সব প্রেম প্রথম দর্শনে জন্মায় না। কিছু প্রেম জন্ম নেয় অনিবার্য বাধ্যতা থেকে, বড় হয় দায়িত্বে, নীরবতায়, আর পূর্ণতা পায় একসঙ্গে টিকে থাকার অনড় প্রতিজ্ঞায়।
'নিস্তব্ধ প্রণয়যাত্রা' গল্পটি তেমন—যেখানে প্রেম আসে চুপিচুপি, বিশ্বাসের হাত ধরে, আর জীবন হয়ে ওঠে এক দীর্ঘ, মমতাময় কবিতা।
নিস্তব্ধ প্রণয়যাত্রা
👤 আশরাফ ইবনে আকন্দ
সকালের মোলায়েম রোদ্দুরে সোনালি হয়ে উঠেছে বারান্দা। রবির কিরণে শিশিরকণা ঝলমল করছে। পাকা ধানের হালকা ঘ্রাণ ভাসছে বাতাসে— অর্কর হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। মুখে মৃদু হাসি। আজ তার মনটা প্রজাপতির মতো ফুরফুরে।
পাশে বসে আছে তার জীবনসঙ্গী। চোখে একরাশ কৌতূহল নিয়ে সে চুপচাপ পর্যবেক্ষণ করছে অর্কর মৌন উচ্ছ্বাস। অর্ক আস্তে করে কফির মগটা নামিয়ে রেখে বলল—
“প্রিয় প্রেয়সী!”
আজ তোমাকে একটি গল্প শোনাব। ভালোবাসার গল্প। উঁহুঁ এখনই চমকিত হয়ো না। হালফিলের প্রেম প্রেম খেলা ছলনার গল্প নয়, তোমাকে নিষ্পঙ্ক প্রণয়ের গল্প শোনাব।
প্রেম, প্রণয় ও পরিণয়ের এক অনুপম নিসর্গে মোড়া গল্প। প্রেম মানেই কি শুরুতে অনুরাগ আর উচ্ছ্বাস? না-কি জীবনের কোনো এক নীরব বাঁকে, নিতান্ত বাধ্যতামূলক এক পথচলায় জাগে হৃদয়ের পরিপূর্ণতা?
এক একুশ ছোঁয়া যুবকের জীবনে সে-ই ঘটনা ঘটেছিল। সমাজের চেনা নিয়মে, মায়ের আঁচলে আর বাবার আশ্বাসে, তাকে পা ফেলতে হয়েছিল এক অচেনা জীবনপথে।
এ গল্প কোনো নাটকীয় মোড় নয়, বরং এক অনবদ্য ধীর স্রোতের প্রেমযাত্রা—যেখানে বাধ্যতা জন্ম দেয় বন্ধনের, আর বন্ধন রূপ নেয় বন্ধুত্বে, বিশ্বাসে, ভালোবাসায়।
নিঃশব্দে বেড়ে ওঠা ভালোবাসার অঙ্কুর। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা, ছোটো ছোটো মুহূর্তের মাধুর্যে বোনা এক চিরন্তন গল্প।
তোমার কী মনে হয়—ভালোবাসা কি প্রথম চাওয়াতে, না ধীরে ধীরে গড়ে ওঠায় গভীর হয় বেশি?
জীবনসঙ্গী এখনো অর্কর দিকে চেয়ে আছে— চুপচাপ, স্তব্ধ হয়ে। মুখে কথা নেই, তবু চোখে এক শান্ত বৃষ্টি ঝরে। নীরবতায় যেন এক না বলা ভাষা।
অর্ক অবারিত জলস্রোতের মতো বলে যাচ্ছে—
“অনুরাগিনী চলো!”
গল্পের বাগানে পা রাখি আমরা। যেখানে সময় নিজেই থমকে দাঁড়ায়, আর মানুষের হৃদয় খুঁজে নেয় নিজের শিকড়।
যেখানে কচি পাতার শিরায় রোদ খেলে যায়, যেখানে অচেনা মুখ থেকে জন্ম নেয় চিরচেনা আপনজন!
