নিস্তব্ধ প্রণয়যাত্রা

সব প্রেম প্রথম দর্শনে জন্মায় না। কিছু প্রেম জন্ম নেয় অনিবার্য বাধ্যতা থেকে, বড় হয় দায়িত্বে, নীরবতায়, আর পূর্ণতা পায় একসঙ্গে টিকে থাকার অনড় প্রতিজ্ঞায়।
'নিস্তব্ধ প্রণয়যাত্রা' গল্পটি তেমন—যেখানে প্রেম আসে চুপিচুপি, বিশ্বাসের হাত ধরে, আর জীবন হয়ে ওঠে এক দীর্ঘ, মমতাময় কবিতা।


নিস্তব্ধ প্রণয়যাত্রা 

👤 আশরাফ ইবনে আকন্দ 
সকালের মোলায়েম রোদ্দুরে সোনালি হয়ে উঠেছে বারান্দা। রবির কিরণে শিশিরকণা ঝলমল করছে। পাকা ধানের হালকা ঘ্রাণ ভাসছে বাতাসে— অর্কর হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। মুখে মৃদু হাসি। আজ তার মনটা প্রজাপতির মতো ফুরফুরে।  

পাশে বসে আছে তার জীবনসঙ্গী। চোখে একরাশ কৌতূহল নিয়ে সে চুপচাপ পর্যবেক্ষণ করছে অর্কর মৌন উচ্ছ্বাস। অর্ক আস্তে করে কফির মগটা নামিয়ে রেখে বলল—

“প্রিয় প্রেয়সী!”
আজ তোমাকে একটি গল্প শোনাব। ভালোবাসার গল্প। উঁহুঁ এখনই চমকিত হয়ো না। হালফিলের প্রেম প্রেম খেলা ছলনার গল্প নয়, তোমাকে নিষ্পঙ্ক প্রণয়ের গল্প শোনাব। 

প্রেম, প্রণয় ও পরিণয়ের এক অনুপম নিসর্গে মোড়া গল্প। প্রেম মানেই কি শুরুতে অনুরাগ আর উচ্ছ্বাস? না-কি জীবনের কোনো এক নীরব বাঁকে, নিতান্ত বাধ্যতামূলক এক পথচলায় জাগে হৃদয়ের পরিপূর্ণতা? 

এক একুশ ছোঁয়া যুবকের জীবনে সে-ই ঘটনা ঘটেছিল। সমাজের চেনা নিয়মে, মায়ের আঁচলে আর বাবার আশ্বাসে, তাকে পা ফেলতে হয়েছিল এক অচেনা জীবনপথে। 

এ গল্প কোনো নাটকীয় মোড় নয়, বরং এক অনবদ্য ধীর স্রোতের প্রেমযাত্রা—যেখানে বাধ্যতা জন্ম দেয় বন্ধনের, আর বন্ধন রূপ নেয় বন্ধুত্বে, বিশ্বাসে, ভালোবাসায়।

নিঃশব্দে বেড়ে ওঠা ভালোবাসার অঙ্কুর। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা, ছোটো ছোটো মুহূর্তের মাধুর্যে বোনা এক চিরন্তন গল্প।

তোমার কী মনে হয়—ভালোবাসা কি প্রথম চাওয়াতে, না ধীরে ধীরে গড়ে ওঠায় গভীর হয় বেশি?

জীবনসঙ্গী এখনো অর্কর দিকে চেয়ে আছে— চুপচাপ, স্তব্ধ হয়ে। মুখে কথা নেই, তবু চোখে এক শান্ত বৃষ্টি ঝরে। নীরবতায় যেন এক না বলা ভাষা। 
অর্ক অবারিত জলস্রোতের মতো বলে যাচ্ছে—

“অনুরাগিনী চলো!” 
গল্পের বাগানে পা রাখি আমরা। যেখানে সময় নিজেই থমকে দাঁড়ায়, আর মানুষের হৃদয় খুঁজে নেয় নিজের শিকড়। 

যেখানে কচি পাতার শিরায় রোদ খেলে যায়, যেখানে অচেনা মুখ থেকে জন্ম নেয় চিরচেনা আপনজন! 

যুবকের বয়স তখন একুশের দোরগোড়ায়। মা–বাবা ঠিক করলেন, এবার ঘরে বউ আনবেন। 

একদিন তাঁরা যুবককে সঙ্গে নিয়ে গেলেন পাত্রী দেখতে। প্রথম দর্শনেই মেয়েটিকে মা-বাবার ভীষণ পছন্দ হলো। 

যুবক বসে আছে সজ্জিত নিমীলিতনয়না অবগুণ্ঠিতার সামনে। তার দিকে যুবক চোখ তুলে তাকায়। 

পলক পড়তেই চোখ নামায়, আবার তাকায় নির্নিমিখ দৃষ্টিতে। দৃষ্টিটা স্থির হয়ে থাকে মেয়েটির মুখে— যেন মুখ নয়, একটা দূরদেশের অচেনা মানচিত্র। সে যেন অনুভূতিহীন, যেন হারিয়ে গেল উদাসীনতার বিভোল রাজ্যে।

এক পলকের একটু দেখায় ষোড়শী পাত্রী মুগ্ধ হলো। অজানা এক অনুভূতি খেলে গেল তার সলজ্জ আননে। 

যুবক যেন তার কোমল হৃদয়ে আসন গেড়ে বসল। তার হৃদয়ের ছোট্ট ঘরে যুবকের জন্য দরদ উথলে উঠল। যুবকের সাথে যেন তার জনম জনমের প্রণয়। 

ভাবাবেগের বিবশতায় ডুবে গেল ষোড়শীও। আচ্ছা! একি সত্যি না-কি কল্পনার সাথে মিশামিশি, স্বপ্নের ছুঁয়াছুঁয়ি? এই সুদর্শন যুবক কি হবে আমার প্রিয়তম! আমি হতে পারব কি তার প্রিয়তমা! 

হৃদয়াকাশে আশা-নিরাশার আলো-ছায়া উঁকি দিচ্ছে বারবার, কখনও মেঘের ছায়া, কখনও রোদের হাসি। 

একবার আনন্দের হিল্লোল দোলা দিয়ে যায়, আরেকবার বিষণ্ণতা রেখাপাত করে মনের আঙিনায়। আচমকা ছন্দময় আনন্দে মন নেচে ওঠে। 

যুবক ভাব ও ভাবনার জগৎ থেকে সম্বিত ফিরে পায়। ডানে-বামে মাথা নাড়িয়ে পাত্রী তার মনঃপূত না হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ষোড়শীর ছন্দময় আনন্দ যাত্রায় হঠাৎ ছন্দপতন ঘটে। মনে উৎকণ্ঠা হানা দেয়! 

যুবকের মা-বাবাও তখন উৎকণ্ঠিত, উদ‍‍্‍‍বিগ্ন। 
সবাই তাকে বোঝাচ্ছে। কারো বুঝ সে মানছে না। বিয়েতে রাজি হচ্ছে না। যুবকের এক কথা— পাত্রী পছন্দ হয়নি। 

যুবকের কথায় মা-বাবার মন ভেঙে গেল। বাবার আঁখি ছলছল, মায়ের চোখ অশ্রুসজল। যুবক জীবনে কখনও মা-বাবাকে কষ্ট দেয়নি, আজ তার জন্য বাবার চোখে পানি, মায়ের চোখে অশ্রু। তাদের নীরব অশ্রু তাকে চুপচাপ দগ্ধ করছে।

হৃদয় দগ্ধ, মন বিষণ্ণ তবুও মা-বাবার খুশির কথা ভেবে বিয়েতে রাজি হয়। মা-বাবার মুখে তখন তৃপ্তির আলো, যেন হঠাৎ পৃথিবী আবার নিজের কক্ষপথে ফিরে এসেছে। মা-বাবার মুখে হাসি। যুবকের চোখে পানি। হয়তো বেদনার নয়— আনন্দাশ্রু!

বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হয়। মনের গভীরে চাপা কষ্ট, হৃদয়ে পুষে রাখা ব্যথা নিয়ে বাড়ি ফিরে যুবক।

দিন যায়, মুহূর্ত আসে। বিয়ে সম্পন্ন হয়। শাশুড়ি ষোড়শীর হাতটি আলতো করে তুলে দেন যুবকের হাতে— কণ্ঠে মায়াভরা অনুরোধ, ওকে দেখে রেখো বাবা।

যুবক যেন কিছুটা অবচেতনভাবে শান্ত স্বরে উত্তর দেয়, চিন্তা করবেন না, সে ভালোই থাকবে।

মুহূর্তটিতে যেন সময় একটু থেমে যায়— আশীর্বাদ, আবেগ আর নীরব প্রতিশ্রুতির এক মায়াময় মিশ্রণ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।

অথচ, দাম্পত্যের এই শুভলগ্নে যুবকের মনের গতিপ্রকৃতিতে কোনো উচ্ছলতা নেই, মনে পুলক নেই, হৃদয়ে কোনো কম্পন নেই। 

বরং ছিল এক নীরব প্রতিরোধ। যুবক মনে মনে নিজেকে বুঝ দেয়, এটি দায়িত্বের বাঁধন, আবেগের বন্ধন নয়। সে ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের চারপাশে একটি অদৃশ্য দেওয়াল তুলে রাখে।

ষোড়শী উদ‍‍্‍‍বিগ্ন, কী আছে তার অদৃষ্টে! নব দাম্পত্য কেন হবে উচ্ছলহীন। সে কেন দাম্পত্যের উচ্ছ্বাসময় চঞ্চলতা থেকে, প্রিয়তমের সোহাগ থেকে বঞ্চিত হবে। 

ষোড়শী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। যুবকের পাশে বসে নরম গলায় জিজ্ঞেস করে, আপনি গম্ভীর হয়ে আছেন কেন?

যুবক ঘাড় ঘুরিয়ে নেয়, উত্তর দেয় না। নববধূ বলে ওঠে, আমার স্বপ্ন—সারা রাত গল্প করব, আসমানে চাঁদ থাকবে আর জমিনে আমরা দুজন।

যুবক বলে, আমারও কিছু স্বপ্ন ছিল। সবার সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। নববধূ বলে, আপনার স্বপ্ন পূরণ হয়নি বলে আমার স্বপ্ন ভেঙে দিচ্ছেন? 

যুবক জিজ্ঞেস করে, মানে? 
অভিমানের ঢঙে মেয়েটি উত্তর দেয়, কিছু না। 

চুপচাপ বসে আছে দুজন অনেকক্ষণ, কারো মুখে কথা নেই। 

মেয়েটি যুবকের আরও কাছে এসে, কণ্ঠে দরদ মেখে বলল, আপনার কীসের এত যন্ত্রণা, আমাকে কি বলা যায় না? 

আপনি আজ এত নির্লিপ্ত, কী এমন ব্যথা, কী এমন বঞ্চনা? আমি হতে চাই আপনার সেই বঞ্চনার সান্ত্বনা! 

যুবক তখনো দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। কিন্তু মেয়েটির কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল অদ্ভুত এক ধৈর্য এবং আন্তরিকতা। 

যুবক মনে মনে ভাবে, কেন আমি আমার ব্যর্থ ইচ্ছার নীরব প্রতিশোধ ওর ওপর নিচ্ছি? এই মেয়েটি তো কোনো দোষ নেই। তাছাড়া আমি যে ওর মাকে কথা দিয়েছি সে ভালো থাকবে।

ভাবনার দোলায় দোল খেতে খেতে মনে এক অচেনা অস্থিরতা নেমে আসে—নীরব প্রশ্নগুলো যেন তার হৃদয়ে মৃদু ঢেউ তোলে। ভেতরের সেই কঠিন দেওয়ালটি যেন সামান্য কেঁপে ওঠে। 

যুবক ধীরে মুখ তোলে, চোখে বেদনার নীল ছায়া। সে ফিসফিস করে বলে, তুমি কি হতে পারবে আমার সারা জীবনের সুখ, অশান্ত জীবনের সান্ত্বনা? ব্যথাভরা মরুতুল্য তৃষিত হৃদয়ে করতে পারবে প্রেমসঞ্চার?

কেন নয়, প্রিয়তম? আপনার কণ্ঠে অনুরাগের মালা পরাতে আমি উন্মুখ। আপনার হৃদয় আমি ভরিয়ে দেব, নিষ্প্রাণ মরুভূমিকে সবুজে সবুজে সাজিয়ে দেব, ভালোবাসার সবুজ লতায়!

আমি হতে চাই আপনার মালঞ্চের মালাকার। আমার হাতটি ধরুন, নিন নরম হাতের কোমল স্পর্শ!

যুবক এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে— যেন সেই নিঃশ্বাসে হৃদয়ের সব প্রতিরোধের শেষ চিহ্ন মুছে দিলো। 

সে ভাবে, তার অনিচ্ছাকৃত জীবনপথের এই সঙ্গিনীই হয়তো স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ উপহার। দ্বিধা সত্ত্বেও, সে যেন এক অনিবার্য টানে নিজের হাতটি বাড়িয়ে দিলো।

যুবক স্পর্শ করে ষোড়শীর বাড়িয়ে দেওয়া হাত। দারুণ এক রোমাঞ্চে ভরে ওঠে তার মন। হৃদয় শিহরিত, দেহ পুলকিত। অনিচ্ছার বাঁধন ভেঙে গিয়ে জন্ম নেয় এক অপ্রত্যাশিত অনুভূতির আলোড়ন।

যুবক শিরায় শিরায় বয়ে যাওয়া আলোড়ন আড়াল করতে চায়, কিন্তু তার চোখ লুকোলো না অনুভূতির ঝলক।

ষোড়শীর মনের সেতারে বেজে উঠে এক গীত— ‘তোমারি পরশে জীবন আমার ওগো ধন্য হলো, তুমি যে আমার চির আশার আলো।

যুবকের হৃদয় বীণায়ও যেন অনেকটা অগোচরে বেজে চলে— ‘একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে, ওগো বন্ধু কাছে থেকো পাশে থেকো।’ 
সম্পর্ক পেল নতুন নিবিড়তা, আর প্রেম— হয়ে উঠল গভীর, অবিচ্ছেদ্য।
 ※


সময়ের স্রোত বেয়ে তাদের প্রেমের ওপিঠে জড়ো হয় কিছু মান কিছু অভিমান— নরম, অথচ দহনময়। 

অগোছালো কিছুই পছন্দ করে না যুবক। অথচ ষোড়শী বধূ অবচেতনে কখনো মুখ ফসকে বলে ফেলে বিক্ষিপ্ত কিছু কথা, কিংবা আচরণে ছিটিয়ে দেয় একফোঁটা অগোছালোতা।

তাতে যুবকের ভেতর দপ করে জ্বলে ওঠে আগুন— রাগে কখনো তার চোখ বড়ো হয়ে ওঠে, যেন চোখের পাতা ভেদ করে বেরিয়ে আসবে দহনমিশ্রিত দৃষ্টি।

ষোড়শীর কলিজা শুঁকিয়ে আসে, ভয়ে চুপসে যায় সে। মুখে কোনো শব্দ নেই, কেবল নীরবতার ভেতর তার সত্তা জুড়ে এক মৃদু কম্পন। 

সেই নীরবতা ধীরে ধীরে যুবকের রাগে ঢালে শীতলতার জল। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ষোড়শীর দিকে— এত চুপচাপ, এত নিরীহ! 

একসময় মনে হয়, ওর ওপর রাগ করা যেন পাপ। বুকের ভেতরটা নরম হয়ে আসে যুবকের। 

নরম স্বরে বলে, তুমি এমন চুপ করে থাকো কেন?
ষোড়শী তাকায় না, কেবল নিচু চোখে ফিসফিসিয়ে বলে, ভয় পাই। 

এই দুটো শব্দে স্থির হয়ে যুবক ভাবে, সে ‘চোপা’ করে না, সত্যিই ভয় পায়। এবং সেই ভয়টুকুও কত স্নিগ্ধ, কত আপন!

দিন যায়, রাত নামে, রাতের শেষে আসে শিশিরসিক্ত ভোর। যুবক আস্তে আস্তে নিজের ভেতরকার ঝড় স্তিমিত করে, আবিষ্কার করে এক বিস্ময়কর সত্য— ষোড়শী বধূর ভালোবাসা ধিকিধিকি অগ্নিশিখার মতো, যা ছড়িয়ে দেয় উষ্ণতা, আবার দোলা দেয় প্রেম।

শিশিরস্নাত প্রভাতে, নরম রোদের গোধূলিলগ্নে মেঠো পথ বেয়ে তারা পাশাপাশি হাঁটে না— তবুও প্রেম থেমে থাকে না। ভালোবাসায় চির ধরে না। আস্তে ধীরে ষোড়শী বধূ হয়ে ওঠে প্রেয়সী। 

গোধূলির লালিমা আঁধারে হারায়। আবার রাত নামে। আকাশে তারারা খেলা করে, চাঁদের আভায় নদীর ঢেউ নেচে ওঠে, যেন প্রিয়ার চুলে জড়িয়ে থাকা কাঁকনের মৃদু ঝংকার। 
※ 


অর্ক কফির মগে চুমুক দেয়, মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করে— গল্প কি উপভোগ করছ! সে মাথা নাড়ায়, হুঁ,  করছি!

দিন গড়ায়, ঋতু বদলায়। একদিন আসে সেই আলোকিত সংবাদ— নতুন অতিথি আসছে ঘরে। এক সকালে সেই শুভলগ্ন উপস্থিত হয়। একটি শিশুর আগমনে সংসার পূর্ণতা লাভ করে। 

মাতৃত্বের স্বাদ পায় প্রেয়সী— প্রথমবার শিশুকে কোলে নিয়ে তার চোখে জল আর হাসি মিশে একাকার। তার বুক ভরে ওঠে অচেনা এক কোমল অনুভূতিতে। 

পিতৃত্বের সুখে যুবকের হৃদয় উথলে ওঠে, শিশুটিকে বুকে তুলে নেয়— যেন শুকনো মাটিতে প্রথম বৃষ্টির ছোঁয়া। চোখের কোণে জলের দীপ্তি, তবু তা বেদনার নয়— জীবন জেগে ওঠে নবঘ্রাণে।

শিশুর কণ্ঠে প্রথম কান্না যেন আশীর্বাদের মতো
ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। আঙিনার প্রতিটি কোণে, দেওয়ালের গায়ে খেলা করে নতুন আলো।
 
প্রথম কন্যা সন্তান তখন হাসতে শেখে, হাঁটতে শেখে, আপন মুখে ডাকে— “আব্বা, আম্মা”। সে ডাক যেন আকাশ ভরে তোলে পাখির কূজনের মতো আনন্দে।

কয়েক বছর পর আবারও আসে অতিথি। প্রথম আলোর মতোই ঘর আলোকিত হয় দ্বিতীয় কন্যার   জন্মে। 

প্রথম কন্যা যেমন ফুলের কলি, তেমনি দ্বিতীয় কন্যা ফুটে ওঠে নতুন সুবাসে। দুটি কন্যার কলতানে ঘর হয়ে ওঠে উদ্যান— হাসি-কান্না, খেলা-ধুলায় আর প্রেয়সীর মমতায় ভরে যায় সংসার।

এ যেন প্রকৃতির পূর্ণ দান— স্নেহের আলোকচ্ছটায় দীপ্ত এক পরিবার। ঘরজুড়ে সাজায় প্রেমময় কোমল আলপনা, কেবল মেঝেতে নয়, প্রিয় আর প্রেয়সীর হৃদয়ের দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকে এক অনন্ত মায়ার রেখা। 

প্রতিটি স্পর্শে, প্রতিটি হাসিতে, প্রতিটি শিশির বিন্দুতে যেন সেই আলপনা জীবন্ত হয়ে ওঠে—ঘরের বাতাসে, হৃদয়ের কোণে, আর তাদের দাম্পত্যের আঙিনায় এক করে দেয় সবকিছু।
※ 


জীবনসঙ্গীর ঠোঁটে হাসি, চোখে বিস্ময় নিয়ে বলল, তারপর কী হলো? ঠান্ডা হয়ে আসা কফির মগে চুমুক দিয়ে মনটা বিষণ্ণ করে অর্ক বলল—

হঠাৎ মুছে যায় আলপনার রেখা। ব্যাপারটা খুবই সংবেদনশীল, যা শব্দের শরীরে বলা চলে না— অন্যায়ের প্রতিবাদ করেও রোষানলে পড়ে যুবক। এতে পরিবার, আত্মীয়স্বজন সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়। পাড়ার মানুষ কৌতূহলী আর নিকট প্রতিবেশীরা বুনে চলে ষড়যন্ত্রের জাল। 

এই ঘোর বিপদে সে কিছু মানুষকে নতুন করে চিনেছে— কেউ, যাকে আপন ভেবেছিল, দূরে সরে গেছে; আবার কারো, মুখোশ উন্মোচিত হয়ে বেরিয়েছে প্রকৃত চেহারা।

একেকজন একেক পরামর্শ দেয়— কারোরটা অবিবেচনাপ্রসূত, কারোরটা অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর কাছে যায়, ওর দ্বারস্থ হয়— তবুও সমাধান মেলে না।

সে তখন একা হয়ে পড়ে, অসীম আকাশের নিচে দাঁড়ানো একটি গাছের মতো, যার শিকড় শুকিয়ে গেছে, যার পাতায় ঝরে পড়ছে বিষণ্ণতা। 

কেউ পাশে দাঁড়ায় না। সে যখন নিমজ্জিত হতাশার আঁধারে, তখন আশার আলো জ্বালিয়ে পাশে দাঁড়ায় প্রেয়সী! 

যার চোখে ছিল অফুরন্ত ধৈর্য আর আশ্বাসের দীপ্তি, কণ্ঠে ছিল নীরব সান্ত্বনার সুর। মায়াভরা এক নীলপদ্ম, যার পাপড়ি কোমল অথচ ডাঁটি অটল!

