, গিয়ে দেখল, দেড়শো মিনিট ধরে কেনাকাটা চলছে। আর কতক্ষণ চলবে কেউ জানে না। চলছে দৌড়ঝাঁপ, পছন্দ-অপছন্দ, দামাদামি আর এক দোকান থেকে আরেক দোকান। 
     
নাঈমের মুখটা কিশমিশের মতো শুকিয়ে গেছে। সময় যত গড়াচ্ছে তাকে মনমরা ও বিমর্ষ দেখাচ্ছে। সময়ের সাথে তার ধৈর্য আর পকেট—দুটোই ফুরিয়ে আসছে। 

অর্ক এসে নাঈমের পাশে দাঁড়ায়। ধৈর্যহীন গলায় নাঈম বলল, আমি কি জানতাম, বিয়ে করতে এত কিছু লাগে?

অর্ক হেসে বলল, ‘বিয়ে একটাই করবেন তো? না কি দু-একটা প্ল্যান আরও আছে?’ নাঈম কিছু বলে না, শুধু হাসে।
নাঈমের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে কনে, সে নিঃশব্দে মিটিমিটি হাসছে— তার চোখ দুটো যেন আকাশ থেকে নামা মিটিমিটি তারা।

নাঈমের বিষণ্ণ মুখটাও এখন হাসিতে ভরা।
অর্কের কথার ফুলকি, খুনশুটি, হালকা ঠাট্টা— চারপাশে ছড়িয়ে দেয় হাসির বাতাস।

সবার চোখে খুশির ঝিলিক, ঠোঁটে হাসির রেখা। এটাই তো জীবন— ছোট ছোট মুহূর্তের আনন্দ। হঠাৎ হাসি, হঠাৎ ভালো লাগা।
※ 

জ নাঈমের বিয়ে। উত্তেজনার শেষ নেই। কিন্তু এসব কিছুর মধ্যে অর্ক আছে অদ্ভুত এক বিচিত্র অবস্থায়। সে এখন মাইক্রোবাসে বসে আছে। যেই মাইক্রোতে চেপে বরযাত্রী যাবে, সেই মাইক্রোতেই সে নাঈমদের বাড়ি যাচ্ছে।

নাঈম ফোনে বলেছিল, সাড়ে তিনটার মধ্যে মাইক্রো জামতলা মোড় চলে আসবে। অর্ক ঠিক সময়ে চলে এসেছিল। কিন্তু মাইক্রো এল সাড়ে তিনটা পেরিয়ে দশ মিনিট পর। অর্ক উঠেই জানালার পাশে বসে। বাইরে তাকিয়ে মাঝে মাঝে নিজের পকেট হাতড়ায়। কী যেন খুঁজছে।

আসলে অর্কের মাথাটা একটু গুবলেট হয়ে আছে। ভেবেছিল যাত্রার আগে ‘ট্রাভেলইট’ খেয়ে নেবে। তাড়াহুড়ায় তা আর হয়ে উঠেনি। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে মনের ভুলে মানিব্যাগ পর্যন্ত বাড়িতে ফেলে এসেছে। 
ব্যাকআপ হিসেবে বিকাশ থেকে কিছু টাকা তুলেছে— ভুল এখানেও করেছে। ব্যাংক থেকে টাকা তোলার সময় যদি একটু হিসাব করে তুলত, ক্যাশ আউটের খরচটা বাঁচানো যেত। এমন ভুল সে আগেও করেছে। ইদানীং একটু বেশিই করছে।

মানিব্যাগ ছাড়া সে পকেটে ‘মানি’ রাখতে পারে না। কাগজে আঠা লাগিয়ে খাম সাদৃশ্য মানিব্যাগ বানাল। দুটো আলাদা মানিব্যাগ পকেটে গুঁজে রাখল। একটা নিজের খরচার, অন্যটা নাঈমের।

জামতলা মোড় থেকে মাইক্রো ছেড়েছে কয়েক মিনিট হলো। অর্কর আশঙ্কা করেছিল তার প্রেসার না বেড়ে যায়। জার্নি হোক মাইক্রো কিংবা বাস তার প্রেসার বাড়বে, মাথা ঘুরবে, রাজ্যের অস্বস্তি এসে ভিড়বে মস্তিষ্ক জুড়ে— এতদিন তা-ই হয়ে আসছিল। আজ এর ব্যত্যয় কিছু ঘটল। 

বিশ্বরোড মোড় ঘুরতেই মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। কিছুক্ষণ অস্বস্তি বোধ করছিল বটে, প্রেসার আছে ঠিকঠাক, মাথাটাও ধরেনি। হয়তো আজকের দিনটা বিশেষ।

ড্রাইভার তার সাথে গল্প করতে চাচ্ছেন। অর্ক নাঈমের কে হয়, বাড়ি কোথায় এইসব। ভদ্রলোক যেচে নিজের পরিচয় দিলেন।
বললেন, তিনি নাঈমের মামাতো বোন তাকিয়ার মায়ের বান্ধবীর হাজব্যান্ড! ভেরি ইন্টারেস্টিং! 