যুবকের বয়স তখন একুশের দোরগোড়ায়। মা–বাবা ঠিক করলেন, এবার ঘরে বউ আনবেন।
একদিন তাঁরা যুবককে সঙ্গে নিয়ে গেলেন পাত্রী দেখতে। প্রথম দর্শনেই মেয়েটিকে মা-বাবার ভীষণ পছন্দ হলো।
যুবক বসে আছে সজ্জিত নিমীলিতনয়না অবগুণ্ঠিতার সামনে। তার দিকে যুবক চোখ তুলে তাকায়।
পলক পড়তেই চোখ নামায়, আবার তাকায় নির্নিমিখ দৃষ্টিতে। দৃষ্টিটা স্থির হয়ে থাকে মেয়েটির মুখে— যেন মুখ নয়, একটা দূরদেশের অচেনা মানচিত্র। সে যেন অনুভূতিহীন, যেন হারিয়ে গেল উদাসীনতার বিভোল রাজ্যে।
এক পলকের একটু দেখায় ষোড়শী পাত্রী মুগ্ধ হলো। অজানা এক অনুভূতি খেলে গেল তার সলজ্জ আননে।
যুবক যেন তার কোমল হৃদয়ে আসন গেড়ে বসল। তার হৃদয়ের ছোট্ট ঘরে যুবকের জন্য দরদ উথলে উঠল। যুবকের সাথে যেন তার জনম জনমের প্রণয়।
ভাবাবেগের বিবশতায় ডুবে গেল ষোড়শীও। আচ্ছা! একি সত্যি না-কি কল্পনার সাথে মিশামিশি, স্বপ্নের ছুঁয়াছুঁয়ি? এই সুদর্শন যুবক কি হবে আমার প্রিয়তম! আমি হতে পারব কি তার প্রিয়তমা!
হৃদয়াকাশে আশা-নিরাশার আলো-ছায়া উঁকি দিচ্ছে বারবার, কখনও মেঘের ছায়া, কখনও রোদের হাসি।
একবার আনন্দের হিল্লোল দোলা দিয়ে যায়, আরেকবার বিষণ্ণতা রেখাপাত করে মনের আঙিনায়। আচমকা ছন্দময় আনন্দে মন নেচে ওঠে।
যুবক ভাব ও ভাবনার জগৎ থেকে সম্বিত ফিরে পায়। ডানে-বামে মাথা নাড়িয়ে পাত্রী তার মনঃপূত না হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ষোড়শীর ছন্দময় আনন্দ যাত্রায় হঠাৎ ছন্দপতন ঘটে। মনে উৎকণ্ঠা হানা দেয়!
যুবকের মা-বাবাও তখন উৎকণ্ঠিত, উদ্বিগ্ন।
সবাই তাকে বোঝাচ্ছে। কারো বুঝ সে মানছে না। বিয়েতে রাজি হচ্ছে না। যুবকের এক কথা— পাত্রী পছন্দ হয়নি।
যুবকের কথায় মা-বাবার মন ভেঙে গেল। বাবার আঁখি ছলছল, মায়ের চোখ অশ্রুসজল। যুবক জীবনে কখনও মা-বাবাকে কষ্ট দেয়নি, আজ তার জন্য বাবার চোখে পানি, মায়ের চোখে অশ্রু। তাদের নীরব অশ্রু তাকে চুপচাপ দগ্ধ করছে।
হৃদয় দগ্ধ, মন বিষণ্ণ তবুও মা-বাবার খুশির কথা ভেবে বিয়েতে রাজি হয়। মা-বাবার মুখে তখন তৃপ্তির আলো, যেন হঠাৎ পৃথিবী আবার নিজের কক্ষপথে ফিরে এসেছে। মা-বাবার মুখে হাসি। যুবকের চোখে পানি। হয়তো বেদনার নয়— আনন্দাশ্রু!
বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হয়। মনের গভীরে চাপা কষ্ট, হৃদয়ে পুষে রাখা ব্যথা নিয়ে বাড়ি ফিরে যুবক।
দিন যায়, মুহূর্ত আসে। বিয়ে সম্পন্ন হয়। শাশুড়ি ষোড়শীর হাতটি আলতো করে তুলে দেন যুবকের হাতে— কণ্ঠে মায়াভরা অনুরোধ, ওকে দেখে রেখো বাবা।
যুবক যেন কিছুটা অবচেতনভাবে শান্ত স্বরে উত্তর দেয়, চিন্তা করবেন না, সে ভালোই থাকবে।
মুহূর্তটিতে যেন সময় একটু থেমে যায়— আশীর্বাদ, আবেগ আর নীরব প্রতিশ্রুতির এক মায়াময় মিশ্রণ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।
অথচ, দাম্পত্যের এই শুভলগ্নে যুবকের মনের গতিপ্রকৃতিতে কোনো উচ্ছলতা নেই, মনে পুলক নেই, হৃদয়ে কোনো কম্পন নেই।
বরং ছিল এক নীরব প্রতিরোধ। যুবক মনে মনে নিজেকে বুঝ দেয়, এটি দায়িত্বের বাঁধন, আবেগের বন্ধন নয়। সে ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের চারপাশে একটি অদৃশ্য দেওয়াল তুলে রাখে।
ষোড়শী উদ্বিগ্ন, কী আছে তার অদৃষ্টে! নব দাম্পত্য কেন হবে উচ্ছলহীন। সে কেন দাম্পত্যের উচ্ছ্বাসময় চঞ্চলতা থেকে, প্রিয়তমের সোহাগ থেকে বঞ্চিত হবে।
ষোড়শী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। যুবকের পাশে বসে নরম গলায় জিজ্ঞেস করে, আপনি গম্ভীর হয়ে আছেন কেন?