যুবক এবার তাকে আবিষ্কার করে নতুনভাবে, যেন চেনা মুখে অচেনা এক আভা ফুটে উঠেছে। প্রিয়ার হাতের মুঠোয় সে পেল অবলম্বন, যেন গভীর জলে ডুবে যাওয়া মানুষ খুঁজে পেল ভেসে থাকা কাঠের টুকরো।

ঝড়ের পর মেঘ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা এক টুকরো রোদের মতন— প্রেয়সীর ভরসার আলোয় উজ্জীবিত হয়ে এলাকাবাসীর হৃদ্যতায় দীর্ঘ পথ পেরিয়ে রোষানল থেকে পরিত্রাণ মেলে।

যুবককে এখন অনেকটা নির্ভার লাগছে, মুখে ফুটেছে ক্লান্ত হাসি। ঠিক সেই মুহূর্তে, প্রেয়সী আলতো কণ্ঠে বলে— প্রিয়, আপনি ভাববেন না, আমি তো আছি আপনার পাশে। 

আপনার ক্লান্ত শরীরে আমি ঢেলে দেব সজীবতার নবধারা। আপনার চোখের বিষণ্নতায় আমি বুনি আলো, আপনার দগ্ধ প্রাণে আমি ছড়িয়ে দেব শিশিরের শান্তি।

যুবক তাকিয়ে থাকে বিস্ময়ে— তার হৃদয় কেঁপে ওঠে। এ কি শুধু একটি নারীর ভালোবাসা? না—এ এক অনন্ত প্রতিশ্রুতি, যেখানে সংসারের অনটন মুছে যায়। যেখানে শত অক্ষমতা চাপা পড়ে স্নেহের আঙিনায়।

যত দিন যায়, ততই যেন তার মনের অলিন্দে স্থায়ী নিবাস গড়ে তুলে প্রেয়সী বধূ— মায়ার মালঞ্চে অমল ফুল হয়ে।

যুবক বলে উঠে, “তুমি কী করে এলে আমার হৃদয়ের শূন্য প্রান্তরে, কীভাবে তুমি এমন করে ভালোবাসতে শিখলে?”

প্রেয়সী মৃদু হাসে, চোখ নামিয়ে বলে, ভালোবাসা তো নদীর মতো, আপন গতিতে বয়ে যায়। সে কখনও বলে না—আমি আসছি। সে কেবল ছুঁয়ে যায়, ভিজিয়ে দেয়, গড়িয়ে যায় হৃদয়ের শুষ্ক প্রান্তরে।

প্রেয়সীর চোখে তখন এক অদ্ভুত দীপ্তি। সেই চোখে অপার আশ্বাস— আমি আছি, আমি থাকব। ভালোবাসা মানে কেবল শরীরের সংযোগ নয়, বরং আত্মার সেতুবন্ধন। দুজন মিলে এক অবিচ্ছেদ্য আত্মা।

যুবক প্রেয়সীর খুব কাছে বসে, আজ কণ্ঠে কেবল অব্যক্ত স্মৃতির অনুরণন—জানো, সেই দিনগুলো কত অনন্য ছিল, যখন ভালোবাসা আমাদের জীবনে পদধূলি দিয়েছিল, যখন আমরা একে অপরকে চিনতাম না, অথচ হৃদয়ের গহিনে একে অপরের মনের ভেতরে হেঁটে বেড়াচ্ছে, চুপিচুপি। 

এক আকাশ নক্ষত্রহীন ছিল, কিন্তু তবুও আলো ছিল তোমার চোখে। অদ্ভুত আলো। আমি বুঝতে পারতাম না, ওই আলো কেমন করে আমাকে ডাকে। কোনো শব্দ ছিল না, কোনো ইশারা ছিল না, তবুও যেন কেউ বলছে—“এই যে, আমি আছি।”

আমি তখনো ভাবিনি এটা প্রেম কিনা। শুধু একটা বেদনা হালকা করে বুকের ভেতর বসে গিয়েছিল। শান্ত, কোমল বেদনা। 

সজনে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে হাওয়ার দোলায় আমি চোখ বন্ধ করতাম—ভাবতাম, এই বাতাসটাই হয়তো তোমার গায়ের গন্ধ নিয়ে এসেছে।

প্রেমের শুরুটা এমনই ছিল—নরম, নিরীহ, তবুও গভীর। কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না, কোনো ঘোষণা ছিল না। শুধু এক শব্দহীন বোঝাপড়া—যেন দুইটা মন হঠাৎ একই পথে হাঁটতে শুরু করেছে।

প্রেয়সীর ঠোঁটে গোলাপি হাসি। যুবক প্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে বলে, তোমার নরম কাঁধে যখন আমার চিন্তার ভার রেখে দিতাম, তুমি হাসতে। সেই হাসি ছিল না কেবল ঠোঁটে, ছিল দৃষ্টিতে, ছিল আত্মার গভীরে। 

তুমি আমার বিষাদ বালুকাবেলায় জোয়ার এনেছিলে। তুমি ছিলে আমার প্রতীক্ষার অনিন্দ্য ফল, আমার প্রার্থনার উত্তর, এক অনুচ্চারিত স্বপ্নের বাস্তব রূপ।

আমি বুঝতে পারিনি, তুমি কবে হয়ে উঠলে আমার নিশ্বাসের নির্মল বায়ু। কবে আমার মনের গোপন সিন্দুকের চাবি তোমার নরম আঙুলের মাথায় এসে লেগে গেল!


প্রেয়সী একদিন বলেছিল, সে হতে চায় যুবকের হৃদয় মালঞ্চের মালাকার। কিন্তু আজ! যুবকের সরল স্বীকারোক্তি— প্রেয়সী, তুমি শুধু মালাকার হওনি, তুমি হয়েছ সে বাগানের দরদী মালী, যে সকালবেলা শিশিরের মতো কোমল স্পর্শে হৃদয়ের পাপড়ি ভেজায়, সন্ধেবেলায় ভরসার আলতা দিয়ে আঁকে সুখের আলপনা।

আমি তোমাকে বলিনি, কিন্তু তুমি হয়ে উঠেছ আমার শব্দহীন কবিতা, আমার অনুচ্চারিত প্রেমগান।

এক বিকেলে আমি তোমাকে বলেছিলাম, চলো, হারিয়ে যাই কোনো পাহাড়ের পাড়ে, যেখানে কেবল তুমি আমি আর ঝরনার শব্দ থাকবে।

তুমি চোখ মেলে তাকিয়ে বলেছিলে, যেখানে ভালোবাসা আছে, সেখানেই তো পাহাড়, সেখানেই তো ঝরনা।

এই কথায় যুবকের বুকের মধ্যে জেগে ওঠে ঢেউ— ভালোবাসার, শান্তির, এক অনির্বচনীয় দীপ্তির, যেখানে সময়ও হার মানে, যেখানে নিঃশ্বাস হয়ে ওঠে প্রার্থনা।

যুবক অনর্গল বলে যায়, প্রেয়সী বলে না কিছু— শুধু শোনে আর হাসে, তারার মতো মিটিমিটি, চোখের কোণে যেন আকাশ ভরা দীপ্তি।

সেই হাসির শব্দে লুকিয়ে থাকে অজস্র সান্ত্বনা—যেন নিস্তব্ধ রাতের উঠোনে বাতাসের হালকা দোলা, যেন শীতের ভোরে প্রথম সূর্যের উষ্ণতা।
※ 


“প্রিয় সুহাসিনী!” 
প্রেয়সী যুবককে শেখাল, কীভাবে প্রেমকে পাখির মতো উড়িয়ে দিতে হয় আকাশে, আবার ডেকে আনতে হয় কাঁধে। প্রেম মানে কেবল কাছে থাকা নয়, প্রেম মানে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা— সে পাশে নেই, তবুও আছে।

যাকে সে প্রথম দেখায় হৃদয় দিয়েও চিনতে পারেনি, তাকেই একদিন হয়ে উঠতে হবে তার জীবনের প্রিয়তমা। কিন্তু প্রেম তো কেবল চোখে দেখা, ঠোঁটে উচ্চারিত শব্দ নয়; প্রেম এক অনুভব, এক গ্রহণের নাম।

যুবকের ভেতর ছিল দ্বিধা, অস্থিরতা, একরাশ ক্ষোভ—নিজের ইচ্ছাকে ত্যাগ করে সমাজের চাপে, ভালোবাসার ভাষা না জেনে, সে হয়ে উঠেছিল একজন বর। 

কিন্তু ওই ষোড়শী! যার বয়স তখনও জীবনের পূর্ণতার দোরগোড়ায় পৌঁছায়নি, বুকের গোপনে এক আশ্বাস বুনে চলেছিল—এই যুবকই হবে তার জীবনের আশ্রয়।

সেই থেকে শুরু হয়েছিল এক যৌথ পথচলা। একে অপরকে বুঝে নেওয়ার, ভালোবাসার প্রথম অক্ষর থেকে শেষ পঙ্‌ক্তি পর্যন্ত একত্রে শিখে নেওয়ার।

প্রেম সেই ধীরে ধীরে বাসা বাঁধতে থাকে দুজনার মাঝে। নির্লিপ্ততা গলে যায় স্নেহে, অভিমান মিশে যায় চুম্বনের আদরে। 

তাদের সংসারের উঠোনে নেমে আসে আরও এক নবজীবনের আলো— এক শিশু পুত্র, নিষ্পাপ, অথচ রহস্যময় দীপ্তিতে ভরা।

আজ তাদের দাম্পত্যের ষোলো বছর পূর্ণ হলো— ভালোবাসার নদী কতবার শুকিয়েছে, আবার ভরে উঠেছে বৃষ্টির স্নেহে। তবু তারা টিকে আছে— প্রার্থনার মতো, ধূপের ধোঁয়ার মতো স্নিগ্ধ এক ভালোবাসায়।

সংসারের প্রতিটি দিন হয়ে ওঠে নতুন এক অধ্যায়—যেখানে ভালোবাসা কেবল শরীর ছোঁয়ার নয়, মন ছুঁয়ে দেখার, জীবনকে একসঙ্গে বয়ে নিয়ে যাওয়ার এক মৃদু প্রতিজ্ঞা।
※ 


গল্পের আঙিনা থেকে দুজন ফেরে বাস্তবতার উঠোনে, রোদ ঝলমলে বারান্দায়। অর্ক আলতো করে জীবনসঙ্গীর হাত চেপে ধরে মৃদুস্বরে বলল—

“প্রিয় প্রণয়িনী!”
তুমি কি ওই ষোড়শীকে চিনতে পারো? তুমি কি ওই যুবকটিকে মনে রেখেছো—যুবকটি আমি, ষোড়শীটি তুমি?

আজ, অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। তোমার চুলে এসে লেগেছে রুপোর রেখা, আমার চোখে এসে জমেছে সময়ের কালি।

তবু আমি জানি— আমাদের হৃদয়ের গোপন অক্ষরগুলো মুছে যায়নি, আমাদের প্রথম ভালোবাসার শ্বাস এখনো বাতাসে ভাসে।

সময়ের ঢেউ যতই বয়ে যাক, আমাদের সেই প্রথম দিনের স্নিগ্ধতা আজও স্বপ্নের মতো ঘিরে রেখেছে দুজনকে। প্রেম এখনও ফোটে, নরম হয়ে, শীতল বাতাসে ঘ্রাণ ছড়ায়।

এবার কথা ফুটে ওঠে অর্কর জীবনসঙ্গীর ঠোঁটে, তার কণ্ঠে মোলায়েম উচ্চারণ—
প্রেম শেষ হয় না, সে শুধু অবয়ব বদলায়— ফুল থেকে পাতা, বাতাস থেকে সুবাস হয়ে যায়! 

অর্ক জীবনসঙ্গীর চোখে চোখ রেখে বলল—
“অথচ, বিগত দিনের মতো আজও বলা হলো না— অ্যাই লভ ইউ, আমি তোমাকে ভালোবাসি, ‘প্রেয়সী’।”
※ 
উৎসর্গ:
বিবাহবার্ষিকীর সোনাঝরা ক্ষণে, নিশ্ছিদ্র প্রেমের পুরোনো উঠোনে— যেখানে ষোল বসন্ত আলো-ছায়া মেখে গেছে দিনরাত্রি। 
শুষ্ক মোহনায় হঠাৎ জেগে ওঠা নতুন স্রোতের মতো তুমি— আশ্বাসের দীপশিখা, সান্ত্বনার নরম গান। 
বিষণ্ণ দুপুরে তোমার ছোঁয়ায় নামে মোলায়েম রোদ্দুর, ক্লান্ত জীবনে জাগে প্রেরণার শস্যখেত। 
সে কারণেই— এই গল্পের সমস্ত আলো তানজিনা, তোমার জন্যই!
#নিস্তব্ধ প্রণয়যাত্রা #অর্ক #প্রেয়সী || 
🗓️ ২০ নভেম্বর ২০২৫ খ্রি.

ষোলো বসন্তের আলোছায়া



ষোল বসন্তের আলোছায়া 

👤 আশরাফ ইবনে আকন্দ 

প্রেয়সী, 
সেই দিনগুলো কত অনন্য ছিল, 
যখন ভালোবাসা প্রথম আমাদের 
জীবনে পদধূলি দিয়েছিল—
যখন আমরা একে অপরকে চিনতাম না, 
অথচ হৃদয়ের গভীরে
একে অপরের নাম লেখা হচ্ছিল নিঃশব্দে, 
এক অদৃশ্য কলমে।

একদিন আকাশ ছিল নক্ষত্রহীন,
তবু আলো ছিল তোমার চোখে।
আমি দেখেছি— 
সেই আলো আমায় ডেকে নেয়,
সে ছিল না কোনো 
কামনা-বাসনার গন্ধমাখা ডাক, 
ছিল এক পবিত্র বেদনাময় আহ্বান—
যেখানে হৃদয় খুঁজে পেতে চায় 
আরেক হৃদয়ের সমান্তরাল সঙ্গ। 
সেখানে সজনে গাছের ছায়া ছিল, 
জুঁই ফুলের গন্ধ ছিল বাতাসে।

ষোলো বসন্তে—
ভালোবাসার নদী কতবার শুকিয়েছে,
আবার ভরে উঠেছে বৃষ্টির স্নেহে।
তবুও আমরা টিকে আছি—
প্রার্থনার মতো, ধূপের ধোঁয়ার মতো
স্নিগ্ধ ও অনন্য এক ভালোবাসায়।

তোমার চুলে এসে লেগেছে রুপোর রেখা,
আমার চোখে জমেছে সময়ের কালি।
তবু প্রেম এখনও ফোটে—
নরম হয়ে, শীতল বাতাসে ঘ্রাণ ছড়ায়।

কারণ প্রেম শেষ হয় না।
সে কেবল অবয়ব বদলায়—
ফুল থেকে পাতা, 
বাতাস থেকে সুবাস হয়ে যায়।
※ 

উৎসর্গ:
বিবাহবার্ষিকীর স্বর্ণালি প্রহরে, 
নিশ্ছিদ্র ভালোবাসার স্মৃতিতে,
ষোল বসন্তের আলোছায়ায়, 
শুষ্ক মোহনায় নব স্রোতধারা, 
আশ্বাসের দীপ্তি, সান্ত্বনার সুর, 
বিষণ্ণতার মোলায়েম রোদ্দুর এবং 
প্রেরণার অনন্য উৎস— 
তানজিনা তোমাকে! 

নব অবতরণ

নব অবতরণ 

শিশু, তুমি নেমেছো ধূলির ধরায়
বাতাসে দোলে দুধের ঘ্রাণ, 
দরজার চৌকাঠে কেঁপে ওঠে বৈকালিক রোদ্দুর,
ধূলির ভিতরে মিশে যায় রহমতের ধ্বনি,
তোমার আগমনে, আসমানের বুক ভরে যায়
নব চাঁদের কোমল জ্যোত্স্নায়।

আনন্দে নেচে ওঠে বাতাস,
বৃক্ষপত্র গুনগুনিয়ে পাঠ করে আশীর্বাদ—
‘এই শিশু হোক নদীর মতো ধৈর্যশীল,
মাটির মতোই বিশ্বস্ত ও শান্ত।’

হে নবজাত,
তোমার চোখে লুকানো আছে নদীর শান্তি,
তোমার নিঃশ্বাসে শোনা যায় আজানের প্রতিধ্বনি।
তুমি এলেই যেন ঘরে ফেরে পরম শান্তি,
কোলের দোলনায় দুলে ওঠে সমগ্র পৃথিবী।

তুমি এসেছো—
রবের অক্ষর নিয়ে, আসমানের পৃষ্ঠা ছুঁয়ে।
তোমার প্রথম কান্নায় জেগে উঠেছে জমিন,
ফসলের মাঠে নেমেছে অনুগ্রহের বৃষ্টি।

বলো, হে ছোট্ট প্রাণ,
তুমি কি জানো—তোমার আগমনে
একজন মানুষ ‘মামা’ হয়েছে আজ,
তার চোখে লেগেছে স্নেহের নতুন সূর্য,
তার মুখে ফোটে ইদের হাসি।

আশরাফ ইবনে আকন্দ
   জালেশ্বর, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ, 
   ০৩ নভেম্বর ২০২৫ খ্রি.।

খোলা চিঠি



আমাদের শৈশবের আকাশে একেকজন শিক্ষক যেন একেকটি দীপশিখা— নিভে গেলেও তাদের আলো রয়ে যায় চোখের ভেতরে। ইব্রাহিম স্যার ছিলেন তেমনই এক আলোকমানব, যাঁর চোখের দৃষ্টি আর কঠোর কণ্ঠস্বরের ভেতর লুকিয়ে ছিল অদ্ভুত মমতা। তাঁর বাঁশের কঞ্চি ছিল শাসনের ছদ্মবেশে স্নেহের দণ্ড, তাঁর ঠান্ডা গলার উচ্চারণে ছিল মানুষ বানানোর নীরব দীক্ষা।
শিক্ষক দিবসে ‘আশরাফ ইবনে আকন্দ’র এই চিঠি শুধু এক ছাত্রের কৃতজ্ঞতা নয়; এখানে শব্দ নয়, বেজে ওঠে— ভালোবাসার, স্মৃতির, শ্রদ্ধার ধ্বনি।  — লেখাপত্র।


শ্রদ্ধেয় ইব্রাহিম স্যার সমীপে
স্যার,
শ্রদ্ধা ও বিনয়ের নিঃশব্দ আলপনায়
আপনাকে আমার অন্তরের সালাম।
আপনি কেমন আছেন, জানি না।
আমার নামটি আজও
আপনার স্মরণে আছে কি না, তাও জানি না।
ভিতুর ডিম, শান্ত লাজুক ছেলেটার কথা
কি মনে পড়ে?

তবে আমি জানি—
আপনার উচ্চারণের শুদ্ধতা,
চোখের গভীর নির্দেশ,
আর কণ্ঠস্বরের কঠোর শাসনে
আমি আজও দাঁড়িয়ে আছি—
ভিতর থেকে সোজা হয়ে।

স্যার,
আমি “অ আ ক খ” শিখেছিলাম
আপনার হাত ধরে,
কিন্তু এখন বুঝি—
আপনি আমাকে শুধু অক্ষর শেখাননি,
আমাকে শিখিয়েছিলেন—
ভয়ের বুক চিরে ভালোবাসা খুঁজে নিতে,
শৃঙ্খলার ভেতরেই নিজেকে আবিষ্কার করতে।

আপনার সেই বাঁশের কঞ্চি,
যেটা ছিল ভয়ঙ্কর এক ছায়ার মতো,
আজ বুঝি—
তা-ই ছিল কোমল এক স্পর্শের ছদ্মবেশ।
আপনি যখন ঠান্ডা গলায় ডাক দিতেন—
“আশরাফ, দাঁড়া তো!”
তখন মনে হতো আকাশ বুঝি ভেঙে পড়বে,
কিন্তু এখন জানি—
সে-ই ছিল আমার প্রথম একক দাঁড়িয়ে থাকার পাঠ,
মানুষ হবার সাহস শেখার সূচনা।

আমরা তো তখন জানতাম না “শিক্ষক” শব্দের মানে—
আজ বুঝি—
শিক্ষক মানে সেই আলোর মানুষ,
যিনি আমাদের আঙুল ধরে
শব্দের অরণ্য পেরিয়ে
মানুষ হবার পথ দেখান।

স্যার,
আপনি হয়তো জানেন না—
আপনার সেই “অ আ ক খ” শেখানো ছেলেটা
আজ গদ্য লেখে,
আপনার কণ্ঠের ধ্বনি গাঁথে শব্দের অলিন্দে,
মনের গভীরে এখনো বয়ে চলে
আপনার বলা প্রতিটি বাক্যের প্রতিধ্বনি।

আপনার কথা মনে পড়লে প্রতিবার মনে হয়—
আমার ভেতরে এখনো একজন ইবরাহিম স্যার বেঁচে আছেন,
যিনি আমাকে ভেতর থেকে শাসন করেন,
ঠিক করেন, গড়েন।

স্যার,
আপনি যদি কোনো একদিন এই চিঠিখানি হাতে পান—
জানবেন,
এক ছাত্রের মৌন কৃতজ্ঞতা আজও বাক্য হয়ে ফোটে,
ঠিক স্মৃতির কাঠগোলাপের মতোই—
নীরবে, গন্ধে, আর স্নিগ্ধতায়।

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়,
আপনার ছাত্র,
আশরাফ ইবনে আকন্দ


📕 “শ্রদ্ধেয় ইবরাহিম স্যার, আপনি আছেন আমার শব্দের প্রতিটি শ্বাসে। আজও যখন লিখি, কলমের আড়ালে বাজে আপনার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি— অ, আ, ই, ঈ।”
আমার শিক্ষকদের মধ্যে যাঁরা এখনো বুক ভরে নিশ্বাস নেন, আর যাঁরা পৃথিবীর আড়ালে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে আছেন— মহান রব সবাইকে শান্তিতে রাখুন, আমিন!

উগ্রতার বিষ

ধর্ম মানুষের আত্মার আলো, নৈতিকতার দিশারি। কিন্তু যখন ধর্মের নামে উগ্রতা, সহিংসতা আর বিভ্রান্তি জন্ম নেয়, তখন সেই আলো অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যায়। 
আশরাফ ইবনে আকন্দ তাঁর“ উগ্রতার বিষ” কবিতায় সেই অন্ধকারময় উগ্রতার বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছেন। মৃতের প্রতি অমানবিকতা, ধর্মের শুভ্রতায় কলঙ্ক, এবং বিভ্রান্তির রক্তে ছড়িয়ে পড়া বিষ—এসবকে তিনি শাণিত ভাষায় চিত্রিত করেছেন। কবিতাটি কেবল এক প্রতিবাদ নয়; এটি মানবতার পক্ষ থেকে উচ্চারিত এক চূড়ান্ত আহ্বান—“ধার্মিক হওয়ার আগে মানুষ হয়ে ওঠো।”   
  লেখাপত্র 

উগ্রতার বিষ

👤 আশরাফ ইবনে আকন্দ 

নিদারুণ করুণ দৃশ্যে স্তব্ধ পৃথিবী—
পদ্মার তীরে উন্মত্ত নরকুল
মৃতাশ্মীর দাহে সমাধি ভাঙে।

সমাধিস্থ না হয় ছিল ভ্রান্ত আকিদায়;
তুমি কেন আকলহারা,
হে মৃত আত্মা বহনকারী মানব?

কী জানাতে চাও দুনিয়াকে—
মুসলমান কেবল বর্বর?
অসভ্য, নির্মম, ইতর?