অর্ক ভ্রু কুঁচকে তাকাল। অদ্ভুত রকম এক আত্মীয়তা— কিন্তু এই ধরনের আত্মীয়তা এই দেশের লোকদের খুব আপন।

 ফরগাঁও থেকে দেওয়ানগঞ্জ, তারপর চরহাজীপুর— বিয়েবাড়ির দিকে ছুটে চলেছে মাইক্রো। আঁকাবাঁকা গায়ের মেঠো পথ বেয়ে। যেখানে এপাশে ঘরবাড়ি ওপাশে পুকুর। 

পুকুর জলে এপাশে ঢেউ খেলে লাল শাপলা ওপাশে কচুরি ফুল— যেন দুই বোন, কেউ সেজেছে লাল শাড়ি পরে, কেউবা হালকা বেগুনি।

পথের ধারে খুঁটির সাথে বাঁধা কালো গোরুটার হাম্বা ডাকের আওয়াজেও শত মধুরিমা। গোরুর হাম্বা ডাকে সাড়া দেওয়া বাছুরের তিড়িংবিড়িং দৌড়ানোর দৃশ্যটি চোখের সামনে এখনো স্থির হয়ে আছে— যেন কোনো শিশু খুশিতে লাফাচ্ছে। 

শাঁইশাঁই বাতাসে দলঘাসের নৃত্য। গাছের ডালে যেন ঘুঙুর বাঁধা— পাতার নূপুর ঝুমঝুম করে বাজছে। বাতাসে কাঁপছে মরিচের চারা, ঝালরের মতো ঝুলছে মাচার লাউডগা। 

প্রতিটি দৃশ্য যেন একেকটা কবিতা হয়ে অর্কের চোখে ধরা দিচ্ছে, আবার সরে যাচ্ছে— ভালো লাগার ঢেউ উঠছে, কিন্তু কিছুই ধরে রাখা যাচ্ছে না।

মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করছে একটু থামতে, ভালো লাগার দৃশ্যগুলো নয়ন ভরে দেখতে। দৃষ্টি আটকে যায় মাঠে, ফসলের খেতে। পড়ন্ত বিকেল মৃদু হাওয়ায় ধানের চারা দারুণ ছন্দে নৃত্যে দুলছে— আনন্দের ঢেউ খেলে যাচ্ছে অর্কের হৃদয়ে। 

বাতাসের ছন্দে ক্ষণে ক্ষণে নেচে উঠছে অর্কের বাবরি চুল। মনে হচ্ছে অর্ক মিশে গেছে এই প্রকৃতির সঙ্গে— ঠিক যেমন নদীর জল মিশে যায় সাগরে। 

ড্রাইভার সিগ্রেট ধরালেন। অর্ক সিগ্রেট আর কয়েলের ধোঁয়া একদম সহ্য করতে পারে না। 
যারা কয়েল আর সিগ্রেট ধরায় তাদের মানুষ ভাবতে ঘেন্না লাগে। 

কিন্তু মাইক্রোর স্টেয়ারিংয়ে বসে পাইলট সিগ্রেট টানা ড্রাইভারকে ঘেন্না হচ্ছে না। 

ধূমপায়ী কিছু মানুষ আছে যারা অন্যের দিকে ধোঁয়া ছাড়ে, এই ড্রাইভার এমন না। ধোঁয়া নিজের দিকে রাখছেন, অন্যদের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন না। ধূমপায়ীদের মধ্যে এরকম ভদ্রলোক বিরল।

প্রকৃতি দেখতে দেখতে পথ ফুরিয়ে গেল। আধঘণ্টায় হেঁটে যাওয়ার পথ মাইক্রতে লেগেছে ষাট মিনিট। 

কিন্তু এই মিনিটগুলো সময় নয়, ছিল অনুভব। পেছনে পড়ে রইল না কিছুই, বরং বুকজুড়ে জমল হাজার বছরের এক সফরের স্মৃতি।

বাড়িতে পৌঁছতে পৌঁছতে আসরের আজান পড়ে গেছে। আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে গুঞ্জরিত হলো পুরো এলাকা। 

নাঈমদের দেউড়িতে গাড়ি থামল, অর্ক নামলো। 
দশ বছর আগে এখানে একবার এসেছিল ওই দৃশ্য তার চোখে এখনো লেগে আছে। বাড়িতে ঢুকতেই গোলমলে ঠেকেছে অর্কর। 

সবকিছুই তার অচেনা লাগছে। অর্ক তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, মনে মনে ভাবে—সব কিছুই বদলে গেছে। শুধু বদলায়নি একটা জিনিস— সম্পর্কের মায়া, আন্তরিকতার ছায়া। 

অর্ক পৌঁছতেই বরযাত্রার তোড়জোড় শুরু। অর্ক বলল, আমি নামাজটা পড়ে নিই! ইলাস্টিকের চাটাই বিছিয়ে নামাজ পড়ে নিলো।