যুবক ঘাড় ঘুরিয়ে নেয়, উত্তর দেয় না। নববধূ বলে ওঠে, আমার স্বপ্ন—সারা রাত গল্প করব, আসমানে চাঁদ থাকবে আর জমিনে আমরা দুজন।
যুবক বলে, আমারও কিছু স্বপ্ন ছিল। সবার সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। নববধূ বলে, আপনার স্বপ্ন পূরণ হয়নি বলে আমার স্বপ্ন ভেঙে দিচ্ছেন?
যুবক জিজ্ঞেস করে, মানে?
অভিমানের ঢঙে মেয়েটি উত্তর দেয়, কিছু না।
চুপচাপ বসে আছে দুজন অনেকক্ষণ, কারো মুখে কথা নেই।
মেয়েটি যুবকের আরও কাছে এসে, কণ্ঠে দরদ মেখে বলল, আপনার কীসের এত যন্ত্রণা, আমাকে কি বলা যায় না?
আপনি আজ এত নির্লিপ্ত, কী এমন ব্যথা, কী এমন বঞ্চনা? আমি হতে চাই আপনার সেই বঞ্চনার সান্ত্বনা!
যুবক তখনো দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। কিন্তু মেয়েটির কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল অদ্ভুত এক ধৈর্য এবং আন্তরিকতা।
যুবক মনে মনে ভাবে, কেন আমি আমার ব্যর্থ ইচ্ছার নীরব প্রতিশোধ ওর ওপর নিচ্ছি? এই মেয়েটি তো কোনো দোষ নেই। তাছাড়া আমি যে ওর মাকে কথা দিয়েছি সে ভালো থাকবে।
ভাবনার দোলায় দোল খেতে খেতে মনে এক অচেনা অস্থিরতা নেমে আসে—নীরব প্রশ্নগুলো যেন তার হৃদয়ে মৃদু ঢেউ তোলে। ভেতরের সেই কঠিন দেওয়ালটি যেন সামান্য কেঁপে ওঠে।
যুবক ধীরে মুখ তোলে, চোখে বেদনার নীল ছায়া। সে ফিসফিস করে বলে, তুমি কি হতে পারবে আমার সারা জীবনের সুখ, অশান্ত জীবনের সান্ত্বনা? ব্যথাভরা মরুতুল্য তৃষিত হৃদয়ে করতে পারবে প্রেমসঞ্চার?
কেন নয়, প্রিয়তম? আপনার কণ্ঠে অনুরাগের মালা পরাতে আমি উন্মুখ। আপনার হৃদয় আমি ভরিয়ে দেব, নিষ্প্রাণ মরুভূমিকে সবুজে সবুজে সাজিয়ে দেব, ভালোবাসার সবুজ লতায়!
আমি হতে চাই আপনার মালঞ্চের মালাকার। আমার হাতটি ধরুন, নিন নরম হাতের কোমল স্পর্শ!