না, জগৎ জানে না—
এ বিভ্রান্তি তোমার,
এ উগ্রতার বিষ তোমারই রক্তে।

ধর্মের শুভ্র চাদরে 
এঁকেছো বর্বরতার নগ্ন দাগ—
কার শেখানো এ অন্ধ অগ্নিপাঠ?

হে পাষাণ জগদ্দল,
ধর্মের ঢাক না বাজিয়ে
মানবতার সিঁড়ি বেয়ে ওঠো—
ধার্মিক হওয়ার আগে
মানব হয়ে ফোটো।


❍ #উগ্রতার বিষ #২৮/০৯/২০২৫ খ্রি. 

একটি বিয়ের অভিযান-০৪


“একটি বিয়ের অভিযান”— এটা শুধু বিয়ের গল্প নয়; আত্মিক এক যাত্রা। এখানে হাসির মিহি রেখা মিশে থাকে হাহাকারে, ক্লান্তির পাশে এসে বসে ক্ষুধার সহজ স্বীকারোক্তি। গল্পের মধ্যমণি অর্ক এখানে কখনো বন্ধু, কখনো পথিক, কখনো নিঃশব্দ দর্শক— যার চোখের ভেতর দিয়ে বয়ে চলে সময়ের অনিবার্য স্রোত। যা ঘটে, যেমন ঘটে— ঠিক তেমন করেই আশরাফ ইবনে আকন্দ লিখেছেন জীবনের নরম পলিমাটির ছোঁয়ায় বাস্তবতার আখ্যান। প্রতিটি দৃশ্য পাঠকের সাথে হাঁটে, আর রেখে যায় প্রেমে ভেজা এক বিষণ্ন অনুভব— ভালো লাগা আর বিষাদের অনুপম মিশেল।     ❍ লেখাপত্র 


একটি বিয়ের অভিযান 

👤 আশরাফ ইবনে আকন্দ 

শেষ পর্ব 
পূর্বে প্রকাশের পর>>>
ঘুম আর স্বপ্নের ঘোরে ভেসে যাওয়া রাত নিমিষেই ফুরিয়ে গেল। মসজিদ থেকে ভেসে এলো ফজরের আজান। জামাল সাহেব দরজার কাছে এসে অর্ককে ডেকে বললেন, নামাজের সময় হয়ে গেছে, উঠুন।

ঘুম তবু টেনে ধরে তাকে, স্বপ্নের মতো কোমল এক বেঁধন। ধীরে উঠে বসে। জামাল সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে অজু করে, কুয়াশা ঢাকা ভোরে হাঁটে দুজন— পাখিরা ডানা মেলতে শুরু করেনি। শহিদুল্লাহ, শাকিব, হাবিব, ইমনরা ডুবে আছে গভীর ঘুমে। 

মসজিদ থেকে এসে দেখে সবাই ফিরে গেছে নাঈমদের উঠোনে। এখনো বাতাসে রয়ে গেছে নামাজের ধোঁয়া, ফজরের নরম গন্ধ।

অর্ক দাঁড়িয়ে থাকে, আলো আর ঘুমের মাঝে। সে বলে, “আমি আরেকটু থাকি।”

চোখে এখনো ঘুমের টলটলে ছায়া, শরীর বলছে— আরেকটু বিশ্রাম চাই।

অর্ক বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। ঘুম ধরা দেয় না,
এক অভিমানী প্রেমিকার মতো— আসবে আসবে করে, তবু দূরে সরে থাকে।

তবু আজ কোনো তাড়া নেই। ঘুম না এলেও, এই স্তব্ধ ভোরটুকু তার নিজের।

ঘুমের অভিমান বেশি দীর্ঘ হলো না। ক্লান্ত চোখে ঘুম নামল— নরম কুয়াশার মতো নিঃশব্দে।

চারপাশে মোলায়েম রোদ্দুর। দেওয়ালের গায়ে পিঁপড়ের সারি উঠে যাচ্ছে। জামের পাতায় জমে থাকা শিশির ধীরে ধীরে ঝরে পড়ছে। ছায়া পড়ে আছে কলাগাছের লম্বা পাতায়। ঝিম ধরা রোদে সেই ছায়াগুলোও যেন ঘুম ঘুম।

দূরে কোথাও বাসন মাজার আওয়াজ, ছেলেমেয়েরা লুকোচুরি খেলছে উঠোনের পাশে। কিন্তু অর্ক সেসবের কিছুই শুনছে না।

সে ঘুমিয়ে আছে— আর ঘুম তাকে ঢেকে রেখেছে অদৃশ্য চাদরে।

ঘড়ির কাঁটা সময় মেপে দিচ্ছে— এখন ঠিক সকাল নয়টা। মুঠোফোনের এলার্মে চমকে উঠে শরীর,
ঘুমের চাদর সরে যায়— বালিশে গড়িয়ে পড়ে এক ক্লান্ত পলকের মতো।

জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়ে রোদের ফালি, পাতার ছায়া যেন জানিয়ে যাচ্ছে— সকাল এসে গেছে, রোদ্দুর এখন উঠোনে পা রেখেছে। জেগে উঠছে ধুলো, পাখা ঝাড়া দিচ্ছে ঘুমন্ত হাওয়া।

অর্ক উঠে বসে। এক পেয়ালা ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের অভাব সে গভীরভাবে টের পায়। মনে হয়, চায়ের কাপটা হাতে না নিলে যেন দিন শুরুই হয় না।

এই চা-বিহীন সকালেও একধরনের নির্লিপ্ততা লেগে থাকে। মনে হয়, সে পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। শরীরটা উঠেছে ঠিকই, কিন্তু মনটা যেন এখনো ঘুমিয়ে আছে।

চোখমুখ ধুতে বেসিনে যায় অর্ক। পানির ছোঁয়ায় শরীরটা একটু চাঙা হয়। তার উশকোখুশকো বাবরি চুলগুলো প্রাণ ফিরে পায়, জেগে ওঠে। ঘুমের ক্লান্তি ধীরে ধীরে কেটে যায়।

ততক্ষণে পেটে খিদের টান পড়েছে। নাঈমদের বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু গেট বন্ধ। তালা ঝুলছে। জামাল সাহেবকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
কিছুক্ষণ পর তিনি এলেন। গেট খুলে ভদ্রতাভরে বললেন,
“বাবাজি, আইয়ুন আমার লগে নাস্তা করুইন। চিত্‌তা পিডা আর আডার রুডি-ডাইল রেডি।”

অর্ক বিনয়ের সাথে বলল,
“শুকরিয়া চাচা। নাঈমদের ওখানে সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। এখনই যেতে হবে।”

একটু থেমে যোগ করল,
রাতটা খুব ভালো কেটেছে। আপনার আতিথেয়তা মনে রাখব।

এই বলে অর্ক বেরিয়ে পড়ছে। জামাল সাহেব তার সাথেই এগিয়ে চলেছেন। তিনি লম্বা আলাপ জুড়ে দিলেন। তাঁর আলাপে অর্কর তেমন মনোযোগ নেই, তবুও শোনার ভান করে মাথা নাড়ছে, যেন গভীর মনোযোগে কথা শুনছে। 

এক সময় মনে পড়ে যায় এক পরিচিত নাম— শামসুল। যিনি একবার কথা শুরু করলে থামেন না। অর্ক মনে মনে বলে ওঠে,
“এইডা দেহি আরেক পেছাল্লা শামসুল।”

জামাল সাহেবের কথা লম্বা হতে থাকে— অর্কর মুখে ক্রমাগত জমা হতে থাকে একটি অব্যক্ত বিরক্তি, যা নাগালের বাইরে নয়, তবুও সে তা লুকায়।

একটা মানুষ কীভাবে এত কথা বলতে পারে— বিরামহীন, বিনা প্রয়োজনে, বিনা বিনোদনে?

ঠিক তখনই শাকিব এসে পড়ে— হাঁপাতে হাঁপাতে, গলায় উত্তেজনার সুরে বলে,
“আংকেল, আমহে এতক্ষণ কই আচলাইন! আইয়ুন, আমহের লাইগা বেহেই অপেক্ষা হরতাছে!”

অর্ক যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেয়— এই নিঃশ্বাস শুধু বায়ুচলাচল নয়, মুক্তির ঘ্রাণ।

সে জামাল সাহেবের গদ্য থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়, যেমন পাঠক সরিয়ে নেয় চোখ কোনো বাজে গদ্যের বই থেকে।

“পেছাল্লা” শামসুলের কথার জালে জড়িয়ে পড়া এ একধরনের শব্দভিত্তিক নির্যাতন, যেখান থেকে উদ্ধারকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় শাকিব।

অর্ক মনে মনে শাকিবকে ধন্যবাদ জানায়—
কোনো ঝাঁঝ নয়, কোনো বাড়তি শব্দ নয়,
শুধু একরকম স্বস্তির মিহি প্রলেপের মতো একটুকরো কৃতজ্ঞতা।


নাঈমদের উঠোনে পৌঁছে অর্ক। ভোরের আলো ফুটতেই নববধূকে দেখতে আসা পাড়া-পড়শি বউঝিদের আনাগোনার রেশ আছে এখনো— কেউ আসছে, কেউ যাচ্ছে— পিঁপড়ের মিছিলের মতো সুশৃঙ্খলভাবে। 

উঠোন জুড়ে তীব্র রোদ্দুর। মাঘের আকাশে চৈত্রের রোদখেলা করছে। উঠোনের কোণ অস্থায়ী বাবুর্চিখানা— রান্নার ঘ্রাণ বাতাসে।  

ঘ্রাণ এসে আছড়ে পড়ে নাকে— পেট ততক্ষণে বিদ্রোহী, ধৈর্য হারিয়েছে। ঠিক তখন, ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন খিচুড়ির থালা হাতে ঘরে ঢোকেন নাঈমের বড়ো বোন মাজেদা— যেন কোনো ঘরোয়া রন্ধনার্তিনী, যার হাতে আছে মানুষের ক্ষুধার উপশম।

চাল-ডাল-ধনেপাতার এক জৈব সম্মোহনে ভেসে ওঠে ছেলেবেলার এক গ্রামীণ সকাল। অনেক দিন পর জিব ছুঁয়েছে খিচুড়ি রসনা। অর্ক চোখ বন্ধ করে থামে— শৈশবের স্মৃতি যেন এক সকাল হয়ে ফিরে এসে তার সামনে দাঁড়ায়। 

সূর্য মধ্য গগনে হাঁটছে। রোদ আর মুরগির ঝোল—দুইই ছড়ায় একধরনের ধোঁয়া—তাপে যেমন, ঘ্রাণেও তেমন।

কিশোরীরা পড়ে আছে সাজসজ্জা নিয়ে। তাকিয়া, কণা, রুনা আর মিম ব্যস্ত সময় পার করছে।   মাজেদার মেয়ে মিম অর্কর নাতনি হয়। সদ্য কৈশোর পেরোনো মিমকে লাল শাড়িতে আজ যেন অন্য রকম লাগছে—চুলের খোঁপায় সাদা ফুল, কানে ছোট দুল, চোখে একটু কাজলের ছোঁয়া। পাখির বাসার মতো দুটো চোখ।
 
অর্ক চেয়ে থেকে একটু রসিকতার ছলে বলল, 
“মাশাআল্লাহ! দুলাইনরে আজ মেলা সুন্দর লাগতাছে!”

মিম লজ্জায় লাল হয়ে যেন বেদানার মতো ফেটে যাচ্ছে। মাথা নিচু করে আঁচলে মুখ ঢেকে হাসিটা লুকানোর চেষ্টা করছে। 

আয়নার সামনে ভিড়। কেউ ঠোঁটে হালকা লিপজেল দেয়, কেউ কাজল টানে, কেউ আবার শুধু দাঁড়িয়ে থাকে—চোখেমুখে নতুন কিছু হয়ে ওঠার আনন্দ।

চুড়ির ঝনঝন, খিলখিল হাসি, আর ঘরের কোণে রাখা মোবাইলের ক্যামেরায় টুপটাপ সেলফি—সব মিলিয়ে যেন এও এক অন্যরকম উৎসব।


দুপুর দুটো। চেয়ার টানা, থালা সাজানো, গ্লাসে পানি পড়ার টুপটাপ শব্দ—সব মিলিয়ে যেন এক অভ্যস্ত কোরিওগ্রাফি, প্রতিটি পদক্ষেপ বহুবার দেখা।

উঠোনজুড়ে মেহমানেরা একে একে এসে বসেছে।
মুখরতা বাড়ছে ধীরে ধীরে—যেন বহুদিন পর দেখা মানুষদের কিছু বলার আছে, আবার না বললেও চলে।

অর্ক চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। কেউ মোবাইলে ছবি তোলে, কেউ থালায় সালাদের গোল টুকরোগুলো এমনভাবে সাজায়, যেন তা খাওয়ার জন্য নয়, সাজানোর জন্যই জন্ম।

খাবার পরিবেশন শুরু হয়। সবজি, মুরগির রোস্ট, গরুর ঝোল, পোলাও— প্রতিটি পদ রঙে, ঘ্রাণে, স্মৃতিতে মেখে আছে অতীতের কোনো দুপুর। এ যেন শুধু খাওয়ার আয়োজন নয়— মানুষ একেকজন নিজের অবস্থান ধরে রাখছে স্মৃতির ভেতর।

অর্কও খেতে বসেছে। থালায় সাজানো নানা পদ। সব যেন একেকটা গল্প— রঙের, স্মৃতির, উৎসবের।
তবু অর্ক সেগুলো ছুঁয়ে দেখে না। 

সে রুই মাছের ঝোল আর ডালে পোলাও মেখে খায়— ধীরে, মনোযোগে, যেন প্রতিটি গ্রাসে অতীতের কোনো দুপুরকে আবার খুঁজে পায় অর্ক। 

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ আর ডাক্তারের কড়া বারণে জীবনের সবচেয়ে সুস্বাদু খাবারগুলোই নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে— শেষ পর্যন্ত খাওয়া হয় না।  

অর্ক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে।
"মনে হয় খাওয়া নয়, দেখাটাই এখনকার অপার এক উৎসব...!"

অর্ক চারপাশে তাকায়— থেমে নেই সময়ের বহতা। ধীরে ধীরে বিবাহোত্তর পঙ্‌ক্তিভোজ উৎসব পরিসমাপ্তির দিকে হাঁটছে। সূর্যটা ধীরে ধীরে পশ্চিমের গন্তব্যে পা ফেলছে। 

উৎসবের চূড়া এখন গোধূলির দিকে ঢলে পড়ছে। বাড়ির উঠোন এখন নিস্তব্ধ— প্যান্ডেলের নিচে পড়ে আছে কেবল নিঃসঙ্গ কিছু চেয়ার আর খাবারের শেষ গন্ধ। 

মেহমানরা একে একে বিদায় নিচ্ছে। সেলাইয়ের সুতো খুলে যাওয়ার মতো— এক এক করে সব বন্ধন আলগা হয়ে যাচ্ছে।

দিন হোক আনন্দের, কিংবা বিষাদের— দিন শেষে গোধূলি নামবেই। সবকিছুরই একটা শেষ আছে— নক্ষত্রও একদিন ঝরে পড়ে, আকাশও একদিন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।

এখন অর্কও ফিরে যাচ্ছে। পেছনে ফেলে যাচ্ছে সে এক রৌদ্রছায়ার দিন— যেখানে নাঈম-সাদিয়ার দাম্পত্য জন্ম নিচ্ছে পলিমাটির কোমল বুকে।

সঙ্গে রেখে যাচ্ছে, এক ফালি কাঁচা আমের মতো তাজা শুভকামনা— পথচলা হোক গঙ্গার ধারে রক্তরাঙা শালুকের মতো— পবিত্র, দীপ্ত, আর মায়ায় মোড়ানো।

প্রতিটি সকাল যেন খুলে দেয় নতুন পাতার মতন, যেখানে লেখা থাকবে একে অন্যকে ভালোবাসার অনুপম ভাষা।

আশীর্বাদ যেন নামে ধানের গন্ধ হয়ে, মায়ের আঁচল হয়ে, আর চোখের কোণে জমে থাকা অব্যক্ত ভালোবাসা হয়ে।

🌼 সমাপ্ত


       একটি বিয়ের অভিযান-০৩                  


একটি বিয়ের অভিযান-০৩


“একটি বিয়ের অভিযান”— এটা শুধু বিয়ের গল্প নয়; আত্মিক এক যাত্রা। এখানে হাসির মিহি রেখা মিশে থাকে হাহাকারে, ক্লান্তির পাশে এসে বসে ক্ষুধার সহজ স্বীকারোক্তি। গল্পের মধ্যমণি অর্ক এখানে কখনো বন্ধু, কখনো পথিক, কখনো নিঃশব্দ দর্শক— যার চোখের ভেতর দিয়ে বয়ে চলে সময়ের অনিবার্য স্রোত। যা ঘটে, যেমন ঘটে— ঠিক তেমন করেই  ‘আশরাফ ইবনে আকন্দ’  লিখেছেন জীবনের নরম পলিমাটির ছোঁয়ায় বাস্তবতার আখ্যান। প্রতিটি দৃশ্য পাঠকের সাথে হাঁটে, আর রেখে যায় প্রেমে ভেজা এক বিষণ্ন অনুভব— ভালো লাগা আর বিষাদের অনুপম মিশেল।


একটি বিয়ের অভিযান

👤 আশরাফ ইবনে আকন্দ 

পর্ব-০৩
পূর্বে প্রকাশের পর>>>
ওশ মাখা বাতাসের ঝাপটা মাঝেমধ্যে মনে করিয়ে দিচ্ছে মাঘের কথা। দারোয়ানের মতো কুয়াশা ছড়িয়ে আছে চারপাশে। ঘাসের গায়ে শিশির ঝরছে মুক্তোর মতো। 

মাঘের রাত হলেও আজ শীতের তেমন দাপট নেই। রাত বাড়ছে। কমছে বিয়ে বাড়ির কোলাহল। 

বিবাহোত্তর পঙ্‌ক্তিভোজ আয়োজনের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। রাত দশটায় হঠাৎ আয়োজনের তোড়জোড়। ছিমছাম ঘরোয়া আয়োজন। বাজারের ফর্দও তৈয়ার।

নাঈমের ভগিনীপতি শহিদুল্লাহ আর চাচাতো ভাই আসিফকে বাজারে পাঠানো হলো। পরে আরেক দফা বাজারে গেছেন নাঈমের বাবা-কাকা। 

রাত অনেক হয়েছে ফর্দের সবকিছু কেনা যায়নি, আগামীকাল সকালে বাকিটা দেখা যাবে। 

সকালের কেনাকাটার দায়িত্বটা পড়ল আসিফ আর শহিদুল্লাহর কাঁধে। শহিদুল্লাহর ওপর ভালোই ধকল গেছে, শ্যালকের বিয়েতে দম ফেলার ফুরসত পায়নি সে।

এদিকে সাদিয়াকে দেখতে তাদের বাড়ি থেকে তার চাচাসহ কয়েক জন এসেছেন। সময় মেলা গড়িয়েছে, জল-খাবার না খেয়েই তাঁরা চলে যাবেন যাবেন করছেন। 

আত্মীয় নতুন হোক কিংবা পুরোনো না খেয়ে চলে যাওয়াটা ভালো দেখায় না।

মফ‍‍স‍‍্‍‍সলে চাইলেই হুট করে কিছু করাও যায় না। তাঁরা না জানিয়েই চলে এসেছেন। চা-নাশতার ব্যবস্থা করতে দেরি হচ্ছে। 

মেহমানদের দু-জন অর্কের পূর্বপরিচিত। অর্ক তাঁদের পিঠ চাপড়ে বলেকয়ে আটকালো। 

রাভিন ছয়টি নুডলসের প্লেট নিয়ে হাজির হয়েছে, কিন্তু লোক আট জন। অর্ক রান্নাঘরে এসে জর্জর গলায় বলল, আরও দুটো প্লেট লাগবে। 

শাকিবকে দিয়ে দুটো প্লেট পাঠানো হয়েছে ঠিকই, এগুলো সেমাইয়ের প্লেট। খাবার পরিবেশনে ভালোই তালগোল লেগে গেল। এ নিয়ে মেহমানদের ঠোঁটে চাপা হাসি। 

এমনকি বাপের বাড়ির মানুষজনের সাথে সাদিয়াও হেসে ফেলল, গালের দু’পাশে কুসুমকুসুম ঢেউ উঠল।

কেউ একজন অর্ককে বলল, আপনি একটু ম্যানেজ করুন। বড়ো মুখ করে সেধেসুধে তাদের আটকালো— এ অব্যবস্থাপনায় অর্কর লজ্জা করছে। তাদের সামনে দাঁড়ানোর মুখ নেই তার। 

নাঈমদের বাড়ির দেউড়ি ঘেঁষে বয়ে গেছে একটি  জলধারা। খাল নয়, আবার নদীও নয়— তবু তার প্রবাহে ছিল নদীর মতো গাম্ভীর্য। 

অর্ক আর মেহমানদের সামনে দাঁড়ায়নি। মুখ ফিরিয়ে নদীর দিকে হেঁটে গেল— যেন হাওয়া খুঁজছে, অথবা নিজেকে লুকোচ্ছে ঢেউয়ের ফিসফাসে।

অর্ক যখন বাড়ির বাইরে কোথাও যায় প্রায়ই একটি মেয়েকে দেখতে পায়। মেয়েটি তার সাথে কথা বলে। তাকে ছাড়া কেউ ওকে দেখতে পায় না। 

ওর নাম এলিতা। অর্ক নদীর পাড়ে একটা গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আনমনে। 

তার দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হচ্ছে। দৃষ্টি ঝাপসা হলে ভাবের বিহ্বলতা তাকে ঘিরে ধরে— অর্কর জগৎটা তখন বদলে যায়। চোখে ভেসে ওঠে এলিতা। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে এমনই মনে হচ্ছে। 

এখন এলিতাকে সে দেখতে পাচ্ছে। চোখের সামনে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে— নদীতে ডিঙি নৌকা ভাসছে। 

নৌকোর গলুইয়ে পা দুলিয়ে বসে আছে এলিতা। তার পায়ের দুলুনির আঘাতে ছলাৎ ছলাৎ অনুকার বেজে উঠেছে নদীর জলে। 

নৌকের অপরপ্রান্তে বসে আছে অর্ক। এলিতা এমনিতেই পুতুলের মতো দেখতে। পরির মতো সুন্দর। অন্য দিনের চেয়ে এলিতাকে আজ সুন্দর লাগছে। সব সাজেই শিশুদের সুন্দর লাগে। 