নামাজ শেষ করে চাটাই সরাল অর্ক। নামাজে সে কী চেয়েছিল আল্লাহর কাছে, তা হয়তো কেউ জানবে না। কিন্তু তার মন হালকা, চোখে শান্তির রেখা।

নামাজ শেষে উঠে এসে দেখল, বরকে মিষ্টিমুখ করানো হচ্ছে। বরের মা, চাচি, দাদি একে একে মুখে মিষ্টি তুলে দিচ্ছেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন নিলো মিষ্টির স্বাদ— অর্কও পেল এক টুকরো। 

মিষ্টির টুকরোটা পাশের এক জনকে এগিয়ে দিয়ে রসিকতা করে অর্ক বলল, নেন অর্ধেকটা খান।

লোকটা মাথা নাড়ল, না না, আপনি খান।
অর্ক হেসে বলল, বড়ো মিস করলেন, মশাই। আমি একবার সাধি, দুইবার সাধি না।

কথাটা যেন হালকা বাতাসের মতো ছুঁয়ে গেল সবাইকে— একসাথে হেসে উঠল চারপাশ। আঁধার রাতে মেঘ সরিয়ে যেমন হেসে ওঠে একফালি চাঁদ।

এখন যাত্রা শুরু হবে। হুড়মুড় করে বরযাত্রী গাড়িতে চড়ে বসল। অর্কর সম্বন্ধীর মেয়ে তাকিয়ার সাথে দারুণ খুনশি তার। তাকে ‘সতাই’ শাশুড়ি বলে ডাকে। 

অর্ক ‘সতাই’ শাশুড়ির উদ্দেশ্যে বলল, জায়গা না হলে শ্বশ্রূমাকে ছাদে উঠিয়ে দিই। 

শ্বশ্রূমা মন ভালো করা ভেংচি কাটলেন। শিশুরা ভেংচি কাটলে মিষ্টি লাগে। শিশুদের সব কিছু সুন্দর—তাদের হাসি-কান্না, এমনকি ভেংচিও। 

যাত্রা শুরু হলো। সামনে বসেছে অর্ক, তার ডানপাশে তাকিয়া, অর্কের কোলে বসেছে নাঈমের চাচাতো ভাই ইব্রাহিম। পরের সারিতে নাঈম ও বোনেরা। 

খুরশিদ মহল ব্রিজে এসে একটা লম্বা বিরতি। এটাকে ফটোসেশানের বিরতিও বলা যেতে পারে— অন্তত পাঁচশটা ছবি তোলা হয়েছে সেখানে।

অর্ককেও দাঁড় করা হয়েছে ফটোসেশানে। কয়েকটি ছবি উঠানো হলো বটে, বেচারার সব ছবির কেন্দ্রবিন্দু যেন তার স্থূল ভুঁড়ি। 

ফেসবুকে প্রোফাইল পিক দেওয়ার জন্য একটা ভালো ছবির আকাঙ্ক্ষা তার বহু দিনের। আজকের ছবিগুলো তার পছন্দসই হলো না। পেটুক গোছের ছবি তো আর প্রোফাইল পিক করা যায় না। কাজেই তার আকাঙ্ক্ষা ও প্রতীক্ষা আরও দীর্ঘ হলো। 

লাল সূর্যটা থালার মতো গোল হয়ে ক্রমশ পশ্চিমে  মিলিয়ে যাচ্ছে। মাথার ওপর পাখি উড়ছে, দলে দলে নীড়ে ফিরছে। থেমেছে পাখিদের কলরব। চারপাশে নিস্তব্ধতা— ক্যামেরার ‘ঠাস ঠাস’ শব্দ থামছে না। 

ফটোসেশান শেষে আবার যাত্রা শুরু হলো। রাস্তার দুই পাশে ধানক্ষেত, গাছগাছালি, মাঝে মাঝে স্কুলঘর, চায়ের দোকান, ছোট ছোট বাজার—সব পেরিয়ে বরযাত্রীর গাড়ি থামল কনের বাড়ির গেটের সামনে।

ঘরের ভেতর আলোর ঝলকানি, অবশ্য প্যান্ডেল নেই। একদল কিশোর-কিশোরী দরজার মুখে দাঁড়িয়ে, হাতে পানির গ্লাস, শরবত আর ফুলের পাপড়ি। 

 ধারাবাহিক পর্ব
লেখাপত্র ২০২৫. Blogger দ্বারা পরিচালিত.

সর্বশেষ

অস্পৃশ্য স্বাধীনতা

অস্পৃশ্য স্বাধীনতা ​ — আশরাফ ইবনে আকন্দ হে স্বাধীনতা, তুমি ঠোঁটের ডগায় লেগে থাকা মানে না বোঝা পুরোনো কোনো মন্ত্র, এক অভ্যস্ত উচ্চারণ। তুমি ...

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Contact form

নাম

ইমেল *

বার্তা *

অধিক পঠিত পোস্ট