যুবক এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে— যেন সেই নিঃশ্বাসে হৃদয়ের সব প্রতিরোধের শেষ চিহ্ন মুছে দিলো।
সে ভাবে, তার অনিচ্ছাকৃত জীবনপথের এই সঙ্গিনীই হয়তো স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ উপহার। দ্বিধা সত্ত্বেও, সে যেন এক অনিবার্য টানে নিজের হাতটি বাড়িয়ে দিলো।
যুবক স্পর্শ করে ষোড়শীর বাড়িয়ে দেওয়া হাত। দারুণ এক রোমাঞ্চে ভরে ওঠে তার মন। হৃদয় শিহরিত, দেহ পুলকিত। অনিচ্ছার বাঁধন ভেঙে গিয়ে জন্ম নেয় এক অপ্রত্যাশিত অনুভূতির আলোড়ন।
যুবক শিরায় শিরায় বয়ে যাওয়া আলোড়ন আড়াল করতে চায়, কিন্তু তার চোখ লুকোলো না অনুভূতির ঝলক।
ষোড়শীর মনের সেতারে বেজে উঠে এক গীত— ‘তোমারি পরশে জীবন আমার ওগো ধন্য হলো, তুমি যে আমার চির আশার আলো।
যুবকের হৃদয় বীণায়ও যেন অনেকটা অগোচরে বেজে চলে— ‘একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে, ওগো বন্ধু কাছে থেকো পাশে থেকো।’
সম্পর্ক পেল নতুন নিবিড়তা, আর প্রেম— হয়ে উঠল গভীর, অবিচ্ছেদ্য।
※
সময়ের স্রোত বেয়ে তাদের প্রেমের ওপিঠে জড়ো হয় কিছু মান কিছু অভিমান— নরম, অথচ দহনময়।
অগোছালো কিছুই পছন্দ করে না যুবক। অথচ ষোড়শী বধূ অবচেতনে কখনো মুখ ফসকে বলে ফেলে বিক্ষিপ্ত কিছু কথা, কিংবা আচরণে ছিটিয়ে দেয় একফোঁটা অগোছালোতা।
তাতে যুবকের ভেতর দপ করে জ্বলে ওঠে আগুন— রাগে কখনো তার চোখ বড়ো হয়ে ওঠে, যেন চোখের পাতা ভেদ করে বেরিয়ে আসবে দহনমিশ্রিত দৃষ্টি।
ষোড়শীর কলিজা শুঁকিয়ে আসে, ভয়ে চুপসে যায় সে। মুখে কোনো শব্দ নেই, কেবল নীরবতার ভেতর তার সত্তা জুড়ে এক মৃদু কম্পন।
সেই নীরবতা ধীরে ধীরে যুবকের রাগে ঢালে শীতলতার জল। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ষোড়শীর দিকে— এত চুপচাপ, এত নিরীহ!
একসময় মনে হয়, ওর ওপর রাগ করা যেন পাপ। বুকের ভেতরটা নরম হয়ে আসে যুবকের।
নরম স্বরে বলে, তুমি এমন চুপ করে থাকো কেন?
ষোড়শী তাকায় না, কেবল নিচু চোখে ফিসফিসিয়ে বলে, ভয় পাই।
এই দুটো শব্দে স্থির হয়ে যুবক ভাবে, সে ‘চোপা’ করে না, সত্যিই ভয় পায়। এবং সেই ভয়টুকুও কত স্নিগ্ধ, কত আপন!
দিন যায়, রাত নামে, রাতের শেষে আসে শিশিরসিক্ত ভোর। যুবক আস্তে আস্তে নিজের ভেতরকার ঝড় স্তিমিত করে, আবিষ্কার করে এক বিস্ময়কর সত্য— ষোড়শী বধূর ভালোবাসা ধিকিধিকি অগ্নিশিখার মতো, যা ছড়িয়ে দেয় উষ্ণতা, আবার দোলা দেয় প্রেম।
শিশিরস্নাত প্রভাতে, নরম রোদের গোধূলিলগ্নে মেঠো পথ বেয়ে তারা পাশাপাশি হাঁটে না— তবুও প্রেম থেমে থাকে না। ভালোবাসায় চির ধরে না। আস্তে ধীরে ষোড়শী বধূ হয়ে ওঠে প্রেয়সী।
গোধূলির লালিমা আঁধারে হারায়। আবার রাত নামে। আকাশে তারারা খেলা করে, চাঁদের আভায় নদীর ঢেউ নেচে ওঠে, যেন প্রিয়ার চুলে জড়িয়ে থাকা কাঁকনের মৃদু ঝংকার।
※
অর্ক কফির মগে চুমুক দেয়, মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করে— গল্প কি উপভোগ করছ! সে মাথা নাড়ায়, হুঁ, করছি!