গভীর ভাবাবেগে আচ্ছন্ন অর্কর ইচ্ছে হলো এলিতার ছবি আঁকবে। ঘড়িতে সময় সাড়ে দশটা, তিমিররাত্রি অথচ অর্কের মনোজগতে তখনও গোধূলিলগ্ন, পশ্চিমে গোলগাল সূর্য ডুবি ডুবি করছে। 

ভাবের জগৎ বড়ো প্রশস্ত। এই জগৎ ‘নিয়ম-কানুন, যুক্তি-তর্ক ও সীমাবদ্ধতা’ সবকিছুর ঊর্ধ্বে— এখানে সব সম্ভব। 

অর্ক তার ঝুলি থেকে রংতুলি বের করে আঁকতে আরম্ভ করল। এলিতার পোশাক-পরিচ্ছদ গোলাপি রঙের। রেশমি সুতার মতো সোনালি চুল। 

দুই কাঁধ হয়ে সামনের দিকে ছড়িয়ে আছে দুটি বিনুনি। বিনুনির লেসের রংও গোলাপি। তলোয়ারের মতো খাড়া নাক। মোনালিসার মতো হাসি। 

ছবি আঁকা শেষ। দারুণ হয়েছে ছবিটা। সবকিছুই ঠিকঠাক এঁকেছে। ঠোঁটের রংটা শুধু করা হয়নি। 

বিয়েতে মিম, সাদিয়া থেকে তাকিয়া, কণা থেকে রুনা, চেনা কিংবা অচেনা সবার ঠোঁটে লাল লিপিস্টক। সবার বসনভূষণ ভিন্ন কিন্তু লিপিস্টিক অভিন্ন। 

কাজেই এলিতার ছবিতেও লাল রঙের লিপিস্টিক চাই। কিন্তু লাল রং খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। লিপিস্টিক ছাড়া ছবিটি অসম্পূর্ণ লাগছে। 

অনন্যোপায় হয়ে ঠোঁটে গোলাপি রঙের আঁচড় টানলো অর্ক। গোলাপি লিপিস্টিকে এলিতাকে বিশ্রী লাগছে। 

নদীর ঢেউ এখনো দুলছে, কিন্তু সেই ডিঙি নৌকা, সেই এলিতা এখন নেই। অর্কর মনোজগতের বিহ্বলতায় ফাটল ধরাল সাদিয়ার চাচা এবং তাঁর সঙ্গীদের মোটরযানের ছুটে চলা শ্রীহীন আওয়াজ। বাস্তবের কংক্রিট আওয়াজ স্বপ্নের কোমল রং মুছে দিলো এক ঝটকায়।

অর্ক ধীরে পা বাড়াল। পেছনে পড়ে রইল নদীর ঢেউ, সেই রংতুলি, আর এলিতার অসম্পূর্ণ ঠোঁট। সে ফিরেছে— নাঈমদের বাড়িতে। 

বাড়ির উঠোন আলো ঝলমলে, কিন্তু তার ভেতরে তখনো কিছুটা আঁধার রয়ে গেছে— খুব খিদে পেয়েছে। কাউকে বলতে পারছে না। 

এগারোটা বেজে গেছে। এমনিতে সে বারোটার পর ঘুমোতে যায়, আজ আগেভাগেই চোখ ছোটো হয়ে আসছে। রাজ্যের ঘুম নেমেছে চোখে। পেটে খিদে নিয়ে ঘুমোতে ইচ্ছে করছে না।

রান্নাঘর থেকে কুয়াশার ধোঁয়ার মতো মুরগির মাংসের ঘ্রাণ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে রাতের ঠান্ডা বাতাসে। পেটে খিদে মুখে লাজ— এর কোনো মানে হয় না। 

অর্ক রান্নাঘরের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে খানিকটা লজ্জা, খানিকটা ক্ষুধা নিয়ে নাঈমের বড়ো বোনের দ্বারস্থ হয়ে বলল, ‘খিদা লাগছে শ্বশ্রূমা, খাওন দেইন।’ 

শ্বশ্রূমা একগাল হেসে বললেন, 'আমহে তো মুরগি খাইন না— আমহের লাইগ্‌গা আলদা কিছু কইরা দেই। ইট্টু সবুর করুইন।'

সবুরটুকুই যেন সবচেয়ে মিষ্টি সময়। একটু পরেই, অনেকটা মমতার মতো ধোঁয়া তুলে হাজির হলো থালা— গরম ভাত, একটুখানি ডিমভাজি, পাতলা মসুর ডাল আর পাশে দুটো ডাসা কাঁচা মরিচ। 

কাঁচা মরিচে যেন চাঁদের আলো লেগে টলমল করছে, আর ডালের গন্ধে মন ভরে যাচ্ছে গাঁয়ের ঘরের স্মৃতিতে। 

বাকি সবাই মুরগির ঝোলে চামচ ডুবাচ্ছে। অবাক করার মতো ব্যাপার— ঘড়ির কাঁটা সাড়ে এগারো ছুঁইছুঁই, অথচ বর-কনে এখনো ফুলশয্যার কক্ষে পা রাখেনি। 

কাল দুপুরের আকস্মিক আয়োজনের ঝামেলা সামলাতে সামলাতে রাত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সবকিছুর দেখভাল নাঈমকেই করতে হচ্ছে। 

ফুলশয্যার ঘর যেন নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে। বালিশের গা ঘেঁষে গাঁদাফুলের গন্ধ জমাট বেঁধে আছে। চাদরের উপরে ছড়িয়ে রাখা গোলাপের পাপড়িরা যেন ক্লান্ত হয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।

বাতির হালকা হলুদ আলোয় ঘরটা স্বপ্নের মতো ঝাপসা— কিন্তু সেই স্বপ্নের চরিত্রদুটো এখনো অনুপস্থিত। 

নিঃশব্দ রাত এক ধরনের অধৈর্য অপেক্ষায় টগবগ করছে— দুজন মানুষের প্রথম একান্ততায় মিশে যাওয়ার মুহূর্তের আগে ঠিক যেমন হয়।
 
রাতে বিয়েবাড়িতে পড়ে থাকা মানেই এক বিনিদ্র, ক্লান্তিমগ্ন রাত কাটানো। ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘর স্পর্শ করেছে পাঁচ মিনিট আগে। অথচ কারো মুখে ঘুমের নামগন্ধ নেই।  

অর্কর চোখে ঘুমের ছায়া ঘনিয়েছে— শরীর জেগে আছে, খুঁজে ফিরছে বিছানার কিনারা— যেখানে পিঠ আর বিছানার সহবাসে জন্ম নেবে স্বস্তিদায়ক রাত্রিযাপনের প্রতিশ্রুতি। 

শেষমেশ শাকিবের দ্বারস্থ হলো অর্ক। সে আশ্বস্ত করল— আরামদায়ক রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করেই রেখেছে। তার পাশের বাড়ির দাদা— ভদ্রলোকের নাম জামাল, যিনি অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা। জীবনে কখনও ঘুস খাননি, গর্ব নিয়ে বলে শাকিব। 

ছেলেরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের উপার্জনে গাঁয়ে গড়ে উঠেছে এক প্রাসাদোপম বাড়ি। আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধায় ঠাসা সে ঘর— এ যেন গ্রাম নয়; মফস্‌সলের বুকে এক চিলতে শহর।

শহিদুল্লাহ, হাবিব, সাদিয়ার ভাই ইমন, খালাত ভাই জোবায়ের আর অর্ক— পাঁচজনকে সঙ্গে নিয়ে শাকিব গেল সেই বাড়িতে।

ভদ্রলোক আন্তরিকতার সাথে তাদের জন্য ব্যবস্থা করলেন লেপ-কম্বল, কাঁথা— প্রয়োজনের চেয়ে যেন একটু বেশিই।

ঘরে ছড়িয়ে আছে নরম আলো, বাতাসে ভেসে বেড়ায় চন্দনের হালকা ঘ্রাণ, জানালার ওপারে নেমে এসেছে নিস্তব্ধ শীতের রাত। এমন রাত উপভোগ না করে উপায় কী!

অর্ক বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। চোখে শিশিরের মতো ঘুম নামল। তখনই হারিয়ে গেল এক অদ্ভুত স্বপ্নে।

ঘরটা যেন আর ঘর নয়, বিশাল এক উন্মুক্ত ময়দান! সে ময়দানে শুয়ে আছে, মাথার নিচে পুরোনো বালিশ।
 
চারপাশে সারি সারি মানুষের ভিড়, কোলাহলমুখর এক চিৎকার। দূর থেকে ভেসে আসছে এক কণ্ঠ— উঠো, ওঠো এখন!

কিন্তু তার ঘুম ভাঙে না। ঘুমটা যেন লতিয়ে জড়িয়ে গেছে তার গায়ে— একধরনের ঘোর, যেন স্বপ্নের ভেতরেই আরও একটি স্বপ্ন।

ঘুমোনোর আগে অর্ক বলে রেখেছিল জামাল সাহেবকে— ফজরের সময় যেন তাকে ডেকে তোলেন।

আধোঘুম আর আধোস্বপ্নের ঘোরে ভেসে যাওয়া এক রাত— নিমিষেই ফুরিয়ে গেল।

মসজিদ থেকে ভেসে এলো ফজরের আজান।
জামাল সাহেব দরজার কাছে এসে ডেকে বললেন,
নামাজের সময় হয়ে গেছে, উঠুন।

অর্কর স্বপ্ন আর ঘুম— দুটোই ভেঙে গেল। নতুন ভোরের আলোর মতোই— নিঃশব্দে।

ধারাবাহিক পর্ব 

বর্ষপূর্তির প্রার্থনা

বিবাহ বার্ষিকী কেবল একটি তারিখ নয়— দাম্পত্যের পথচলার প্রতিটি দিনই এক একটি স্মৃতি, এক একটি নতুন অভিজ্ঞতা। তার ভাঁজে ভাঁজে থাকে হাসি, থাকে অশ্রু, থাকে স্বপ্ন ও সাধনার মিলন। বর্ষপূর্তির এই শুভক্ষণে, দুই হৃদয়ের বন্ধনকে অভিনন্দন!
 “বর্ষপূর্তির প্রার্থনা”  কবিতাটি কেবল প্রতীকী শুভেচ্ছা নয়। এতে মিশেছে জীবনের রূপ ও ব্যঞ্জনা। প্রেম ও মমতায় ভরে উঠুক আগামীর প্রতিটি মুহূর্ত— ‘আশরাফ ইবনে আকন্দ’র পঙ্‌ক্তিময় শুভকামনা! 
—লেখাপত্র। 


বর্ষপূর্তির প্রার্থনা

—আশরাফ ইবনে আকন্দ 

স্নেহাস্পদ,
দাম্পত্যের বর্ষপূর্তির 
এই সোনালি প্রান্তরে,
মনের অলিন্দ থেকে,
শরতের শিশিরে ধোয়া,
শিউলির গন্ধমাখা অভিনন্দন!

মাটির মতো স্থির অগাধ মমতায়,
আকাশের মতো অফুরন্ত আশীর্বাদ—
তোমাদের জন্য!

প্রতিটি প্রভাত রাঙুক প্রেমমুগ্ধতায়,
কাশফুলের দোলার মতো শান্তিতে;
প্রতিটি সন্ধ্যা নামুক
জোছনার মতো— শুভ্র, নির্মল।

প্রীতির ফল্গুধারা ধুয়ে দিক
জীবনের সব বিষাদ;
ঝিরিঝিরি স্নিগ্ধ বাতাসের মতো
সুখানুভব ছড়িয়ে পড়ুক 
হৃদয় নীড়ে।

দাম্পত্য, একটি গোলাপের মতো—
সুরভি হয়ে হাঁটে প্রেম,
কাঁটা হয়ে ফুটে বেদনা।

কণ্টকব্যথা সয়ে যারা অবিচল 
তারা পৌঁছে হিরণ্যময় প্রান্তরে।
তোমাদের প্রণয়মহিরুহ 
মেলুক শাখা স্বর্ণশিখরে—

এই প্রার্থনায় অর্পণ করি
স্নেহাশিসভেজা পঙ্‌ক্তিমালা।
※ 

উৎসর্গ
বিবাহবার্ষিকীর স্বর্ণালি প্রহরে,
স্নেহভাজন মৌরীকে,
এবং যাঁর স্নিগ্ধ কোলে 
মাথা রেখে মৌরী আঁকে স্বপ্ন,
অজস্র রঙিন; সেই ফয়সালকে!

 

চিঠিমি

✉️ চিঠি দিবসে ফিরে দেখা

চিঠি একসময় ছিল হৃদয়ের নিঃশব্দ সঙ্গী—কাগজের গন্ধে, অক্ষরের কাঁপুনিতে ফুটত ভালোবাসা ও অপেক্ষা। আজ সবকিছু জায়গা দিয়েছে স্ক্রিনের বার্তায়, যেখানে আছে ইমোজি, আছে “seen”—কিন্তু নেই সেই আবেগ। চিঠি দিবসে তাই মনে পড়ে  ‘আশরাফ ইবনে আকন্দে’র কবিতা “চিঠিমি”, হারানো চিঠির অভিমানী স্মৃতিচিহ্ন।



চিঠিমি

— আশরাফ ইবনে আকন্দ

চিঠি লিখি না আজকাল
তোমার ঠিকানাও এখন—
মৃত এক প্রেমিকার মতো,
জন্মদিন ভুলে বসে আছে নিজেই।

কাগজ-কলমের সহবাসে
অনুভূতি জন্মায় না আগের মতো।
আঙুল ঝুঁকে পড়েছে প্রযুক্তির প্রেমে—
তারা চুমু খায় কী-বোর্ডের ঠোঁটে। 
কাগজের আবেদন মরে গেছে,
ঝরে পড়া পাতার মতো— অভিমানে।

এখন লিখি চিঠিমি—
আলোঝলমলে এক স্ক্রিনে।
পিছনে আলো, সামনে শূন্যতা।
এখানে প্রেম আসে না—
আসে ইমোজির মুখোশ,
আসে 'seen' এর ছায়া।
উত্তর আসে না।

অসংখ্য চিঠিমি পড়ে থাকে— 
উত্তরহীন, অভিমানী,
মুছে ফেলার অপেক্ষায়।

চিঠিমি উন্মুক্ত— 
অথচ কেউ পড়ে না।
বার্তাগুলো নিষ্প্রাণ— 
তবুও আমি বেঁচে থাকি এতে।

#চিঠিমি #চিঠি দিবস #০১০৯২০২৫

একটি বিয়ের অভিযান-০২

“একটি বিয়ের অভিযান”— এটা শুধু বিয়ের গল্প নয়; আত্মিক এক যাত্রা। এখানে হাসির মিহি রেখা মিশে থাকে হাহাকারে, ক্লান্তির পাশে এসে বসে ক্ষুধার সহজ স্বীকারোক্তি। গল্পের মধ্যমণি অর্ক এখানে কখনো বন্ধু, কখনো পথিক, কখনো নিঃশব্দ দর্শক— যার চোখের ভেতর দিয়ে বয়ে চলে সময়ের অনিবার্য স্রোত। যা ঘটে, যেমন ঘটে— ঠিক তেমন করেই  “আশরাফ ইবনে আকন্দ”  লিখেছেন জীবনের নরম পলিমাটির ছোঁয়ায় বাস্তবতার আখ্যান। প্রতিটি দৃশ্য পাঠকের সাথে হাঁটে, আর রেখে যায় প্রেমে ভেজা এক বিষণ্ন অনুভব— ভালো লাগা আর বিষাদের অনুপম মিশেল।


একটি বিয়ের অভিযান

👤 আশরাফ ইবনে আকন্দ 

পর্ব-০২
পূর্বে প্রকাশের পর>>>
অর্ক জামাতে মাগরিবের নামাজ আদায় করতে পারেনি। বিয়েবাড়িতে পৌঁছে নিকটবর্তী মসজিদে একাকী নামাজ পড়ছে।

নামাজ শেষ করে দেখল নাঈমের ছোটো ভাই শাকিব তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটার মুখ ভার, চোখে পানি টলমল করছে, যেন কিছু বলতে চায়— আবার কেমন যেন লজ্জাও পাচ্ছে।

তার বড়ো ভাইয়ের বিয়ে, অথচ বরযাত্রায় গাড়িতে চড়ার সুযোগ হয়নি তার। অভিমানের কয়েক টুকরো বরফ জমে আছে বুকের ভেতর। কেউ হয়তো খেয়ালই করেনি।

চাইলেই সে বিয়েবাড়ির কোলাহলে একটু গোলমাল বাঁধাতে পারত। বিয়ে বাড়িতে তো এর চেয়েও তুচ্ছ কারণে তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়! কিন্তু সে কিছু বলেনি।

অভিমান নিয়ে চুপচাপ গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মায়ের সামনে। মা তখন চোখ তুলে ছেলের মুখ দেখে বললেন, “থাক বাবা, দুঃখ করিস না। সবার কথা ভেবে একটু মানিয়ে নে। সবসময় সবকিছু নিজের মতো হয় না রে।”

মায়ের কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না, শুধু ছিল অনুশোচনার মতো মমতা। সেই কথায় সে কিছুটা শান্ত হলেও, অভিমানটা বুকের ভিতরে পুষে রেখে নিঃশব্দেই বেরিয়ে পড়েছিল কনের বাড়ির দিকে— পায়ে হেঁটে, খেতের আল ধরে।

সন্ধ্যা নামে নামে করছে। হালকা কুয়াশা চারপাশে, বাতাসে শীতের একটা কাঁপুনির মতো নিস্তব্ধতা। একবার কুয়াশায় ঢাকা মাঠের দিকে তাকায়, যেন মায়ের মুখটা এখনো এই শীতল বাতাসের মধ্যেই ভেসে বেড়ায়। 

একটু পর নিঃশ্বাস ছেড়ে আবার হাঁটতে শুরু করে—মাথা নিচু, অভিমানী মনটা নিয়ে। কোনো গান নেই, কোনো সঙ্গ নেই— শুধু মাঘের শূন্যতা, বুকের গভীরে পাথরের মতো জমে থাকা এক নিঃশব্দ দহন।


ধীরে ধীরে মুখ খুলল শাকিব। গলার স্বর ভারী, চোখের কোণে জলের কাঁপুনি। বলল তার না বলা কষ্টের কথা।

গভীর মনোযোগে শাকিবের কথা শুনেছে অর্ক।
অর্ক কাঁধে হাত রাখল শাকিবের। বুলিয়ে দিলো সান্ত্বনার কোমল পরশ। 

বলল, শুনতে খারাপ লাগছে। ব্যাপারটা সত্যিই বেদনাবিধুর। মন খারাপ করো না। এমন হয় অনেক সময়। বড়োরা বুঝতে পারে না। কষ্টটা ছোটোদের বেশি লাগে।

শাকিবের ব্যথা এখন অনেকটা হালকা হয়েছে।
সান্ত্বনার মোলায়েম পরশ পেয়ে অর্কর কাছে কিছু স্বপ্ন জমা রেখেছে শাকিব।

স্বপ্নগুলো সুদূরপ্রসারী। সে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—
তার বিয়ের বরযাত্রায় কেউ হেঁটে যাবে না।
অনেকগুলো মাইক্রো থাকবে— একটি, দুটি, তিনটি নয়; দশটি। প্রয়োজনে আরও!

স্বপ্ন দেখে মানুষ বাঁচে। এই স্বপ্নই মানুষের জীবন এবং জীবনের অবলম্বন। এই ছেলেটা একদিন বড়ো হবে। তার স্বপ্নগুলোও হয়তো একদিন ডানা মেলবে।
※ 

বিয়ে মানেই প্রীতিসম্মিলন। প্রায় প্রতিটি প্রীতিসম্মিলনেই দেখা যায়, শালীনতাবর্জিত পোশাকে গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা আর হৃৎযন্ত্র কাঁপানো বাদ্যযন্ত্রের উৎপীড়ন। 

এই বিয়েতে এসবের লেশমাত্র নেই— না এ-বাড়ি, না ও-বাড়ি। অস্ফুট এক সুখানুভব দোলা দিয়ে গেল অর্কর হৃদয়ে। 

অবশ্য বরের হাত ধুয়ে-মুছে কিশোরীদের চাঁদাবাজি-সুলভ উৎপাত থেকে রেহাই মেলেনি।

হাত ধোয়া-মোছা শেষ হতে না হতেই যথারীতি চাঁদা কুড়াতে ঝাঁক বেঁধে ঝরাপাতার মতো এগিয়ে এলো একদল কিশোরী। মুখে দুষ্টু হাসি, চোখে স্পষ্ট পরিকল্পনার দীপ্তি। রেডিওর মতো চঞ্চল।

ওদের দাবি-দাওয়া মেটানোর গুরুদায়িত্ব পড়ল নাঈমের বন্ধু শহিদুলের ওপর। দায়িত্ব পালনে সে দারুণ বিচক্ষণতা দেখাল। ধূর্ত-চতুর না হলে এমন পরিস্থিতি সামলানো দায়।

ভেলকিবাজি ছাড়া এসব চলেও না। কিশোরীরা শহিদুলের ভেলকি ধরতে পারেনি। পারলে কি আর এভাবে ঠকে?

শহিদুল প্রথমে পাঁচশ টাকা দিয়েছে। পরে আরও দুটো পঞ্চাশ টাকার নোট দিলো, ওদের মন ভরল না।

অর্ক পাশ থেকে ঠাট্টার ছলে বলল, “দেইনছা দশ-বিশ টেহা বাড়ায়া।”

শহিদুল তখনই ভেলকি দেখাল। টাকা ভর্তি হাতটা পেছনে নিয়ে পাঁচশ টাকার নোট সরিয়ে ফেলল। তারপর দুটো পঞ্চাশ টাকা নোটের সাথে কুড়ি খানেক বিশ টাকার নোট মিশিয়ে ওদের দলনেত্রীর হাতে গুঁজে দিলো। কিশোরীরা ভাবল, অনেক টাকা। ওরা খুশিমুখে চলে গেল। 

একটুখানি রঙধনুর মতো খুশি ছায়া ফেলেছিল ওদের মনে— খানিক পরেই বিষণ্ণ মেঘ ছেয়ে গেল মনের আকাশে। টাকা গনে দেখে সাকুল্যে পাঁচশো— দলনেত্রী কিশোরীটি ফিরল মুখ ভার করে।  কার্যত তাদের ফিরে আসা স্বার্থক হলো না।

অর্ক অনেকটা সান্ত্বনার ভঙ্গিতে বলল, যা হবার হয়ে গেছে, নিজে ঠকলে বাপের কাছেও বলতে নেই! নিজেদের আহম্মকি জাহির করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

কোনো জবাব নেই, মুখটা যেন বেদনার রোদে শুকিয়ে যাওয়া বকুলফুল— নিঃশব্দ, বিবর্ণ, আর গন্ধহীন। চোখ দুটো যেন অন্ধকারে ঢাকা নিঃশেষ এক বসন্ত, যেখানে অপেক্ষা আছে, কিন্তু আশার আলো নেই।

একটু দূরে গিয়ে থেমেছিল ওরা, দলনেত্রী কিশোরীটি পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল একবার—চোখে ছিল সেই অভিমান, যেটা নদী শুকিয়ে গেলে রেখে যায় তীরের ফাটলে।

তার কণ্ঠস্বরে কোনো উষ্মা ছিল না, ছিল না রাগ— শুধু একটুখানি শীতল ঘোষণা, যেন নেমে আসা কুয়াশার মতো: 

আপনারা ভাবছেন আমরা হেরে গেছি? বরযাত্রী তো এখনো খায়নি। সময়ই জানাবে কার হাত ফসকে গেল পাত্র— আর কারা তুলে নিলো পুরস্কার।

ওরা আবার হাঁটা দিলো— ধীরে, নিশ্চুপ। তাদের ছায়াগুলো লম্বা হয়ে যাচ্ছিল পশ্চিমের দিকে, ঠিক যেমন বিকেলের আলো নিঃশব্দে বলে দেয়, রাত আসছে।

অর্ক দাঁড়িয়ে রইল সেই ছায়ার দিকে তাকিয়ে। তার মনে হলো, এরা ঝরাপাতা নয়— এরা ঝড়ের আগে নিস্তব্ধতা, বলে গেল ঝড় আসছে।
※ 


নাঈমের ভগিনীপতি শহিদুল্লাহ, বন্ধু শহিদুল, ভাইবেরাদার— রাভিন, আকাশ, শাকিব, হাবিব আর ঠিক বাঁ-পাশে অর্ক— বরের চারপাশে গোল হয়ে বসেছে। 

এ যেন বর নয়, কোনো বিজয়ী সেনানায়ক, যার থালায় সাজানো হয়েছে রাজসিক ভোজ: মাঝখানে গর্জে ওঠা আস্ত মোরগ, চারদিকে পোলাওয়ের সুবাসিত সাদা মেঘ, আর প্রান্তজুড়ে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে নানা জাতের বড়া—আলু, ডাল, বুট, বেগুন, আর মুগের।

বরের থালায় খাওয়ার মধ্যে থাকে একরকম আভিজাত্য, এক উমদা আনন্দ। অর্কর তেমন আনন্দ হচ্ছে না। সে মোরগের গোশত খায় না। অন্যরা সানন্দে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে, আর তার নজর পড়ে আছে বড়ার দিকে। বড়া খাওয়া শেষ, অথচ অন্যদের সবে শুরু। 

এমন সময় ঢেলে দেওয়া হলো গোরুর গোশত—পোলাও তলিয়ে গেল গোশতের ঝোলে। গোরুর গোশত খেতেও মানা অর্কর। উদরপূর্ণ করতে হলে, জঠরজ্বালা মেটাতে চাইলে তাকে গোরুর গোশতই গ্রহণ করতে হবে।

কী আর করা, নাওয়াখাওয়া ভুলে দর্শক হয়ে থাকার কোনো মানে নেই— ‘জিব পাক গোমাংসের রসনা, বারণ-বাধা আজ মানি না।’ শাসন-বারণ সরিয়ে রেখে অর্কর জিব পেল গোমাংসের স্বাদ। রসনাবিলাসের সুন্দর পরিসমাপ্তি ঘটল। 
※ 

কাজি সাহেব এলেন। নাঈমের প্রবাসী চাচার পক্ষে তাঁর বড়ো ছেলের উকালতিতে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিয়ের কাজ সম্পন্ন হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরতি যাত্রা শুরু হবে। 

এখন বরকে মিষ্টিমুখ করানো হচ্ছে। এ এক অপার উৎসব! বরকে মিষ্টিমুখ করানোর এমন দৃশ্য অর্ক জীবনে আর দেখিনি। 

মনে হচ্ছিল, নাঈম আসলে কোনো বর নয়, বরং এক চলন্ত মিষ্টির দোকান, যার মুখটা যেন জীবন্ত মিষ্টির প্রদর্শনী— কীভাবে মিষ্টিমুখ করতে হয় দেখো, দেখে শেখো!

শাশুড়ি শুরু করলেন— হাতে রসগোল্লা, মুখে আধা-কাঁদা আধা-হাসা আশীর্বাদ। তারপর একে একে হাজির হলেন দাদি শাশুড়ি, নানি শাশুড়ি, এমনকি দূরসম্পর্কের কেউ কেউ— নাঈমের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন রসমালাই, রসগোল্লা। 

নাঈম বেচারা পড়েছে মধুর যন্ত্রণায়, গাল দুটো রসগোল্লার মতো ফুলে উঠেছে। গলায় মিষ্টি আটকে যাচ্ছে। 

ছেলেটা পানি পানি করছে। সেদিকে কারো মনোযোগ নেই— যেন রসগোল্লার স্রোতে ভাসিয়েই  তাকে পরপারে পাঠিয়ে দেবে!

নাঈমের মামি ব্যাপারটা লক্ষ করলেন। কণ্ঠে আঞ্চলিক টান, কথায় রসিকতা— বললেন, ‘ছেডারে পানি দেইন্নারে, গলাত দো আইটকা গেছে— মিষ্টি খাওয়াইতে খাওয়াইতে কি জামাই মাইরাল বাইন!’

একজন ছুটে এসে ওর সামনে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল— হাসপাতালের এক নার্সের মতো করে। নাঈম ঢকঢক করে এক গ্রাসে পানি খেয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেল আর ফিসফিস করে বলল, এটা বিয়ে না— এটা মিষ্টিময় মৃত্যুযাত্রা!

জামাইর প্রাণ ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই যেন হাওয়া পালটে গেল চারপাশে। মিষ্টির রস শুকাতে না শুকাতে, এক নিঃশব্দ রোদন ছড়িয়ে পড়ল পরিবেশে।

বেজে উঠল বিদায়ের করুণ সুর— হৃদয় ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা এক বেদনাবিধুর বীণার টান। 

কনের নিঃশ্বাস থেকে যেন সুরের লহরি বেজে উঠেছে— ‘চোখ মুছে মুখ তোলো, স্নেহের বাঁধন খোলো, আমি যাচ্ছি বাবা, আমি যাচ্ছি!’ 

বাতাস যেন থমকে দাঁড়াল, সময়ের চাকা যেন থেমে রইল কিছুক্ষণ। কনের বাবা কাঁপা হাতে মেয়ের হাত তুলে দিলেন বরের হাতে— এক চিরায়ত প্রথার গভীরতম মুহূর্ত। 

আর তখনই, কান্নায় ভেঙে পড়ল কনে— মা-বাবা, দাদি এবং এই বাড়ির প্রতিটি হৃদয়। 

নববধূর সাজ-সজ্জা যেমন সুন্দর, তাদের কান্নাও হয় তেমন সুন্দর, মনোহর ও মনােমুগ্ধকর। এমন মনােমুগ্ধকর ও চিত্তাকর্ষী কান্নার দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। 

অশ্রুতে মেকাপ ক্ষয়ে যাওয়ার ভয়ে মাঝের কিছুকাল নববধূরা কাঁদতো না। এখন অবশ্য দিন পালটেছে, মেকাপেও এসেছে ‘ওয়াটারপ্রুফ ভার্সন’। হয়তো তাই এ-যুগের মেয়েরা, নববধূ-কনেরা মন খুলে কাঁদতে পারে কিংবা কান্নার ঢং করতে পারে।

মনোমুগ্ধকর, মনোহারী কান্নার দেখা মিলত শৈশবে।মাথায় ঘোমটা, চোখে জল, ঠোঁটে সংযম— বাপের বাড়ির উঠোন থেকে উঠত কান্নার ঢেউ, যার প্রতিধ্বনি থামত শ্বশুরবাড়ির দোরগোড়ায় এসে।

কাঁদতে কাঁদতে কাকিমণিদের বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি আসা, আর ফুফুমণিদের বিদায়ের দৃশ্য— অর্কের স্মৃতিতে এখনো টাটকা। 

তার স্মৃতির দর্পণে এখনো ঘুরে বেড়ায় সেই কান্নার ঘ্রাণ; উঠোনের বাতাসে ভেসে থাকা নরম ধুলোয় মোড়া, তবু আজও স্পষ্ট, কাঁপন জাগানো— জীবন্ত!

যাহোক, আজ আবার এক কান্নার সাক্ষী হলো অর্ক— সুন্দর ও চিত্তাকর্ষী, যদিও কাকিমণি ও ফুফুমণিদের মতো এত নির্মল শুভ্র নয়।
 
কনের নাম সাদিয়া। সাদিয়ার বাবার বাড়ির দেউড়ি থেকে মাইক্রো ছেড়ে গেছে। মাইক্রো যত এগোচ্ছে গতি তত বাড়ছে আর সাদিয়ার কান্নার ধ্বনি তত পিছিয়ে পড়ছে। 

মাইক্রোর খোলা জানালা হয়ে শোঁ শোঁ করে ঢুকছে বাতাস। বাতাসের সাথে মিলিয়ে যাচ্ছে সাদিয়ার কান্না। 

আমি যাচ্ছি বাবা, আমি যাচ্ছি’ এই গান এখন থেমে গেছে। অর্কর চোখ দুটো হঠাৎ অশ্রুতে ভরে উঠল। 
সাদিয়ার বাবার মুখটা বারবার ভেসে উঠছে— এখন কী করছেন তিনি? মেয়েটা চলে গেছে। 

নিশ্চয়ই চেয়ারটায় বসে নিঃশব্দে কাঁদছেন কিংবা কাঁদতে কাঁদতে হয়তো জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন।

মেয়ের হাতটা যখন শেষবারের মতো বাবার হাত ছেড়ে যায়, তখন প্রতিটি বাবার হৃৎপিণ্ড যেন থেমে যায়— শূন্যতায় । 

মুখের ভাষা হারায়, কিন্তু চোখের পেছনে জমে থাকে সমুদ্রের মতো কান্না। সেই কান্না হয়তো সবার চোখে পড়ে না। 

আজ অর্ক ঠিক সাদিয়ার বাবার সেই কান্না, সেই শূন্যতা নিজের ভেতরে অনুভব করছে— যে অনুভব ভাষায় ধরা দেয় না, শুধু চোখের জলে অনুবাদ হয়।

বিবাহ একটি ফুলের মতো— যার গায়ে মধু আছে, আবার কাঁটাও— যেমন আনন্দের তেমন বিষাদের।বিবাহযোগ্য কন্যাকে যখন সুপাত্রে পাত্রস্থ করা হয়, তখন বাড়ির আঙিনায় যেন বিষণ্ণ বিকেল নামে।

বিষাদে ছেয়ে গেছে অর্কর হৃদয়। বুকে দুরুদুরু কম্পন। সময় একদিন তাকেও যে দাঁড় করাবে ওই বিষণ্ণ বিকালের সামনে— এই ভেবে হৃৎস্পন্দন থেমে যাচ্ছে বারবার। 

তখন কেমন হবে তার হৃদয়ের অনুভূতি? মেয়ের মায়াভরা মুখটা চাইলেই দেখা হবে না। খাটের কোণে দাঁড়িয়ে মুগ্ধতা ছড়ানো সুবাসিত কোমল কণ্ঠে— ‘আব্বু ওঠো, নামাজের সময় হয়ে এলো’ বলে ফজরে আর রোজ রোজ ডেকে তুলবে না। 

ঘরের উঠোনে শিশির পড়বে, কিন্তু কেউ বলবে না, ‘আব্বু, চা দেবো?’ আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে একদিন সে বুঝবে, মেয়েরা চলে গেলে ঘর কীভাবে ঘর থাকে না। ফাঁকা ফাঁকা লাগে— শূন্যতার হাহাকার! 

ভাবনার ভিতরে বিষণ্ণতা জমে উঠল, ধানের শিষে জমা শিশিরের মতো। এ বিবশতা চলল কিছুক্ষণ, তারপর অনেকক্ষণ! 

অর্ক ভাবের বিহ্বলতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে চৈতন্যে ফেরে। টের পায় মাইক্রো পুরোপুরি সুগন্ধে ভরে গেছে। মনে হয় মাইক্রোটা একটা সুগন্ধির দোকান।  

বর-কনের পারফিউমের সুঘ্রাণ পিছনের সিট থেকে বাতাসের সাথে মিশে একাকার হয়ে অর্কর নাকে লাগছে। 

ঘ্রাণটা সুন্দর, কিন্তু অর্কর ভালো লাগছে না। এত বেশি ঘ্রাণ সে সইতে পারে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে। গাড়ি থেকে লাফিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। 

কিন্তু গাড়ির সবাই দারুণ আনন্দে আছে, হাসছে, কথা বলছে। তাই দম বন্ধ হয়ে আসার মধ্যেও অর্ক মুখে একরকম আনন্দের মুখোশ পরে বসে থাকে। 

অন্যের আনন্দে বাগড়া দেওয়ার কোনো অধিকার তার নেই। অর্ক পারফিউমের সুঘ্রাণ ভুলে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালাল। কিন্তু...! 

একটা সময় পার হয়ে গেল, পারফিউমের ঘ্রাণ খানিকটা মিইয়ে এলো। অর্ক চোখ মেলে দেখল, সামনের রাস্তার আলো-ছায়ায় জেগে আছে কুয়াশা, গাছপালা আর অচেনা গাঁয়ের নির্জনতা।
※ 


হোসেনপুর বাজারে ঢুকতেই নাঈমের মুঠোফোন বেজে উঠল— ওপারে তার মামি। কণ্ঠে অতিব্যস্ততার ছায়া, “ফুলসজ্জার পথ্য কিনে এনো।” 

নাঈম কিছু বলার আগেই দায়িত্ব নেমে এলো অর্কের কাঁধে, যেন বৃষ্টির ধাক্কায় খড়ের চাল ভেঙে পড়ল নিরীহ পাটখড়ির ঘাড়ে।

অর্ক কিছু বলল না। এই শহর তার অচেনা, এই পথ তার অপরিচিত, তবুও চাইলেই তো বলে ফেলা যায় না—“আমি পারব না।” 

এটা বড়ো অন্যায্য, অসংগত হতো; মাইক্রোতে নাঈম ছাড়া অর্কই যে একমাত্র পুরুষ— দণ্ডিত পুরুষ! 

অগত্যা নামল সে। শহরের বাতাসে ভেসে বেড়ায় খেজুরের রসের পুরোনো গন্ধ, কিন্তু ফলের দোকান চোখে পড়ে না। মানুষকে জিজ্ঞেস করে সে, ভুলভাল উত্তর আসে—“এই তো সামনে।” 

সামনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শুধু ধূলি আর ধোঁয়া, ফল কোথায়? আবার মোড় ঘুরে প্রশ্ন করে— জবাব আসে একটাই— “আরেকটু সামনে।” 

যেন পথ নয়, হিজলবনে ঢুকে পড়েছে। যার শেষ নেই, নেই কোনো নির্দেশনাও।

তবুও সে হেঁটে চলে— তিনশো সেকেন্ড হাঁটার পর অবশেষে একটা ফলের দোকান চোখে পড়ে। দোকানের ছাউনিটা টিনের, মাথার উপর পাপড়ির মতো ছড়িয়ে আছে। 

সামনে কলা, কমলা, আঙুর আপেল, বেদানা— সব ফল যেন ক্লান্ত হয়ে বসে আছে, কেউ কিনবে না জেনে হাল ছেড়ে দিয়েছে।

অর্ক দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছে। দোকানদার তাকে পাত্তা দিলো বলে মনে হলো না। দুইশো সেকেন্ড পর শেষমেশ দোকানদার তার দিকে চোখ তুলল। 

কলা, বেদানার দিকে তার ঝোঁক নেই— আপেল, আঙুর আর কমলা কিনলো— অল্প অল্প! 

দোকানি হেসে বলল, আপনার মতো মানুষই আমাদের জীবন কঠিন করে তোলে, জানেন? 

ফলের গন্ধ, দোকানির কণ্ঠ, কুয়াশার চাদরে মোড়ানো রাতের আঁধার— সব মিলিয়ে তার মনে হলো, এটা তো আর ‘রিয়েলিটি শো’ নয় যে, চুপ থাকলে নম্বর কাটা যাবে। অর্ক চুপ রইল— শিশিরের  মতো।

পথ্য কেনা শেষ হলে সে ধীরে ধীরে ফিরে আসে মাইক্রোর দিকে। হেঁটে আসার শব্দে কাঁপে ধুলোমাখা রাস্তাটুকু। দূর থেকে দেখে, মাইক্রোর সবাই তাকিয়ে আছে তার পথের দিকে। 

তার ফেরার জন্যই একটি যাত্রা থেমে আছে— সবার চোখে একধরনের অপেক্ষা, হয়তো কারো আত্ম-জিজ্ঞাসা— এত দেরি হচ্ছে কেন? 

কাছে এসে হালকা হেসে ওঠে। হাসিটা আনন্দের নয়; হতাশার— নিজের দিকে যেন নিজেই একটু বিরক্ত হয়। 

ভাবে— এই সামান্য দেরিতেই যদি সবাই এমন করে তাকায়, তবে দীর্ঘ কোনো অপেক্ষায় তারা কি একসময় ফেরার আশাটুকুও ছেড়ে দেবে?

অর্ক মাইক্রোতে চড়ে বসে। ভাবনার ভিতরই ছিল সে, যখন পেছনের সিট থেকে হঠাৎ উঠে এলো এক স্বতঃস্ফূর্ত আওয়াজ— সেই প্রগাঢ় বিষণ্ণতার উপর যেন কেউ রঙতুলির হালকা টান মারল।

পিছনের সিট থেকে নাঈমের বড়ো বোন মাজেদার কণ্ঠে ফুটে উঠল এক শিশুসুলভ চাওয়া— “ঠান্ডা খাওয়ান আংকেল।” 

গাড়ি থামল; কাচে জমে থাকা কুয়াশার মতোই হঠাৎ নেমে এলো এক কোমল বিরতি। সাদা প্লাস্টিকের বোতলে বন্দি ঠান্ডা জল, জার্নির ক্লান্ত গায়ে এঁকে দিল এক ছোট্ট মেঘের চুমু।

শহরের বুক চিরে শনশনিয়ে গাড়ি ছুটছে, শহর পেড়িয়ে গাঁয়ের পথে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর শীতের হালকা কুয়াশা জমছে জানালার কাচে। আলো-আঁধারির খেলা গাড়ির জানালা ছুঁয়ে যাচ্ছে— একটার পর একটা দৃশ্য যেন হেঁটে যায় পাশে। 

শহরের আলো পেছনে রেখে এখন তারা ফিরছে সেই গ্রামের দিকে— যেখানে হৃদয়ভরা উচ্ছ্বাস নিয়ে প্রিয়জনেরা বরণডালা সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নববধূর আগমনের প্রতীক্ষায়। 

এই প্রতীক্ষার শেষে কেউ একজন ঘোমটা সরিয়ে প্রথমবার দেখে উচ্ছলিত কণ্ঠে বলে উঠবে, “আল্লা! বউটা দেখতে কী সুন্দর!”


ঘড়ির কাঁটা এখন সাড়ে আটটার ঘরে। নাঈমদের ঘরের পেছনের দেউড়িতে গাড়ি থামল। 

আকাশে রাত্রির প্রথম তারা জ্বলছে, আর পৃথিবীর এক কোণে নাঈম আর সাদিয়া একসাথে হাঁটছে জীবনের পথে, এক নতুন সূর্যোদয়ের দিকে।

একটি সমাপ্ত যাত্রার ধুলোর মাঝে, জেগে উঠছে প্রেমের শুদ্ধ প্রার্থনা। আলোর ভেতর, তারা হারিয়ে ফেলছে একক সত্তা, আর তৈরি করছে এক 'আমরা'—যার নাম ভালোবাসা।


ধারাবাহিক পর্ব

স্বপ্নপতন

এটি একটি প্রতীকী ও রাজনৈতিক বাস্তবতানির্ভর কবিতা। এখানে কবি স্বাধীনতা, বিপ্লব, গণআন্দোলন, স্বপ্নভঙ্গ ও শাসনব্যবস্থার প্রতারণা চিত্রায়ন করেছেন অত্যন্ত শৈল্পিক ভাষায়। 

    স্বপ্নপতন

— আশরাফ ইবনে আকন্দ

শিক্ষার্থীর মুঠোয় পতাকা,
শ্রমিকের বুকে দীপ্ত স্বপ্ন,
কৃষকের চোখে আগুন,
নারীর আঁচলে বিপ্লবী পঙ্‌ক্তি,
জনতার কণ্ঠে বিদ্রোহী কবিতা।

ঘোড়ার লাগাম ছুটে রাজপথে, 
দাম্ভিকতার ভারে ডুবে 
রূপকাঠের নৌকাখানি 
রক্তস্রোতের ঢেউয়ে। 
মসজিদের মিনারে ধ্বনিত হয়
নবযুগের আজান।

স্বৈরাচার যায়—
রুদ্ধ ইতিহাস চিরে জাগে নতুন রবি।
অর্ধশতাব্দীর ক্লান্তি বুকে নিয়ে
জাতি নিশ্বাস ফেলে—
এবার বুঝি বাঁচা গেল!

কিন্তু—
পেছনের দুয়ার খুলে
নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে মুখোশধারী;
জন্ম নেয় আরেক ত্রাস,
নতুন মুখ, পুরোনো চাবুক।
নমরুদ ঝরে পড়ে ইতিহাসের পাতায়,
ফের জেগে ওঠে ফেরাউনের ঔদ্ধত্য।

যাদের কাঁধে ভরসার ভার—
তারা নয় সালাউদ্দিন।
রাষ্ট্রের ছায়ায় দাঁড়িয়ে
ঘুমন্ত মানুষের বুক চিরে
লেখে নিশ্বাসহীন সকাল।

আমরা যারা স্বপ্নচারী—
ভেবেছিলাম, দেশটা হবে গোলাপের মতো,
গন্ধে ভরে যাবে পুড়ে যাওয়া ধূসর ঘর।
বাদশা আলমগীর বৃক্ষ হয়ে জন্মাবে 
ধু-ধু প্রান্তরে!

না—
এই মাটিতে গজানো 
বৃক্ষের শিকড়ে বিষ,
ডালপালায় ঝরে বিষবাষ্প,
আর ফলে মরণরস।

তবু লিখি—
কারণ, কবিতারও আছে এক স্বদেশ,
যেখানে প্রতিটি পতনের পরে
একদিন ফিরে আসবে বসন্ত,
মুছে দেবে কালান্তরের অন্তর্দহন—
পঙ্‌ক্তিমালা হয়ে উঠবে 
স্বপ্নপতনের নীরব প্রতিরোধ! 
※ 
❍ ০৫ আগস্ট ২০২৫ খ্রি.