দিন গড়ায়, ঋতু বদলায়। একদিন আসে সেই আলোকিত সংবাদ— নতুন অতিথি আসছে ঘরে। এক সকালে সেই শুভলগ্ন উপস্থিত হয়। একটি শিশুর আগমনে সংসার পূর্ণতা লাভ করে।
মাতৃত্বের স্বাদ পায় প্রেয়সী— প্রথমবার শিশুকে কোলে নিয়ে তার চোখে জল আর হাসি মিশে একাকার। তার বুক ভরে ওঠে অচেনা এক কোমল অনুভূতিতে।
পিতৃত্বের সুখে যুবকের হৃদয় উথলে ওঠে, শিশুটিকে বুকে তুলে নেয়— যেন শুকনো মাটিতে প্রথম বৃষ্টির ছোঁয়া। চোখের কোণে জলের দীপ্তি, তবু তা বেদনার নয়— জীবন জেগে ওঠে নবঘ্রাণে।
শিশুর কণ্ঠে প্রথম কান্না যেন আশীর্বাদের মতো
ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। আঙিনার প্রতিটি কোণে, দেওয়ালের গায়ে খেলা করে নতুন আলো।
প্রথম কন্যা সন্তান তখন হাসতে শেখে, হাঁটতে শেখে, আপন মুখে ডাকে— “আব্বা, আম্মা”। সে ডাক যেন আকাশ ভরে তোলে পাখির কূজনের মতো আনন্দে।
কয়েক বছর পর আবারও আসে অতিথি। প্রথম আলোর মতোই ঘর আলোকিত হয় দ্বিতীয় কন্যার জন্মে।
প্রথম কন্যা যেমন ফুলের কলি, তেমনি দ্বিতীয় কন্যা ফুটে ওঠে নতুন সুবাসে। দুটি কন্যার কলতানে ঘর হয়ে ওঠে উদ্যান— হাসি-কান্না, খেলা-ধুলায় আর প্রেয়সীর মমতায় ভরে যায় সংসার।
এ যেন প্রকৃতির পূর্ণ দান— স্নেহের আলোকচ্ছটায় দীপ্ত এক পরিবার। ঘরজুড়ে সাজায় প্রেমময় কোমল আলপনা, কেবল মেঝেতে নয়, প্রিয় আর প্রেয়সীর হৃদয়ের দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকে এক অনন্ত মায়ার রেখা।
প্রতিটি স্পর্শে, প্রতিটি হাসিতে, প্রতিটি শিশির বিন্দুতে যেন সেই আলপনা জীবন্ত হয়ে ওঠে—ঘরের বাতাসে, হৃদয়ের কোণে, আর তাদের দাম্পত্যের আঙিনায় এক করে দেয় সবকিছু।
※
জীবনসঙ্গীর ঠোঁটে হাসি, চোখে বিস্ময় নিয়ে বলল, তারপর কী হলো? ঠান্ডা হয়ে আসা কফির মগে চুমুক দিয়ে মনটা বিষণ্ণ করে অর্ক বলল—
হঠাৎ মুছে যায় আলপনার রেখা। ব্যাপারটা খুবই সংবেদনশীল, যা শব্দের শরীরে বলা চলে না— অন্যায়ের প্রতিবাদ করেও রোষানলে পড়ে যুবক। এতে পরিবার, আত্মীয়স্বজন সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়। পাড়ার মানুষ কৌতূহলী আর নিকট প্রতিবেশীরা বুনে চলে ষড়যন্ত্রের জাল।
এই ঘোর বিপদে সে কিছু মানুষকে নতুন করে চিনেছে— কেউ, যাকে আপন ভেবেছিল, দূরে সরে গেছে; আবার কারো, মুখোশ উন্মোচিত হয়ে বেরিয়েছে প্রকৃত চেহারা।
একেকজন একেক পরামর্শ দেয়— কারোরটা অবিবেচনাপ্রসূত, কারোরটা অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর কাছে যায়, ওর দ্বারস্থ হয়— তবুও সমাধান মেলে না।
সে তখন একা হয়ে পড়ে, অসীম আকাশের নিচে দাঁড়ানো একটি গাছের মতো, যার শিকড় শুকিয়ে গেছে, যার পাতায় ঝরে পড়ছে বিষণ্ণতা।
কেউ পাশে দাঁড়ায় না। সে যখন নিমজ্জিত হতাশার আঁধারে, তখন আশার আলো জ্বালিয়ে পাশে দাঁড়ায় প্রেয়সী!
যার চোখে ছিল অফুরন্ত ধৈর্য আর আশ্বাসের দীপ্তি, কণ্ঠে ছিল নীরব সান্ত্বনার সুর। মায়াভরা এক নীলপদ্ম, যার পাপড়ি কোমল অথচ ডাঁটি অটল!
যুবক এবার তাকে আবিষ্কার করে নতুনভাবে, যেন চেনা মুখে অচেনা এক আভা ফুটে উঠেছে। প্রিয়ার হাতের মুঠোয় সে পেল অবলম্বন, যেন গভীর জলে ডুবে যাওয়া মানুষ খুঁজে পেল ভেসে থাকা কাঠের টুকরো।
ঝড়ের পর মেঘ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা এক টুকরো রোদের মতন— প্রেয়সীর ভরসার আলোয় উজ্জীবিত হয়ে এলাকাবাসীর হৃদ্যতায় দীর্ঘ পথ পেরিয়ে রোষানল থেকে পরিত্রাণ মেলে।
যুবককে এখন অনেকটা নির্ভার লাগছে, মুখে ফুটেছে ক্লান্ত হাসি। ঠিক সেই মুহূর্তে, প্রেয়সী আলতো কণ্ঠে বলে— প্রিয়, আপনি ভাববেন না, আমি তো আছি আপনার পাশে।
আপনার ক্লান্ত শরীরে আমি ঢেলে দেব সজীবতার নবধারা। আপনার চোখের বিষণ্নতায় আমি বুনি আলো, আপনার দগ্ধ প্রাণে আমি ছড়িয়ে দেব শিশিরের শান্তি।
যুবক তাকিয়ে থাকে বিস্ময়ে— তার হৃদয় কেঁপে ওঠে। এ কি শুধু একটি নারীর ভালোবাসা? না—এ এক অনন্ত প্রতিশ্রুতি, যেখানে সংসারের অনটন মুছে যায়। যেখানে শত অক্ষমতা চাপা পড়ে স্নেহের আঙিনায়।
যত দিন যায়, ততই যেন তার মনের অলিন্দে স্থায়ী নিবাস গড়ে তুলে প্রেয়সী বধূ— মায়ার মালঞ্চে অমল ফুল হয়ে।
যুবক বলে উঠে, “তুমি কী করে এলে আমার হৃদয়ের শূন্য প্রান্তরে, কীভাবে তুমি এমন করে ভালোবাসতে শিখলে?”
প্রেয়সী মৃদু হাসে, চোখ নামিয়ে বলে, ভালোবাসা তো নদীর মতো, আপন গতিতে বয়ে যায়। সে কখনও বলে না—আমি আসছি। সে কেবল ছুঁয়ে যায়, ভিজিয়ে দেয়, গড়িয়ে যায় হৃদয়ের শুষ্ক প্রান্তরে।
প্রেয়সীর চোখে তখন এক অদ্ভুত দীপ্তি। সেই চোখে অপার আশ্বাস— আমি আছি, আমি থাকব। ভালোবাসা মানে কেবল শরীরের সংযোগ নয়, বরং আত্মার সেতুবন্ধন। দুজন মিলে এক অবিচ্ছেদ্য আত্মা।
যুবক প্রেয়সীর খুব কাছে বসে, আজ কণ্ঠে কেবল অব্যক্ত স্মৃতির অনুরণন—জানো, সেই দিনগুলো কত অনন্য ছিল, যখন ভালোবাসা আমাদের জীবনে পদধূলি দিয়েছিল, যখন আমরা একে অপরকে চিনতাম না, অথচ হৃদয়ের গহিনে একে অপরের মনের ভেতরে হেঁটে বেড়াচ্ছে, চুপিচুপি।
এক আকাশ নক্ষত্রহীন ছিল, কিন্তু তবুও আলো ছিল তোমার চোখে। অদ্ভুত আলো। আমি বুঝতে পারতাম না, ওই আলো কেমন করে আমাকে ডাকে। কোনো শব্দ ছিল না, কোনো ইশারা ছিল না, তবুও যেন কেউ বলছে—“এই যে, আমি আছি।”
আমি তখনো ভাবিনি এটা প্রেম কিনা। শুধু একটা বেদনা হালকা করে বুকের ভেতর বসে গিয়েছিল। শান্ত, কোমল বেদনা।
সজনে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে হাওয়ার দোলায় আমি চোখ বন্ধ করতাম—ভাবতাম, এই বাতাসটাই হয়তো তোমার গায়ের গন্ধ নিয়ে এসেছে।
প্রেমের শুরুটা এমনই ছিল—নরম, নিরীহ, তবুও গভীর। কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না, কোনো ঘোষণা ছিল না। শুধু এক শব্দহীন বোঝাপড়া—যেন দুইটা মন হঠাৎ একই পথে হাঁটতে শুরু করেছে।
প্রেয়সীর ঠোঁটে গোলাপি হাসি। যুবক প্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে বলে, তোমার নরম কাঁধে যখন আমার চিন্তার ভার রেখে দিতাম, তুমি হাসতে। সেই হাসি ছিল না কেবল ঠোঁটে, ছিল দৃষ্টিতে, ছিল আত্মার গভীরে।
তুমি আমার বিষাদ বালুকাবেলায় জোয়ার এনেছিলে। তুমি ছিলে আমার প্রতীক্ষার অনিন্দ্য ফল, আমার প্রার্থনার উত্তর, এক অনুচ্চারিত স্বপ্নের বাস্তব রূপ।
আমি বুঝতে পারিনি, তুমি কবে হয়ে উঠলে আমার নিশ্বাসের নির্মল বায়ু। কবে আমার মনের গোপন সিন্দুকের চাবি তোমার নরম আঙুলের মাথায় এসে লেগে গেল!