উৎসর্গ
জুলাই-বিপ্লব ’২৪-এর সে অগ্নিময় বিকেলকে— যেখানে পিপাসার মত জেগে উঠেছিল স্বপ্ন, আর গলায় গলায় মিলেছিল স্লোগানের ঢেউ। 
যাদের কাঁধে আগুনের চাদর, বুকভরা বৃষ্টির মতো রক্ত, তবু তারা হেঁটেছে, নির্বাক, অনাহারে, মুক্তির পতাকা হাতে।
তোমাদের জন্য— ওহে নামহীন বিদ্রোহী, যাদের পদচিহ্নে জন্ম নেয় প্রতিরোধের মানচিত্র।
এই কবিতা রেখে গেলাম তোমাদের অনামা কবরের পাশে— যেখানে ঘাস নয়, জন্মায় বিদ্রোহ, অগ্নিসন্তান!



দগ্ধ আঁচলের সাঁকো

দগ্ধ আঁচলের সাঁকো 

—আশরাফ ইবনে আকন্দ 
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ—
স্বপ্ন হাতে আসে শিশুরা,
নতুন পোশাকে, বইয়ের সুবাসে,
আলোর পানে হাঁটে তারা—
যেখানে সূর্য জাগে প্রতিশ্রুতির মতো।

হঠাৎ নিভে যায় সে সূর্য,
কার্বনের ধোঁয়ায় ঢাকা দিগন্ত, 
নীল আকাশ কেঁদে ওঠে—
দুপুরে ফেরার কথা ছিল যাদের,
তারা ফিরেছে সন্ধ্যায়— কাফনের কোলে।

যাদের হাসির শব্দে মুখর ছিল প্রাঙ্গণ,
তাদের নাম লেখা হলো কালো হরফে—
ইতিহাসের হিম পাতায়।
যেখানে ছিল প্রাণের উচ্ছ্বাস,
সেখানেই নিঃশব্দ দাহ।

আকাশ থেকে নামে
বজ্রের ছদ্মবেশে যুদ্ধবিমান,
যার প্রশিক্ষণ মৃত্যুর পাঠ!
হে লৌহ-বীথির অন্ধ পাখি—
কর্মচঞ্চল নগরের জনারণ্যে, 
বিদ্যালয়ের উঠোনে আগুনের স্তম্ভ তুলে
তুমি কী শেখাতে এলে?

অগ্নিতে ভস্ম— এই রাষ্ট্রের বিবেক।
স্কুল ড্রেসে আগুন— খাতায় পুড়ে যাচ্ছে বর্ণমালা,
কলমের ডগায় ছাই হয়ে পড়ে ইতিহাস,
স্কুলব্যাগে পোড়া মাংসের গন্ধ।

কেউ হেঁটে ফিরল দগ্ধ শরীরে,
আর যারা ফেরেনি—
তাদের চোখে এখন মৃত নীলাকাশ,
মা-বাবা ছুটে চলে হাহাকার বুকে—
হাসপাতালের করিডোরে ছড়িয়ে পড়ে কান্না।

আকাশ চেয়ে থাকে স্তব্ধ হয়ে—
তার চেয়ে মৌন শহর,
আর এরচেয়েও গভীর নিস্তব্ধতা
একটি মায়ের মৃত কোলে।

মাহরীন ম্যাডাম—
আপনি শিক্ষক নন কেবল,
আপনি এক উম্মুল মা'আরিফা,
এক আগুন-ঢাকা মমতা।

নিজেকে নিভিয়ে জ্বলালেন প্রদীপ,
পোড়া ওড়নায় ছায়া দিলেন শিশুদের,
মমতার আঁচল হয়ে উঠল সাঁকো—
শিশুরা নির্ভয়ে পার হলো আগুনের নদী ।
এই শহরে কেউ কথা রাখে না—
আপনি রাখলেন।

আপনার নাম লেখা রবে—
না, নিছক ফলকে নয়,
ভবিষ্যতের হৃদয়ে,
নির্মল শ্রদ্ধায়।

আর আমরা?
হাঁটি বারংবার একই অন্ধ গলিতে,
যেখানে মৃত্যু রুটিনের মতো—
ফিরে আসে কোনো সিলেবাস হয়ে!

❍ ২৫ জুলাই ২০২৫ খ্রি.
※ 

উৎসর্গ
২১ জুলাই ২০২৫ খ্রি., সোমবার রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় দগ্ধ হওয়া সেই সব নিষ্পাপ শিশুদের স্মৃতিতে— 
যাদের জীবনের পাঠ বইয়ের পৃষ্ঠা ছুঁয়ে শেষ হবার কথা ছিল, 
যাদের ফেরার কথা ছিল দুপুরবেলায়, 
কিন্তু তারা ফিরেছে আগুনের সন্ধ্যায়, 
একটি কাফনের নীরবতায়।
এবং—
মাহরীন ম্যাডামকে,
যিনি শিক্ষকতা নয়,
মাতৃত্বের এক অগ্নিস্নাত ছায়া হয়ে
নিজেকে নিঃশেষ করে
রক্ষা করেছেন অসংখ্য প্রাণ।

একটি বিয়ের অভিযান-০১


“একটি বিয়ের অভিযান”— এটা শুধু বিয়ের গল্প নয়; আত্মিক এক যাত্রা। এখানে হাসির মিহি রেখা মিশে থাকে হাহাকারে, ক্লান্তির পাশে এসে বসে ক্ষুধার সহজ স্বীকারোক্তি। গল্পের মধ্যমণি অর্ক এখানে কখনো বন্ধু, কখনো পথিক, কখনো নিঃশব্দ দর্শক— যার চোখের ভেতর দিয়ে বয়ে চলে সময়ের অনিবার্য স্রোত। যা ঘটে, যেমন ঘটে, ঠিক তেমন করে—
আশরাফ ইবনে আকন্দ   লিখেছেন জীবনের নরম পলিমাটির ছোঁয়ায় বাস্তবতার আখ্যান। প্রতিটি দৃশ্য পাঠকের সাথে হাঁটে, আর রেখে যায় প্রেমে ভেজা এক বিষণ্ন অনুভব— ভালো লাগা আর বিষাদের অনুপম মিশেল।


একটি বিয়ের অভিযান

👤 আশরাফ ইবনে আকন্দ 

পর্ব-০১
নাঈম আর অর্কের বন্ধুত্ব দেখে মনে হয় তারা যেন পুরোনো দিনের সহপাঠী— অথচ ওদের মধ্যে খালু-ভায়রাপুত্র সম্পর্ক।  

নাঈম ঢাকায় চাকরি করে। সে বসবাস করে এক নগরের ভেতরে, যে নগর সভ্যতার ক্লান্ত প্রতিচ্ছবি, শব্দ ও ধোঁয়ার অরণ্য।

তবু তার হৃদয় পড়ে থাকে গাঁয়ে, মাটির গন্ধে— যেখানে কাদায় জন্ম নেয় ধান, আর বাতাসে মিশে থাকে গাভীর নিশ্বাস। মানুষ যেমন শিকড়ের প্রতি নিষ্ঠুর হয়, তেমনই আবার ফেরে তার কাছেই।

প্রতি মাসেই ছুটির ছায়া নামে তার জীবনে— ছয় কিংবা সাত দিনের ছোট্ট মুক্তিপত্র। বাকি দিনগুলো যেন ঘড়ির কাটায় বাঁধা বন্দিজীবন, কিন্তু এই ক-দিন— এগুলোই তার প্রকৃত নিশ্বাস, যেখানে সে নিজের মতো করে বাঁচে।

ট্রেন ছুটে চলে— লোহার চাকা গড়িয়ে আনে মাটির গন্ধে। স্টেশন পেরোয় একের পর এক। তার বুকের ভেতর যেন হুঁইসেলের শব্দ হয়— পুরোনো স্টেশনের পরিচিত ডাক— গফরগাঁও প্লাটফর্মে থামে ট্রেন। 

ট্রেন থেকে নেমে ক্লান্ত শরীরে, শান্ত পায়ে হেঁটে জামতলা মোড়ে পৌঁছায় সে— অর্কর সঙ্গে দেখা করতে। দুজন বসে পুরোনো চায়ের দোকানে— কাঠের বেঞ্চ, ছেঁড়া টিনের ছাউনি, ধোঁয়ার ভেতর একরাশ নরম আলো।

খোশগল্পে মেতে ওঠে তারা। স্মৃতির হাঁট বসে— পুরোনো দিনগুলো এসে পাশে বসে চুপচাপ। আনন্দে দু-জনেই হেসে ওঠে, মাথা নাড়ে, চুমুক দেয় ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে— যেন জীবনের সব জবাবই গুলে আছে সেসব চায়ের গন্ধে।

কে জানতো—
খালু আর ভায়রাপুত্রের বন্ধন এমন নির্ভার হবে!
সম্পর্কের ভেদ আছে, বয়সের ব্যবধানও আছে—
তবু আড্ডার টেবিলে তারা যেন সময়হীন দুই বন্ধু।
দুজনের হাসিতে কোনো শিষ্টতা নেই, চায়ের ধোঁয়ার মতোই সহজ, স্বচ্ছ, আর হৃদয়ের মতোই উষ্ণ। মাটির মতো— নরম, আপন, আর গভীর। 


নাঈমের বিয়ের কথা চলছে। বিয়ের আলোচনা এখন ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে উঠোন ছুঁয়েছে— পাত্রী দেখাদেখি শেষ, এখন শুধু পাকা কথার আকাশে একফালি চাঁদের প্রতীক্ষা।

অর্ক যেন আপনমনে গুনগুন করে ওঠে,
ফিসফিসিয়ে বলে— “কবে আসবে সে দিন,
যেদিন ফুলের মতো খুলে যাবে ওর জীবনের নতুন পাতা?”

প্রতীক্ষা বেশি দীর্ঘ হলো না। রবিবার, শীতের রাত। নিঃশব্দে নামে কুয়াশা— ঘড়ির কাঁটা এগারোটার কিনারে এসে থেমে আছে যেন। ঠিক সেই সময় অর্কর ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে নাঈমের নাম, তবে কণ্ঠটা নারীর— উচ্ছ্বসিত, প্রাণবন্ত— তিনি নাঈমের মামি।

শীতের রাতে মানুষ আগেভাগে ঘুমিয়ে পড়ে। শীত-গ্রীষ্ম ঋতু যা-ই থাক— বারোটার আগে অর্কর চোখে ঘুম নামে না। 

মামি বললেন, মঙ্গলবার নাঈমের বিয়ে— জিয়াফত খাওয়ার মতো একটা লোক পাওয়া গেল যে কি না এখনো জেগে আছে। 

অর্ক তখন আয়েশ করে ভাত খাচ্ছে। ভাতের মিহি ঘ্রাণে চোখ আধবোজা করে বলে উঠল— “বেয়া রাইতে অইলে ভালা অয়, রাইতে দু-চাইট্টা ভাত বেশি খাইতারি!”

মামি হেসে উঠে বললেন, “আল্লাহ আমহের দোয়া শোনছে, বেয়া ভাই রাতেই ফালাইছি।” 

মামির হাসির ঝংকারে উঠোন যেন ঝলমল করে ওঠে। অর্কর হাসিও গড়িয়ে পড়ে থালার পাশ দিয়ে।

মামি অর্ককে বললেন, আপনি নাঈমের প্রধান মেহমান। এমনভাবে ঘোষণা এলো, যেন রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ। অর্ক একগাল হেসে বলল, আলহামদুলিল্লাহ!

মামির কান থেকে মুঠোফোন নিজের হাতে নিয়ে অর্ককে নাঈম বলল, আপনি কিন্তু বরযাত্রী হিসেবে যাচ্ছেন, আমরা মাগরিবের পর কনের বাড়ি পৌঁছব।

অর্কর অভিপ্রায় ছিল জামতলা মোড় থেকে কনেদের বাড়ি তেঁতুলিয়া গিয়েই ছুটি নেবে। নাঈম ছুটি দেয়নি। নাঈম বলল— তাদের বাড়ি হয়ে আসতে হবে।
 

সোমবারের বিকেল। আকাশে তখন রোদ আর ক্লান্তি মিশে গেছে। জামতলা মোড়ের ধুলোমাখা বাঁকে দেখা হলো নাঈম আর অর্কের।

একটু পরেই বিয়ের কেনাকাটার অভিযান। নাঈম যেন গম্ভীর যোদ্ধা— তার বাহিনীতে খালা, মামি, ভাই-বোন, আর সবশেষে সেই অনিবার্য উপস্থিতি—কনে নিজে। 

কনের জন্য কেনা হয়েছে লালচে-সোনালি পাড়ের কাতান শাড়ি, রেশমের গায়ে সূক্ষ্ম জরির কাজ। যেন শাড়ি না, একটুকরো লাল আগুন! 

সঙ্গে ম্যাচিং চুড়ি, লাল টিপ, মিনারেল বেস মেকআপ, আর চোখে লাগানোর জন্য জেল কাজল— বলাই বাহুল্য, সবই ব্র্যান্ডেড। পারফিউমও এসেছে বিদেশি, গোলাপি কাচের বোতলে, গন্ধে হালকা মিষ্টি-মায়া মেশানো।

বরের জন্য শেরওয়ানি দেখলো, পছন্দ হলো, কিন্তু ফিটিং নয়— এক ধরনের বাঙালি ট্র্যাজেডি, যা পোশাকেও লেগে থাকে। অন্য অনেকগুলো দেখানো হলো, চয়েস হলো না।

দোকানি সবার জন্য রং চা ফরমায়েশ করেছেন। মহিলারা বোরকা পরিহিতা, সবাই চা খেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন বলে মনে হচ্ছে না। কেউ একজন অর্ককে চা সাধলে, নাঈম জানাল সে রোজা, চা খাবে না।

তখন “মলভি” গোছের এক লোক শেরওয়ানির খোঁজ করলেন। ওই শেরওয়ানি তার সাথে দারুণ সুইটেড হলো—যাকে বলে খাপে খাপ মিলে যাওয়া।

এমন মিল সাধারণত বাঙালির জীবনেই ঘটে—আপনি যেটা চাইছেন, সেটা পায় অন্য কেউ।

বরের জন্য কেনা হলো পিচ রঙের হালকা কাজ করা পাঞ্জাবি, সঙ্গে কাঁচা খয়েরি রঙের কটি— পাজামা, জুতা-মোজা, সব। আর সবচেয়ে যত্ন করে তোলা হয়েছে ছোট্ট একটি পারফিউম বোতল— ডেভিডফ কুল ওয়াটার। এমন ঘ্রাণ, যেটা গায়ে মাখলেই একধরনের আত্মবিশ্বাস মাখা যায়।
※ 

সূর্যটা ক্রমশ অস্তাচলের দিকে হেলে পড়ছে। পাখিরা নীড়ে ফিরছে। ইফতারের সময় হয়ে এলো, অর্ককে এখন ফিরতে হবে। 

সবাইকে ‘বেলাল প্লাজা’য় রেখে সে বেরিয়ে পড়ল। মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসছে আজানের ধ্বনি। সে ‘অলটাইম জেলিবন’ দিয়ে ইফতার করল।

সালাত আদায় করল। ধীরে ধীরে পশ্চিম দিগন্তের লাল আভা আঁধারে মিলিয়ে যাচ্ছে। পেটে খিদের টান পড়েছে। সে পরোটার দোকানে গেল। পরোটা-ডাল-ভাজি দিয়ে নাশতা করছে, তখন নাঈমের কথা মনে পড়ল।

অর্ক তাকে কল করে পরোটার দোকানে নাশতা খেতে আমন্ত্রণ জানাল।
নাঈম বলল, সবাইকে রেখে আমার একা আসা ঠিক হবে না।

নাঈমের কথা শেষ না হতেই তার মামির কণ্ঠ শুনতে পেল অর্ক। মামি বললেন, শুধু জামাই না, কেনাকাটা শেষ হলে সবাই আসছি।

অর্কও কম যায় না, রসিকতা করে বলল, আলহামদুলিল্লাহ, সবাই আসুন—অর্ধেকটা রসগোল্লা আর একটি করে পরোটা বরাদ্দ রাখছি।

নাঈমের মামি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন, আলহামদুলিল্লাহ! তাদের আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ‘একটা রুডিই কেলা কারে দে!’ হাসির কল্লোলে তখন গুঞ্জরিত এপাশ-ওপাশ।

অর্ক কল রাখল। তার খাওয়া শেষ হলো। সে ভাবল, এভাবে সবাইকে কখনো একসাথে পাবে না—এখনই মোক্ষম সময়।

সে ভাবছে কীভাবে আপ্যায়ন করা যায়। ধনাঢ্য ব্যক্তি হলে ইজিচেয়ারে বসে কফির মগে চুমুক দিয়ে দোল খেতে খেতে ভাবতো। সে ভাবছে গরিবানা মতো— রতনের চা দোকানে বেঞ্চিতে বসে, চায়ের পেয়ালায় ঠোঁট ছুঁইয়ে।

অনেক কিছু খেলে যাচ্ছে মস্তিষ্কে, নানারকম চিন্তা-ভাবনা ভিড় করছে মগজে, কোনোটাই মনঃপূত হচ্ছে না। ভদ্রলোকের সাধ বিপুল, কিন্তু সাধ্য অপ্রতুল।

শেষমেশ মাথায় দারুণ এক আইডিয়া এলো—‘অলটাইম জেলিবন’। ছোটো খিদের বড়ো ও সাশ্রয়ী সমাধান।

দশটি ‘অলটাইম জেলিবন’ আর এক লিটার বোতলজাত পানি শপিংব্যাগে নিয়ে সে হাঁটছে ‘বেলাল প্লাজা’র গন্তব্যে।

দুইশো সেকেন্ড হাঁটল, গিয়ে দেখল, দেড়শো মিনিট ধরে কেনাকাটা চলছে। আর কতক্ষণ চলবে কেউ জানে না। চলছে দৌড়ঝাঁপ, পছন্দ-অপছন্দ, দামাদামি আর এক দোকান থেকে আরেক দোকান। 
     
নাঈমের মুখটা কিশমিশের মতো শুকিয়ে গেছে। সময় যত গড়াচ্ছে তাকে মনমরা ও বিমর্ষ দেখাচ্ছে। সময়ের সাথে তার ধৈর্য আর পকেট—দুটোই ফুরিয়ে আসছে। 

অর্ক এসে নাঈমের পাশে দাঁড়ায়। ধৈর্যহীন গলায় নাঈম বলল, আমি কি জানতাম, বিয়ে করতে এত কিছু লাগে?

অর্ক হেসে বলল, ‘বিয়ে একটাই করবেন তো? না কি দু-একটা প্ল্যান আরও আছে?’ নাঈম কিছু বলে না, শুধু হাসে।
নাঈমের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে কনে, সে নিঃশব্দে মিটিমিটি হাসছে— তার চোখ দুটো যেন আকাশ থেকে নামা মিটিমিটি তারা।

নাঈমের বিষণ্ণ মুখটাও এখন হাসিতে ভরা।
অর্কের কথার ফুলকি, খুনশুটি, হালকা ঠাট্টা— চারপাশে ছড়িয়ে দেয় হাসির বাতাস।

সবার চোখে খুশির ঝিলিক, ঠোঁটে হাসির রেখা। এটাই তো জীবন— ছোট ছোট মুহূর্তের আনন্দ। হঠাৎ হাসি, হঠাৎ ভালো লাগা।
※ 

জ নাঈমের বিয়ে। উত্তেজনার শেষ নেই। কিন্তু এসব কিছুর মধ্যে অর্ক আছে অদ্ভুত এক বিচিত্র অবস্থায়। সে এখন মাইক্রোবাসে বসে আছে। যেই মাইক্রোতে চেপে বরযাত্রী যাবে, সেই মাইক্রোতেই সে নাঈমদের বাড়ি যাচ্ছে।

নাঈম ফোনে বলেছিল, সাড়ে তিনটার মধ্যে মাইক্রো জামতলা মোড় চলে আসবে। অর্ক ঠিক সময়ে চলে এসেছিল। কিন্তু মাইক্রো এল সাড়ে তিনটা পেরিয়ে দশ মিনিট পর। অর্ক উঠেই জানালার পাশে বসে। বাইরে তাকিয়ে মাঝে মাঝে নিজের পকেট হাতড়ায়। কী যেন খুঁজছে।

আসলে অর্কের মাথাটা একটু গুবলেট হয়ে আছে। ভেবেছিল যাত্রার আগে ‘ট্রাভেলইট’ খেয়ে নেবে। তাড়াহুড়ায় তা আর হয়ে উঠেনি। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে মনের ভুলে মানিব্যাগ পর্যন্ত বাড়িতে ফেলে এসেছে। 
ব্যাকআপ হিসেবে বিকাশ থেকে কিছু টাকা তুলেছে— ভুল এখানেও করেছে। ব্যাংক থেকে টাকা তোলার সময় যদি একটু হিসাব করে তুলত, ক্যাশ আউটের খরচটা বাঁচানো যেত। এমন ভুল সে আগেও করেছে। ইদানীং একটু বেশিই করছে।

মানিব্যাগ ছাড়া সে পকেটে ‘মানি’ রাখতে পারে না। কাগজে আঠা লাগিয়ে খাম সাদৃশ্য মানিব্যাগ বানাল। দুটো আলাদা মানিব্যাগ পকেটে গুঁজে রাখল। একটা নিজের খরচার, অন্যটা নাঈমের।

জামতলা মোড় থেকে মাইক্রো ছেড়েছে কয়েক মিনিট হলো। অর্কর আশঙ্কা করেছিল তার প্রেসার না বেড়ে যায়। জার্নি হোক মাইক্রো কিংবা বাস তার প্রেসার বাড়বে, মাথা ঘুরবে, রাজ্যের অস্বস্তি এসে ভিড়বে মস্তিষ্ক জুড়ে— এতদিন তা-ই হয়ে আসছিল। আজ এর ব্যত্যয় কিছু ঘটল। 

বিশ্বরোড মোড় ঘুরতেই মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। কিছুক্ষণ অস্বস্তি বোধ করছিল বটে, প্রেসার আছে ঠিকঠাক, মাথাটাও ধরেনি। হয়তো আজকের দিনটা বিশেষ।

ড্রাইভার তার সাথে গল্প করতে চাচ্ছেন। অর্ক নাঈমের কে হয়, বাড়ি কোথায় এইসব। ভদ্রলোক যেচে নিজের পরিচয় দিলেন।
বললেন, তিনি নাঈমের মামাতো বোন তাকিয়ার মায়ের বান্ধবীর হাজব্যান্ড! ভেরি ইন্টারেস্টিং! 