প্রেয়সী একদিন বলেছিল, সে হতে চায় যুবকের হৃদয় মালঞ্চের মালাকার। কিন্তু আজ! যুবকের সরল স্বীকারোক্তি— প্রেয়সী, তুমি শুধু মালাকার হওনি, তুমি হয়েছ সে বাগানের দরদী মালী, যে সকালবেলা শিশিরের মতো কোমল স্পর্শে হৃদয়ের পাপড়ি ভেজায়, সন্ধেবেলায় ভরসার আলতা দিয়ে আঁকে সুখের আলপনা।
আমি তোমাকে বলিনি, কিন্তু তুমি হয়ে উঠেছ আমার শব্দহীন কবিতা, আমার অনুচ্চারিত প্রেমগান।
এক বিকেলে আমি তোমাকে বলেছিলাম, চলো, হারিয়ে যাই কোনো পাহাড়ের পাড়ে, যেখানে কেবল তুমি আমি আর ঝরনার শব্দ থাকবে।
তুমি চোখ মেলে তাকিয়ে বলেছিলে, যেখানে ভালোবাসা আছে, সেখানেই তো পাহাড়, সেখানেই তো ঝরনা।
এই কথায় যুবকের বুকের মধ্যে জেগে ওঠে ঢেউ— ভালোবাসার, শান্তির, এক অনির্বচনীয় দীপ্তির, যেখানে সময়ও হার মানে, যেখানে নিঃশ্বাস হয়ে ওঠে প্রার্থনা।
যুবক অনর্গল বলে যায়, প্রেয়সী বলে না কিছু— শুধু শোনে আর হাসে, তারার মতো মিটিমিটি, চোখের কোণে যেন আকাশ ভরা দীপ্তি।
সেই হাসির শব্দে লুকিয়ে থাকে অজস্র সান্ত্বনা—যেন নিস্তব্ধ রাতের উঠোনে বাতাসের হালকা দোলা, যেন শীতের ভোরে প্রথম সূর্যের উষ্ণতা।
※
“প্রিয় সুহাসিনী!”
প্রেয়সী যুবককে শেখাল, কীভাবে প্রেমকে পাখির মতো উড়িয়ে দিতে হয় আকাশে, আবার ডেকে আনতে হয় কাঁধে। প্রেম মানে কেবল কাছে থাকা নয়, প্রেম মানে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা— সে পাশে নেই, তবুও আছে।
যাকে সে প্রথম দেখায় হৃদয় দিয়েও চিনতে পারেনি, তাকেই একদিন হয়ে উঠতে হবে তার জীবনের প্রিয়তমা। কিন্তু প্রেম তো কেবল চোখে দেখা, ঠোঁটে উচ্চারিত শব্দ নয়; প্রেম এক অনুভব, এক গ্রহণের নাম।
যুবকের ভেতর ছিল দ্বিধা, অস্থিরতা, একরাশ ক্ষোভ—নিজের ইচ্ছাকে ত্যাগ করে সমাজের চাপে, ভালোবাসার ভাষা না জেনে, সে হয়ে উঠেছিল একজন বর।
কিন্তু ওই ষোড়শী! যার বয়স তখনও জীবনের পূর্ণতার দোরগোড়ায় পৌঁছায়নি, বুকের গোপনে এক আশ্বাস বুনে চলেছিল—এই যুবকই হবে তার জীবনের আশ্রয়।
সেই থেকে শুরু হয়েছিল এক যৌথ পথচলা। একে অপরকে বুঝে নেওয়ার, ভালোবাসার প্রথম অক্ষর থেকে শেষ পঙ্ক্তি পর্যন্ত একত্রে শিখে নেওয়ার।
প্রেম সেই ধীরে ধীরে বাসা বাঁধতে থাকে দুজনার মাঝে। নির্লিপ্ততা গলে যায় স্নেহে, অভিমান মিশে যায় চুম্বনের আদরে।
তাদের সংসারের উঠোনে নেমে আসে আরও এক নবজীবনের আলো— এক শিশু পুত্র, নিষ্পাপ, অথচ রহস্যময় দীপ্তিতে ভরা।
আজ তাদের দাম্পত্যের ষোলো বছর পূর্ণ হলো— ভালোবাসার নদী কতবার শুকিয়েছে, আবার ভরে উঠেছে বৃষ্টির স্নেহে। তবু তারা টিকে আছে— প্রার্থনার মতো, ধূপের ধোঁয়ার মতো স্নিগ্ধ এক ভালোবাসায়।
সংসারের প্রতিটি দিন হয়ে ওঠে নতুন এক অধ্যায়—যেখানে ভালোবাসা কেবল শরীর ছোঁয়ার নয়, মন ছুঁয়ে দেখার, জীবনকে একসঙ্গে বয়ে নিয়ে যাওয়ার এক মৃদু প্রতিজ্ঞা।
※
গল্পের আঙিনা থেকে দুজন ফেরে বাস্তবতার উঠোনে, রোদ ঝলমলে বারান্দায়। অর্ক আলতো করে জীবনসঙ্গীর হাত চেপে ধরে মৃদুস্বরে বলল—
“প্রিয় প্রণয়িনী!”
তুমি কি ওই ষোড়শীকে চিনতে পারো? তুমি কি ওই যুবকটিকে মনে রেখেছো—যুবকটি আমি, ষোড়শীটি তুমি?
আজ, অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। তোমার চুলে এসে লেগেছে রুপোর রেখা, আমার চোখে এসে জমেছে সময়ের কালি।
তবু আমি জানি— আমাদের হৃদয়ের গোপন অক্ষরগুলো মুছে যায়নি, আমাদের প্রথম ভালোবাসার শ্বাস এখনো বাতাসে ভাসে।
সময়ের ঢেউ যতই বয়ে যাক, আমাদের সেই প্রথম দিনের স্নিগ্ধতা আজও স্বপ্নের মতো ঘিরে রেখেছে দুজনকে। প্রেম এখনও ফোটে, নরম হয়ে, শীতল বাতাসে ঘ্রাণ ছড়ায়।
এবার কথা ফুটে ওঠে অর্কর জীবনসঙ্গীর ঠোঁটে, তার কণ্ঠে মোলায়েম উচ্চারণ—
প্রেম শেষ হয় না, সে শুধু অবয়ব বদলায়— ফুল থেকে পাতা, বাতাস থেকে সুবাস হয়ে যায়!
অর্ক জীবনসঙ্গীর চোখে চোখ রেখে বলল—
“অথচ, বিগত দিনের মতো আজও বলা হলো না— অ্যাই লভ ইউ, আমি তোমাকে ভালোবাসি, ‘প্রেয়সী’।”
※
উৎসর্গ:
বিবাহবার্ষিকীর সোনাঝরা ক্ষণে, নিশ্ছিদ্র প্রেমের পুরোনো উঠোনে— যেখানে ষোল বসন্ত আলো-ছায়া মেখে গেছে দিনরাত্রি।
শুষ্ক মোহনায় হঠাৎ জেগে ওঠা নতুন স্রোতের মতো তুমি— আশ্বাসের দীপশিখা, সান্ত্বনার নরম গান।
বিষণ্ণ দুপুরে তোমার ছোঁয়ায় নামে মোলায়েম রোদ্দুর, ক্লান্ত জীবনে জাগে প্রেরণার শস্যখেত।
সে কারণেই— এই গল্পের সমস্ত আলো তানজিনা, তোমার জন্যই!
#নিস্তব্ধ প্রণয়যাত্রা #অর্ক #প্রেয়সী ||
🗓️ ২০ নভেম্বর ২০২৫ খ্রি.