অর্ক ভ্রু কুঁচকে তাকাল। অদ্ভুত রকম এক আত্মীয়তা— কিন্তু এই ধরনের আত্মীয়তা এই দেশের লোকদের খুব আপন।

 ফরগাঁও থেকে দেওয়ানগঞ্জ, তারপর চরহাজীপুর— বিয়েবাড়ির দিকে ছুটে চলেছে মাইক্রো। আঁকাবাঁকা গায়ের মেঠো পথ বেয়ে। যেখানে এপাশে ঘরবাড়ি ওপাশে পুকুর। 

পুকুর জলে এপাশে ঢেউ খেলে লাল শাপলা ওপাশে কচুরি ফুল— যেন দুই বোন, কেউ সেজেছে লাল শাড়ি পরে, কেউবা হালকা বেগুনি।

পথের ধারে খুঁটির সাথে বাঁধা কালো গোরুটার হাম্বা ডাকের আওয়াজেও শত মধুরিমা। গোরুর হাম্বা ডাকে সাড়া দেওয়া বাছুরের তিড়িংবিড়িং দৌড়ানোর দৃশ্যটি চোখের সামনে এখনো স্থির হয়ে আছে— যেন কোনো শিশু খুশিতে লাফাচ্ছে। 

শাঁইশাঁই বাতাসে দলঘাসের নৃত্য। গাছের ডালে যেন ঘুঙুর বাঁধা— পাতার নূপুর ঝুমঝুম করে বাজছে। বাতাসে কাঁপছে মরিচের চারা, ঝালরের মতো ঝুলছে মাচার লাউডগা। 

প্রতিটি দৃশ্য যেন একেকটা কবিতা হয়ে অর্কের চোখে ধরা দিচ্ছে, আবার সরে যাচ্ছে— ভালো লাগার ঢেউ উঠছে, কিন্তু কিছুই ধরে রাখা যাচ্ছে না।

মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করছে একটু থামতে, ভালো লাগার দৃশ্যগুলো নয়ন ভরে দেখতে। দৃষ্টি আটকে যায় মাঠে, ফসলের খেতে। পড়ন্ত বিকেল মৃদু হাওয়ায় ধানের চারা দারুণ ছন্দে নৃত্যে দুলছে— আনন্দের ঢেউ খেলে যাচ্ছে অর্কের হৃদয়ে। 

বাতাসের ছন্দে ক্ষণে ক্ষণে নেচে উঠছে অর্কের বাবরি চুল। মনে হচ্ছে অর্ক মিশে গেছে এই প্রকৃতির সঙ্গে— ঠিক যেমন নদীর জল মিশে যায় সাগরে। 

ড্রাইভার সিগ্রেট ধরালেন। অর্ক সিগ্রেট আর কয়েলের ধোঁয়া একদম সহ্য করতে পারে না। 
যারা কয়েল আর সিগ্রেট ধরায় তাদের মানুষ ভাবতে ঘেন্না লাগে। 

কিন্তু মাইক্রোর স্টেয়ারিংয়ে বসে পাইলট সিগ্রেট টানা ড্রাইভারকে ঘেন্না হচ্ছে না। 

ধূমপায়ী কিছু মানুষ আছে যারা অন্যের দিকে ধোঁয়া ছাড়ে, এই ড্রাইভার এমন না। ধোঁয়া নিজের দিকে রাখছেন, অন্যদের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন না। ধূমপায়ীদের মধ্যে এরকম ভদ্রলোক বিরল।

প্রকৃতি দেখতে দেখতে পথ ফুরিয়ে গেল। আধঘণ্টায় হেঁটে যাওয়ার পথ মাইক্রতে লেগেছে ষাট মিনিট। 

কিন্তু এই মিনিটগুলো সময় নয়, ছিল অনুভব। পেছনে পড়ে রইল না কিছুই, বরং বুকজুড়ে জমল হাজার বছরের এক সফরের স্মৃতি।

বাড়িতে পৌঁছতে পৌঁছতে আসরের আজান পড়ে গেছে। আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে গুঞ্জরিত হলো পুরো এলাকা। 

নাঈমদের দেউড়িতে গাড়ি থামল, অর্ক নামলো। 
দশ বছর আগে এখানে একবার এসেছিল ওই দৃশ্য তার চোখে এখনো লেগে আছে। বাড়িতে ঢুকতেই গোলমলে ঠেকেছে অর্কর। 

সবকিছুই তার অচেনা লাগছে। অর্ক তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, মনে মনে ভাবে—সব কিছুই বদলে গেছে। শুধু বদলায়নি একটা জিনিস— সম্পর্কের মায়া, আন্তরিকতার ছায়া। 

অর্ক পৌঁছতেই বরযাত্রার তোড়জোড় শুরু। অর্ক বলল, আমি নামাজটা পড়ে নিই! ইলাস্টিকের চাটাই বিছিয়ে নামাজ পড়ে নিলো।

নামাজ শেষ করে চাটাই সরাল অর্ক। নামাজে সে কী চেয়েছিল আল্লাহর কাছে, তা হয়তো কেউ জানবে না। কিন্তু তার মন হালকা, চোখে শান্তির রেখা।

নামাজ শেষে উঠে এসে দেখল, বরকে মিষ্টিমুখ করানো হচ্ছে। বরের মা, চাচি, দাদি একে একে মুখে মিষ্টি তুলে দিচ্ছেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন নিলো মিষ্টির স্বাদ— অর্কও পেল এক টুকরো। 

মিষ্টির টুকরোটা পাশের এক জনকে এগিয়ে দিয়ে রসিকতা করে অর্ক বলল, নেন অর্ধেকটা খান।

লোকটা মাথা নাড়ল, না না, আপনি খান।
অর্ক হেসে বলল, বড়ো মিস করলেন, মশাই। আমি একবার সাধি, দুইবার সাধি না।

কথাটা যেন হালকা বাতাসের মতো ছুঁয়ে গেল সবাইকে— একসাথে হেসে উঠল চারপাশ। আঁধার রাতে মেঘ সরিয়ে যেমন হেসে ওঠে একফালি চাঁদ।

এখন যাত্রা শুরু হবে। হুড়মুড় করে বরযাত্রী গাড়িতে চড়ে বসল। অর্কর সম্বন্ধীর মেয়ে তাকিয়ার সাথে দারুণ খুনশি তার। তাকে ‘সতাই’ শাশুড়ি বলে ডাকে। 

অর্ক ‘সতাই’ শাশুড়ির উদ্দেশ্যে বলল, জায়গা না হলে শ্বশ্রূমাকে ছাদে উঠিয়ে দিই। 

শ্বশ্রূমা মন ভালো করা ভেংচি কাটলেন। শিশুরা ভেংচি কাটলে মিষ্টি লাগে। শিশুদের সব কিছু সুন্দর—তাদের হাসি-কান্না, এমনকি ভেংচিও। 

যাত্রা শুরু হলো। সামনে বসেছে অর্ক, তার ডানপাশে তাকিয়া, অর্কের কোলে বসেছে নাঈমের চাচাতো ভাই ইব্রাহিম। পরের সারিতে নাঈম ও বোনেরা। 

খুরশিদ মহল ব্রিজে এসে একটা লম্বা বিরতি। এটাকে ফটোসেশানের বিরতিও বলা যেতে পারে— অন্তত পাঁচশটা ছবি তোলা হয়েছে সেখানে।

অর্ককেও দাঁড় করা হয়েছে ফটোসেশানে। কয়েকটি ছবি উঠানো হলো বটে, বেচারার সব ছবির কেন্দ্রবিন্দু যেন তার স্থূল ভুঁড়ি। 

ফেসবুকে প্রোফাইল পিক দেওয়ার জন্য একটা ভালো ছবির আকাঙ্ক্ষা তার বহু দিনের। আজকের ছবিগুলো তার পছন্দসই হলো না। পেটুক গোছের ছবি তো আর প্রোফাইল পিক করা যায় না। কাজেই তার আকাঙ্ক্ষা ও প্রতীক্ষা আরও দীর্ঘ হলো। 

লাল সূর্যটা থালার মতো গোল হয়ে ক্রমশ পশ্চিমে  মিলিয়ে যাচ্ছে। মাথার ওপর পাখি উড়ছে, দলে দলে নীড়ে ফিরছে। থেমেছে পাখিদের কলরব। চারপাশে নিস্তব্ধতা— ক্যামেরার ‘ঠাস ঠাস’ শব্দ থামছে না। 

ফটোসেশান শেষে আবার যাত্রা শুরু হলো। রাস্তার দুই পাশে ধানক্ষেত, গাছগাছালি, মাঝে মাঝে স্কুলঘর, চায়ের দোকান, ছোট ছোট বাজার—সব পেরিয়ে বরযাত্রীর গাড়ি থামল কনের বাড়ির গেটের সামনে।

ঘরের ভেতর আলোর ঝলকানি, অবশ্য প্যান্ডেল নেই। একদল কিশোর-কিশোরী দরজার মুখে দাঁড়িয়ে, হাতে পানির গ্লাস, শরবত আর ফুলের পাপড়ি। 

 ধারাবাহিক পর্ব

অভিমানের প্রহর

—আশরাফ ইবনে আকন্দ 

আকাশটাও আজ থমকে গেছে—
যেন কারো অভিমান জমে আছে
মেঘের গায়ে।
বুকের ভেতর যে ঘড়ির কাঁটা প্রতিদিন সময় মাপত, 
আজ সেটাও থেমে আছে,
অথচ প্রহর থামে না।

প্রতিটা প্রহর একেকটা পাপের হিসাব নিয়ে আসে—
এক মুঠো ভালোবাসার বদলে আমি কেবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা সাজিয়ে রাখি সেলফে—
অপরাধবোধে মোড়ানো চকচকে বোতল।

মানুষ কতবার নিজেকে মাফ করে, বলো?
কতবার আড়াল হয় নীরব চার দেওয়ালের কোণে?
আমি আয়নার দিকে তাকিয়ে শুধুই ভাবি—
এই আমি, এই মুখ—
এটা কি আসলেই আমি?
নাকি সমাজের গড়া মুখোশধারী যন্ত্র,
যে কেবল নিয়ম মানে, অথচ হৃদয়ের কথা কেউ বোঝে না?

সবই মেনে নিয়েছি আজ—
ক্লান্তির চাদরে মুড়ে ফেলেছি রাত,
তবুও ঘুম আসে না।
শুধু কল্পনায় দেখি—
একটি নদী বয়ে যাচ্ছে—তার দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার দুটি চাওয়া:
একটাতে প্রেয়সী, আরেকটাতে আমি।
মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অভিমান—
যার গভীরতা মাপতে গিয়ে বহুদিন হলো,
আমি মানুষ থেকে মাটি হয়ে গেছি।

#অভিমানের প্রহর/প্রেয়সী//
 ❍ ২০২৫০৫০৮

রৌদ্র ভেজা প্রেম

সমসাময়িক বাংলাভাষায় দাম্পত্য প্রেম নিয়ে গল্প খুব বেশি দেখা যায় না যেখানে অনুভবের গভীরতা, শরীরী ঘনিষ্ঠতা আর আত্মিক বোঝাপড়ার এক সূক্ষ্ম মেলবন্ধন ঘটে। 
 ‘রৌদ্র ভেজা প্রেম’ তেমনই একটি ব্যতিক্রমী গল্প— যেখানে বৈবাহিক সম্পর্ক কেবল দায়িত্বে নয়, প্রেমেও দীপ্ত। রান্নাঘরের ঘামে, ট্রেনের জানালার হাওয়ায়, গ্রামের উঠোনে শুয়ে থাকা দুজন মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে নিঃশব্দে। গল্পটি লিখেছেন: ‘আশরাফ ইবনে আকন্দ’



রৌদ্র ভেজা প্রেম 

— আশরাফ ইবনে আকন্দ


  • আগুনে পোড়া প্রণয়

জ্যৈষ্ঠ মাসের মধ্যভাগ। রোদের তীব্রতায় জানালার কাঁচ ফুটে যেতে চায়। বাতাস যেন চুল্লির শ্বাস—মুখের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

রান্নাঘরের জানালায় একটা পাতাও নড়ছে না। ইরা দাঁড়িয়ে আছে চুলার পাশে, আঁচলের প্রান্ত দিয়ে ঘামের স্রোত মোছে কপাল থেকে। ভাতের হাঁড়িতে পানি ফুটছে, সবজির কড়াইয়ে তেল টগবগ করে উঠছে।
চুলার আগুন মাঝে মাঝে উঁকি দেয় তার মুখের দিকে।

সাজু তখনো ঘরে, এসির নিচে আধো ঘুমে। দুপুরের খাওয়ার আগেই আজ আবার অনলাইনে মিটিং। ইরার হাতের রান্না ছাড়া তার চলেই না। সেদিনও বলেছিল,
— “তোমার হাতের ডাল না হলে আমার মুখেই রোচে না।”

তিন বছর হলো তাদের বিয়ে হয়েছে। সাজু বলে,
— “তুমি না একদম স্বপ্নের মতো। আমার প্রেয়সী।”

ইরা হেসে চুপ করে থাকে। কখনো মাথা নিচু করে বলে,
— “প্রেয়সীরা কি এমন গরমে আগুনের পাশে দাঁড়ায়?”

কথাগুলো কখনো মুখ ফুটে বলেনি ইরা। বলবে কী করে?
বাড়ির কাজ, অফিস, রান্না, সবকিছু মিলে প্রেয়সীর জীবন যেন একটা নীরব আগুন।

আজ দুপুরে হঠাৎই সাজুর ঘুম ভেঙে যায়। পানি খেতে গিয়ে রান্নাঘরের দিকে চোখ পড়ে তার।
ইরার মুখ রোদে জ্বলছে। শরীরটা কেমন কেঁপে ওঠে তার।
তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে আসে।

— “তুমি… এই গরমে… কষ্ট হচ্ছে না?”

ইরা তাকায় না, শুধু বলে,
— “রোজ তো হয়। তুমি কি আজ দেখলে?”

সাজু স্তব্ধ।
সে কিছু বলে না।
একটা ছোট তোয়ালে ভিজিয়ে আনে, ইরার কপালে চেপে ধরে।
চুপিচুপি বলে,
— “আমি জানি না কেন এতদিন দেখিনি। এখন মনে হচ্ছে, আমি ভালোবাসতে জানি না…”

ইরার মুখে একফোঁটা হাসি খেলে যায়। সে মুখ ঘুরিয়ে নেয়,
কিন্তু চোখের কোণ জলে টলটল করে।

সাজু চুপচাপ তার পাশে দাঁড়ায়। রান্না প্রায় শেষ।
চুলার আগুনটা সে নিজে নিভিয়ে দেয়।

দুপুরে খাওয়ার সময় ইরা বলে,
— “তুমি কি জানো, রান্নাঘরের আগুনেও আছে ফোঁটা ফোঁটা প্রেম?”

সাজু তাকিয়ে থাকে স্ত্রীর দিকে।
তপ্ত দুপুরে, ঘামের গন্ধে ভরা ঘরে, হঠাৎই তার মনে হয়—
ইরা শুধু তার স্ত্রী না, সে এক সময়ের সাক্ষী,
এক প্রেয়সী,
যার ভালোবাসা সবসময় নীরবে পুড়ে যায়।

বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে।
আকাশে গোধূলির লালচে রেখা।
ইরা বারান্দায় বসে জামাকাপড় ভাঁজ করছে। চুল খুলে খোপা করেছে তাড়াহুড়োতে, হাতজোড়া ক্লান্ত তবু ব্যস্ত। শুকনো তোয়ালে মচকে ভাঁজ করছে, মনে মনে তাল মেলাচ্ছে সময়ের সঙ্গে।

সাজু এসে চুপচাপ পাশে বসে।
তার মুখে ভিন্ন এক ভাব, যা ইরার চোখ এড়িয়ে যায় না।

— “তুমি কখনো কিছু বলো না, ইরা,” সাজু বলে।

ইরা চোখ না তুলে জবাব দেয়,
— “সব কথা কি মুখে বলা যায়?”

তার ঠোঁটের কোণে জমে থাকা একটি রেখা—কষ্টের, অভ্যস্ততার—হঠাৎ যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সাজু চুপ করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
তারপর মৃদু স্বরে বলে,
— “আজ দুপুরে তোমাকে দেখে… আমি কেমন জানি ভয় পেয়ে গেলাম।
তুমি কি প্রতিদিন এমন চুপচাপই পুড়ো আগুনের সামনে?”

ইরা এবার ধীরে তাকায় সাজুর দিকে।
তার চোখে কোনো অভিযোগ নেই, শুধু একটা দীর্ঘ ক্লান্তি।

সাজু বলে,
— “আমি যদি সত্যিই প্রেমিক হতাম,
তাহলে হয়তো আগেই বুঝে যেতাম এই নীরবতা কতটা গাঢ়।”

ইরা আবার চোখ নামিয়ে নেয়।
বলে না কিছু। কিন্তু সাজু এবার থামে না।
সে ইরার কাছ থেকে তোয়ালেটা নিয়ে ফোল্ড করে,
তারপর বলে—

— “কাল থেকে রান্নাঘরে তুমি একা থাকবে না। ছুটির দিনগুলোতে আমি পাশে থাকব।
তাপ নিতে না পারি, কিন্তু তোমার পাশে দাঁড়াতে পারি তো?”

ইরার চোখে এবার এক মুহূর্তের দোল খায়।
জানালার কাঁচে সূর্যটা একটুখানি পড়ে রইল, যেন সাক্ষী হয়ে।

সাজু আবার বলে,
— “আমি কিচ্ছু পারি না ইরা। না ডাল রাঁধতে পারি, না ভাত চড়াতে পারি।
তবু আমি চাই—তোমার একজন মানুষ হতে।
তোমার ছায়া হতে, একফোঁটা বাতাস হতে।”

ইরা এবার হালকা হেসে তাকায়, সেই হাসিতে যেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা ধোঁয়ার মৃদু ছায়া।
কোনো শব্দ হয় না, তবু মনে হয়—
এই নীরবতা অনেক বেশি গভীর।
---



  • রান্নাঘরে সাজু
সকালের রোদ জানালায় পড়ে কাঁপছে।
পাখিরা জানে আজও গরম হবে তীব্র।
রান্নাঘরে আজ অদ্ভুত একটা নীরব চঞ্চলতা।
কারণ সাজু আজ রান্না করবে।

ইরা প্রথমে কিছু বলেনি।
শুধু একটু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
তারপর একটা পুরোনো গামছা এগিয়ে দিয়েছিল সাজুকে—
রান্নার সময় কপালের ঘাম মুছবে বলে।

সাজু হেঁশেলে ঢুকেই থমকে যায়।
এত হাঁড়ি, বাটি, কাটাকুটি, জ্বাল দেওয়ার নামতা—
একটা যুদ্ধক্ষেত্র মনে হয় ওর কাছে।

— “তরকারিটা কোনটা?”
— “এইটা। আলু দিয়ে ঢেঁড়স করলেই চলবে।”
— “আলু কি কুচি করে কাটা লাগে?”
— “না, গোল করে কাটো। তবে সমান যেন হয়।”

সাজু তার সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে।
আলু কাটতে গিয়ে আঙুলে সামান্য চোট লাগে।
তবুও সে চুপ করে, কিচেন টাওয়েল দিয়ে পেঁচিয়ে নেয়।

চুলায় আগুন ধরাতে গিয়ে গ্যাস একটু বেশি ছেড়ে ফেলে—ভয় পায়,
তারপর ফুঁ দিয়ে কমায়।

ইরা পাশের ঘর থেকে মাঝে মাঝে একবার উঁকি দেয়।
চোখে একরাশ শঙ্কা,
তবে তার মুখে অদ্ভুত এক শান্তি।
সাজুকে দেখে মনে হয় সে যেন একটা শিশু—
যে প্রথমবার আঁকতে বসে ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি।

তরকারিতে লবণ দেওয়ার সময় সাজু দ্বিধায় পড়ে।
চামচে একবার তোলে, পরে আবার কমিয়ে দেয়।
নিজেই ফিসফিস করে—
— “বেশি হলে আবার ঝগড়া হবে না তো?”

সব শেষে যখন তরকারিটা নামিয়ে রাখে,
ইরা এসে পাশে দাঁড়ায়।
চোখে লুকোনো হাসি।

— “চলো খেয়ে দেখি।”
— “তুমি আগে খাও,” সাজু বলে।

ইরা মুখে তোলে এক চামচ।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে—
— “লবণ একটু কম। কিন্তু…”
সাজুর মুখ শুকিয়ে যায়।

ইরা এবার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলে—
— “…ভালোবাসা অনেক বেশি।”

সাজু যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
তার মুখে হাসি, চোখে জলছোঁয়া এক উষ্ণতা।

তাদের মাঝে রান্নাঘরের তাপটা একটু কমে আসে যেন।

পরেরদিন সকালে সাজু একটু আগেভাগে উঠে।
ঘড়িতে সময় সাড়ে সাতটা।
কিন্তু ইরা এতক্ষণে ধুয়ে ফেলেছে চুল, কাপড় পালটে নামছে চুলার কাছে।

সাজু দাঁড়িয়ে থাকে তার পাশেই।
চুপচাপ ইরার পেছনে দাঁড়িয়ে বলে—
— “ভাতটা আজ আমি করে দিচ্ছি।”

ইরা ভুরু কুঁচকে তাকায়,
— “বুঝো তো কিছু?”

— “না। তবে শিখতে চাই।”

সেই থেকে শুরু হয় সাজুর প্রতিদিনের একটা ছোট লড়াই।
সে চামচে ডাল নাড়িয়ে দেখে—ঘন কি পাতলা।
ভাত চড়াতে গিয়ে বারবার ঢাকনা ফেলে দেয়।
একদিন তো ছাকনি হাতে ডাল ছেঁকে নিতে গিয়ে ডাল পুরোপুরি গড়িয়ে দেয় বেসিনে।

সাজু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

ইরা সেদিন কিছু বলে না।
চুপচাপ মেঝে মুছে আবার ডাল বসায়।

তবে একদিন সে বলে বসে—
— “তুমি না পারলেও, পাশে থাকো—এইটুকুই অনেক।
আগুনটা ভাগ করে নিতে কেউ চায় না। তুমি চাইছো—তাই আমার কাজটা হালকা লাগে।”

সাজুর চোখে জল আসে না,
তবে তার ভেতরের আত্মাভিমানটা ধীরে ধীরে গলে যেতে থাকে।

একদিন বাইরে থেকে সাজুর এক বন্ধু আসে। সাজুকে খুঁজতে খুঁজতে রান্নাঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়।

সাজু তখন পেঁয়াজ কুটছে, চোখ লাল, আঙুলে গন্ধ।
বন্ধু হো হো করে হেসে ওঠে,
— “তুই তো দেখি একেবারে বউয়ের নিচে চলে গেছিস রে!”

সাজু শুধু হেসে বলে,
— “নিচে না রে, পাশে। দাঁড়ানোর জায়গা তো ওটাই হওয়া উচিত ছিল অনেক আগে।”

বন্ধু হেসে চলে যায়,
কিন্তু ইরা সেই কথাটা পাশের ঘর থেকে শুনে ফেলে।
তার চোখে এক ধরনের ব্যাখ্যা-না-করা আলো জ্বলে ওঠে।

সাজু তাকে দেখে কিছু বলতে চায়,
তবে ইরা আগেই বলে ফেলে—
— “এই প্রথম কারো কথা শুনে লজ্জা লাগেনি, বরং গর্ব হলো।
তুমি কি জানো কেন?”

সাজু জবাব দিতে পারে না।

ইরা শুধু বলে—
— “কারণ তুমি আমাকে একা রাখো না আর।
এইটুকু ভালোবাসা দিয়েই তো জীবন চলে যায়।”


ইরার মনটা আনন্দে নেচে ওঠে।
নীরবে, ভিতরে ভিতরে।

সে ভাবে—
"সাজু এখন আর কেবল ভালোবাসে না, বোঝেও।
এই বোঝাপড়াই তো সবচেয়ে বড় প্রেম।"

তার ঠোঁটে হাসি ফুটে,
অতল গর্বে বুকটা ভরে ওঠে।

তপ্ত দুপুরের সেই ঘামভেজা কপাল যেন এখন শীতল বাতাসে ধুয়ে যায়। 
---




  • রান্নাঘরের রোদ ও নিরার আগমন

রোদ্দুরটা আজও গা জ্বালানো।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলে নামছে, কিন্তু গরমের কোমর এখনও বাঁকা হয়নি।

এই সময়ে কলিং বেল বাজে।

ইরা একটু অবাক হয়।
দরজা খুলতেই একঝাঁক হাওয়া ঢুকে পড়ে—

— “হ্যালো আপু!”

ইরার ছোট বোন নিরা দাঁড়িয়ে হাসছে।
চোখে সানগ্লাস, কাঁধে ব্যাগ, পরনে হালকা পাতলা কামিজ আর চুড়িদার।
কলেজ থেকে ছুটি পেয়ে হুট করে চলে এসেছে।

ইরা এক মুহূর্ত থমকে থাকে।
তারপর জড়িয়ে ধরে—
— “এই গরমে হুট করে চলে এলি?”
— “তাই তো মজা, গরমে তোমার রান্নার ঘ্রাণ খাওয়ার সুযোগ তো আর মিস করা যায় না!”

নিরা হেসে ভেতরে ঢোকে।
আর তখনই রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে হাঁড়ির ঢাকনা তোলার আওয়াজ।

সে অবাক হয়ে উঁকি মারে।

সাজু, চুলার পাশে দাঁড়িয়ে, গামছা কাঁধে, ডাল নাড়ছে।
ঘাম ঝরছে, গাল লাল হয়ে আছে, তবু মুখে আন্তরিক মনোযোগ।

নিরা হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে।

— “এইটা কি স্বপ্ন দেখছি? দুলাভাই রান্না করছেন?”
— “হ্যাঁ,” ইরা মুচকি হেসে বলে।”

নিরা ঠোঁট কামড়ে হাসে—
— “বাহ! রান্নাঘরে রোম্যান্স দেখছি!”

সাজু পেছনে ঘুরে বলে—
— “তুই এলি, ভালো করেছিস। আজ তোর জন্যই ডাল আর বেগুন ভাজা।”

নিরা খানিক ঠাট্টা ছলে বলে—
— “আপু রান্না না করে, বরং দুলাভাই করছে— আঃ কি প্রেম দু'জনার!”
ইরা কিছু না বলে চুপ করে থাকে।
সাজু হালকা হেসে বলে—
— “প্রেমের মাপকাঠি রান্না নয়, পাশে থাকাটাই প্রেম।”

নিরার ঠোঁটে থাকা দুষ্টু হাসিটা একটু নরম হয়ে যায়। চোখে একফোঁটা ঝিলিক—শুধু একবার তাকায় ইরার দিকে।

সে আর কিছু বলে না।
চুপচাপ ডাইনিং টেবিলে বসে।

খাওয়ার সময় একবার মুখ তুলেই বলে—
— “ডালে লবণ একটু কম। কিন্তু দুলাভাই, আপনার মনের পরিমাণটা ঠিক।”

ইরা তাকিয়ে থাকে নিরার দিকে।
দুই বোনের মাঝে অনেক অজানা কথা বিনিময় হয় চোখের ভাষায়।


নিরা বারান্দায় বসে আছে।
চা খেতে খেতে সূর্য ডুবে যাওয়া দেখে।
সব কিছু কেমন স্থির।
শুধু রান্নাঘর থেকে মাঝে মাঝে চামচের আওয়াজ আসে—সাজু এখনও কাজ করছে।

ইরা পাশে এসে বসে।
দুই বোন কিছুক্ষণ কথা বলে না।

নিরা হঠাৎ বলে—
— “আপু, তুই কি সত্যিই সুখী?”

ইরা একটু চমকে তাকায়।
চোখে-মুখে বিস্ময় নেই, বরং একরকম শান্তি।

— “জানি না সুখের কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি আছে কি না।
তবে একটা কথা সত্যি…”

সে একটু থেমে বলে—
— “সাজু আমাকে ভালোবাসে বলেই শুধু না,
ও আমাকে বোঝে।
আমার ক্লান্তি বোঝে, চুপ করে থাকাকে বোঝে,
মাঝে মাঝে আমার নীরবতার ভাষাও ও পড়ে ফেলে।”

নিরা তাকিয়ে থাকে।

ইরা এবার ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি এনে বলে—
— “তুই জানিস, সাজু ছেলেবেলাতেও রান্না করত মায়ের সঙ্গে।
সে আগুনের ভয় পায় না।
বরং আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের ভালোবাসাকে আগলে রাখে।”

— “এখন আমি শুধু স্ত্রী নই, আমি একজন সঙ্গী।
সাজু আমাকে সঙ্গী বানিয়েছে।
এইটুকু পাওয়াটাই কি কম কিছু?”

নিরা এবার আর প্রশ্ন করে না।
চুপচাপ ইরার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার চোখে যেন কোনো একদিন নিজেও এমন ভালোবাসা কামনা করে।

অন্ধকার নেমে আসে বারান্দায়,
তবু আলো জ্বলে থাকে দুই বোনের মাঝের নীরবতায়।

নিরা আর কিছু বলে না।
তার চোখে বোঝার আলো, ঠোঁটে নীরব সম্মতি।
ঠিক তখনই বারান্দার দরজায় ঠকঠক শব্দ।

সাজু।

কাঁধে হালকা তোয়ালে।
ঘামে ভেজা কপাল মুছতে মুছতে দাঁড়িয়ে বলে—
— “আরে! দুই বোন গা ঢাকা দিয়ে কী এত ভাবছো?”
তারপর একঝাঁক হেসে বলে,
— “নিরা, চিন্তা করিস না—
তোকেও আমার মতোই বর খুঁজে দেব!
রান্না জানতে হবে— কমপক্ষে ভাত রাঁধা, ডিম ভাজা!”

নিরা হেসে ফেলে।
ইরার মুখে খুনসুটির হাসি।

সাজু পাশে বসে বলে—
“চা শেষ? নাকি আমার জন্য রেখেছো?”
ইরা বলে—
“তোমার জন্য তো জীবনটাই রেখে বসে আছি!”

সাজু নাটুকে ভঙ্গিতে বলে—
“তাহলে আমি সত্যিই ভাগ্যবান!”

নিরা এবার হেসে বলে—
“তোমরা দুইজন সিনেমার মতো ডায়লগ মারো, জানো?”

আলোর নিচে বসে থাকা তিনজন মানুষের মুখে তখন নিখাদ হাসি।
গল্প এগোয়, ভালোবাসা বাড়ে,
আর তপ্ত দুপুরের মাঝখানে জেগে থাকে একরকম শীতল ঘনতা—
যেটা কেবল বোঝাপড়া আর সঙ্গ দিয়েই সম্ভব।
----




  • মায়ের ফোন
সন্ধ্যাবেলা।
ঘরে হালকা বাতাস ঢুকছে, কিন্তু গরম এখনও থেমে নেই।
সাজু আর ইরা বারান্দায় বসে চা খাচ্ছে।

এমন সময় সাজুর ফোনে মায়ের কল আসে।
অপর প্রান্ত থেকে মা বলে ওঠেন—

— “ফেসবুকে তোর ভিডিওটা দেখলাম।
দেখে খুব ভালো লাগল। তুই কি সত্যি রান্না করিস রে, বাবা?”

সাজু হেসে চোখের কোণে ইরার দিকে তাকায়,
তারপর বলে—
— “হ্যাঁ মা, ছুটির দিনগুলোতে রান্নাঘরে ওকে একটু সময় দিই আরকি।”
— “ভালো করেছিস। তোর ছোটবেলা মনে পড়ে যায় রে।”

সাজু একটু চুপ করে যায়।
মা যেন ঠিক তখনই স্মৃতির দরজা খুলে ফেলেন।

— “তুই তো জানিস, তোর আব্বার হঠাৎ অসুস্থতার সময় কত কষ্ট হইছিল।
তুই তখন ক্লাস ফোরে পড়িস।
তবু প্রতিদিন গরম ভাতে আলু ভর্তা বানিয়ে দিতি আমার পাশে দাঁড়ায়া।”

সাজুর চোখ ভিজে ওঠে।

— “তুই ছোট থেকেই এমন ছিলি। তোর বউ তো ভাগ্যবতী। মা হয়ে আমি গর্ব করি।”

সাজু কিছু বলে না।

ওদিকে বারান্দা থেকে ইরা চুপচাপ শুনে ফেলে কথাগুলো।
তার চোখে জমে এক অনির্বচনীয় আলো।
সাজুর অতীত আর বর্তমান এক সুতোয় গাঁথা হয়ে যায় তার কাছে।

রান্নাঘরের আগুন আজ যেন আর পোড়ায় না—
বরং আলোকিত করে।
---



  • ইরার দিনলিপি
“২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩২ তপ্ত দুপুর
তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি।
বাইরে গরম বাতাস, ভেতরে চুলার উত্তাপ।
তবু আজকের দুপুরটায় আমার মন হালকা।
সাজু পাশে ছিল।

রান্না করতে গিয়ে ঘাম জমেছিল কপালে,
ঠিক তখন ও আমার পাশে এসে দাঁড়াল।
বলল,
‘তুমি বেরোও, আমি করি।’
আমি অবাক হইনি,
কারণ এখন আর ওর কাছে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

সাজু রান্না করতে পারে—
এটা শুধু একটা গুণ নয়,
এটা ভালোবাসার প্রকাশ।
আমার খেয়াল রাখার মধ্যে ওর গর্ব লুকিয়ে থাকে।

আজ মা ফোনে বললেন,
ফেসবুকে দেখা রান্নার ভিডিও দেখে খুব খুশি হয়েছেন।
একটা হাসি এল আমার মুখে—
আমি কিছুই বলিনি, শুধু চায়ের কাপ সাজুর দিকে বাড়িয়ে দিলাম।

আমার এই জীবন—
একটা ধোঁয়া ওঠা কাপ,
একটা ভেজা তোয়ালে,
একটু পরিশ্রম ভাগ করে নেওয়া ভালোবাসা।

সব পুরুষ একরকম নয়—
আর সব প্রেমও একরকম হয় না।
আমার প্রেম একটু নিঃশব্দ,
তবু প্রতিদিন নতুন করে প্রকাশ পায়।

যখন সাজু আমার জন্য পেঁয়াজ কেটে কাঁদে,
তখন আমি বুঝি—
আমার এই সংসার একটি কবিতা।
তপ্ত দুপুরে লেখা এক দীর্ঘ ভালোবাসার গদ্য।”
 –ইরা


  • গাঁয়ে ফেরা
দুদিন পর ঈদুল আজহা।
শহরের ধুলো-ধোঁয়ার মধ্যে
অভিমান জমে থাকা এক দীর্ঘ বর্ষার মতো জীবন পেছনে ফেলে
তারা রওনা দেয় গ্রামে।

কমলাপুর স্টেশন তখন কানায় কানায় ভরা—
হাত-পাখা, প্লাস্টিকের মগ, সেমাইর প্যাকেট,
সব ছুটে চলেছে একদিকে—গফরগাঁও, সুবর্ণপুর।

সাজু ব্যাগ গোছায়।
ইরা দাঁড়িয়ে জানালার দিকে তাকায়।
তার চোখে একধরনের আলো—
যেন এই সফর শুধু ইদের না,
কোনো পুরোনো কবিতার দিকে ফেরার।

ট্রেন ছাড়ার মিনিট পাঁচেক আগে,
সাজু হঠাৎ ইরার কানে ফিসফিসিয়ে বলে—
— “জানো? ট্রেনের জানালায় তোমাকে দেখতে বড়ো মিষ্টি লাগে।
এমনভাবে তাকাও, মনে হয় তুমি আর আমি একসাথে ছুটে যাচ্ছি কোনো গল্পের দিকে।”

ইরা হেসে বলে—
— “তাই? তাহলে গল্পটা শেষ হতে দিয়ো না কখনো।”

ট্রেন ছাড়ে—
চাকা ঘোরে, শহরের কংক্রিট পেছনে ফেলে
সবুজ ছায়ায় ঢেকে যায় জানালার পাশ।

নিরা হেডফোনে গান শুনছে।
ইরা আর সাজু পাশাপাশি বসে।
সাজু ইরার হাতটা ধীরে নিজের কোলের উপর নেয়,
তাপরক্ত আঙুলের ভাঁজে তাদের চুপচাপ প্রেম জমে ওঠে। সাজুর বুকে মাথা পেতে ঘুমিয়ে পড়ে ইরা। 

ট্রেন ছুটে চলে।
ঝাঁকুনিতে সামান্য দুলে ওঠে ইরার মাথা,
তবু তার মুখে শান্তির রেখা—
ঘুমে ভেজা নিঃশ্বাসে যেন সাজুর বুকের গতি বদলে যায়।

সাজু তাকিয়ে থাকে জানালার বাইরে—
পেছনে ফেলে আসা শহরের গাঢ় ধূসরতা,
আর সামনে এগিয়ে চলা সবুজ দিগন্ত।

তার মনে পড়ে—
একদিন ইরা তাকে বলেছিল,
—“শুধু নিজের জন্য ভালোবাসা চাইলেই তা টেকে না। কাউকে ঘুমিয়ে পড়ার মতো নিরাপদ অনুভব দিলে তবেই প্রেম সত্যি হয়।”


হঠাৎ হকারের ডাক—
“মুড়ি চানাচুর! ঠান্ডা পানি!”
নিরা হেডফোন খুলে হেসে বলে—
— “দুলাভাই, আপু কি ঘুমিয়েই যাবে পুরো রাস্তা?”
সাজু হাসে—
— “ও ঘুমালেই তো বুঝি, আমি পাশে আছি ঠিকঠাক।”

নিরা মুচকি হেসে জানালার বাইরে তাকায়।
তার চোখে একটা মুগ্ধতা—
দুলাভাইয়ের এমন রূপ সে আগে কখনও দেখেনি।
হয়তো চুপচাপ শিখে নিচ্ছে,
ভালোবাসা এমনটাও হতে পারে।

ট্রেন যখন পৌঁছায় গফরগাঁওয়ে
ট্রেনের ব্রেক কষে ধীরে ধীরে।
ইরার ঘুম ভাঙে ঝাঁকুনিতে।
সে ধীরে চোখ মেলে বলে—
— “পৌঁছে গেছি?”
সাজু কাঁধে আলতো হাত রাখে,
— “হ্যাঁ, আমরা ফিরেছি।”

স্টেশন প্ল্যাটফর্মে নামার পর ইরা সাজুর হাত ধরে হাঁটে, চারদিকে ইদের ভিড়, কিন্তু তাদের চারপাশে যেন সময় কিছুটা ধীর হয়ে গেছে।

সাজু মিশুক ভাড়া করে। এখান থেকে সুবর্ণপুর ২ কি.মি.। 
মিশুকে ওঠার পর হাওয়ায় ওড়ানো সাদা ওড়না,
আলতা পরা পায়ে ধুলোর ছোঁয়া—
সব মিলিয়ে ইরা ভাবে,
এই ইদ শুধু কোরবানির না,
এটা ভালোবাসা ফিরিয়ে আনার এক উপলক্ষ।

সুবর্ণপুরের মাটিতে পা রাখার আগেই
সাজুর মনে হচ্ছিল—
মায়ের মুখটা কেমন হবে আজ?
খুশি? না অভিমানী?

রোদ্দুরের মধ্যে দিয়ে মিশুক ঢুকল উঠোনে। 
উঠানের কিনারে একটা ডালিম গাছ, রশিতে শুকোতে দেওয়া শাড়ি, আর দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটা—
তার মা।

বয়স যেন একটু বেশি লেগে গেছে এখন মুখে,
তবু চোখদুটো ঠিক আগের মতোই উজ্জ্বল।

সাজু ঝপ করে নেমে পড়ে গাড়ি থেকে।
সোজা গিয়ে মায়ের পায়ের কাছে বসে পড়ে, বলে—
— “মা…”

মা যেন কথা খুঁজে পান না।
দু'হাত বাড়িয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন—
কাঁধে চাপা কণ্ঠে বলেন,
— “আমার ছেলে, আমার সোনা… কতদিন পর এলি রে…”

ইরা একটু আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল পাশে।
মা তখনই তাকান তার দিকে,
— “বউমা? তোমার মুখ তো আমি দেখি ছবিতে আর ভিডিয়ো কলে, আজ দেখছি কাছে থেকে!
তুমি যে আমার ছেলের জীবন বদলে দিয়েছ মা!”

ইরা মৃদু হাসে।
তারপর মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম করে।

মা ইরাকে টেনে বুকে জড়িয়ে নেন—
একটা গন্ধ লেগে থাকে তার গলার কাছে—
পুড়ে যাওয়া ধূপ, রান্নার ধোঁয়া আর আদুরে মাতৃত্বের।

— “তুমি আমার মেয়ের মতো। এসো মা, ঘরে এসো
তুমি তো আমার ঘরের চাঁদ এখন।”

ইরা অনুভব করে,
এই প্রথম সে কোনও বাড়িকে "নিজের মতো" মনে হচ্ছে।
এই বুকে জড়িয়ে ধরা মানুষটার স্পর্শে সে যেন একটু গলে যায়,
আর ভাবে—
—“আমি যে বড়ো ভাগ্যবতী। 



  • চাঁদের নিচে, হৃদয়ের ইদ
বাড়ির উঠোনে তখন ঘন নিস্তব্ধতা।
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে—
ইদের আগের ক্লান্তিতে, পরদিনের খুশির অপেক্ষায়।

শুধু এক কোণে পাতানো বিছানায়
চুপচাপ শুয়ে আছে সাজু আর ইরা।
তারাদের ভিড়ে মধ্য আকাশে ঝুলে থাকা চাঁদটাকে
দুজনেই দেখে নীরব দৃষ্টিতে,
কিন্তু মনে মনে তারা হারিয়ে যাচ্ছে একে অপরের ভেতর।

ইরার মাথা সাজুর বাহুর ভাঁজে।
সাজুর আঙুল তার চুলে ধীরে ধীরে বুনে চলেছে নীরব অনুভব।
কোনো কথা নেই,
শুধু নিঃশ্বাসের ছন্দ মিলিয়ে মিলিয়ে বেজে ওঠে—

সাজু বলে, ধীর গলায়, কানের কাছে মুখ এনে—
— “তোমাকে ছুঁলে আমার ভিতরটা এমন শান্ত হয়ে যায়,
যেন পুরনো কোনো শেকড়ের কাছে ফিরে এসেছি।”

ইরা চোখ বন্ধ করে বলে—
— “তুমি কি জানো, আমার জীবনটা শুধু এই মুহূর্তের জন্যই জমিয়ে রেখেছিলাম…”

চাঁদের আলোয় ইরার গালজুড়ে ভেসে ওঠে নরম উষ্ণতা।
সাজুর হাত ধীরে ধীরে নামে তার বাহু ছুঁয়ে,
পায়ের পাতায় মিশে গিয়ে যেন বলে দেয়—
“এই আমি, তোমার প্রতিটি অস্থি-রক্তে জড়িয়ে থাকতে চাই।”

ইরা শরীর সঁপে দেয় সেই আলতো আগুনে।
তাদের স্পর্শ একে অপরকে ধীরে ধীরে গলিয়ে দেয়—
নির্জন উঠোনে যেন জেগে ওঠে
অন্তর্জাগতিক কোনো প্রণয়ের ইদ।

কোনো রাত্রি এত দীর্ঘ মনে হয়নি আগে।
তবু তারা চায়—
এই রাত থেমে থাকুক,
চাঁদ আটকে যাক সেই দিগন্তে,
তারারা শুয়ে থাকুক চোখের পাতায়
যেন ঘুমও ভিজে ওঠে প্রণয়ের উষ্ণতায়।

সাজু তার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়,
কথা গড়িয়ে পড়ে—
— “তুমিই আমার ইদ—
এই ছায়া, এই উষ্ণতা, এই নিঃশব্দ গলিয়ে যাওয়া…
বাকি সব কেবল পঞ্জিকার পাতায় লেখা তারিখ।”

তারা চুপচাপ একে অপরের হৃদয়ে গলে যায়—
নিঃশব্দে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে।
চাঁদ উপরে দাঁড়িয়ে থাকে
সাক্ষী হয়ে—
একটি বৈবাহিক প্রেমের মহোৎসবে।
আর যেন বলে যায়, “রাত পোহালেই ইদ।”

সমাপ্ত।।

#রৌদ্র ভেজা প্রেম # বাংলাগল্প #দাম্পত্যপ্রেম 
❍ ২০২৫০৬০৭ 
লেখাপত্র ২০২৫. Blogger দ্বারা পরিচালিত.

সর্বশেষ

অস্পৃশ্য স্বাধীনতা

অস্পৃশ্য স্বাধীনতা ​ — আশরাফ ইবনে আকন্দ হে স্বাধীনতা, তুমি ঠোঁটের ডগায় লেগে থাকা মানে না বোঝা পুরোনো কোনো মন্ত্র, এক অভ্যস্ত উচ্চারণ। তুমি ...

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Contact form

নাম

ইমেল *

বার্তা *

অধিক পঠিত পোস্ট